আজ রবিবার, ১৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ।   ২৯ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

প্রধানমন্ত্রীর আকষ্মিক মন্ত্রণালয় পরিদর্শন, প্রথম নজির স্থাপন সচিবালয় প্রশাসনে তোলপাড়

আরো খবর

আলমগীর মতিন চৌধুরী ঃ

সকালে সচিবালয়ে প্রবেশ করে আকষ্মিক বিভিন্ন দফতর পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংসদীয় সরকারের পথ চলার তিন যুগের নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করলেন কোন প্রধানমন্ত্রী। অন্যান্য দিনের মতো ঈদের ছুটির পর সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের সকাল ৯টার একটু পরেই সচিবালয়ে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রতিদিন গাড়ি থেকে নেমে নিজ দফতরে গেলেও আজ করেছেন উল্টোটা। সকাল ৯টার পরপরই সচিবালয়ে এসে নিজ দপ্তরে না গিয়ে হেঁটে ৬ নম্বর ভবনে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন এবং কর্মকর্তা কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর সাথে মন্ত্রী পরিষদ সচিব নাসিমুল গণি, প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি মোস্তফা জুলফিকার হাসানসহ কয়েকজন দেহরক্ষী ছিলেন। ভবনটির বিভিন্ন তলায় অন্তত দশটি মন্ত্রণালয় রয়েছে। এসময়ে ভবনটিতে থাকা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পানি সম্পদ, নারী ও শিশু বিষয়ক এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর পাঁচ নম্বর ভবনের গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং তিন নম্বর ভবনের বাণিজ্য এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন তিনি। এভাবে সচিবালয়ের বিভিন্ন ভবনে অবস্থিত অন্তত আটটি মন্ত্রণালয় আকষ্মিক পরিদর্শন শেষে ফিরে আসেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। এদিকে, অন্যদিনের মতো আজও বেশ কয়েকটি নির্ধারিত কর্মসূচিতে কর্মব্যস্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সকালে প্রধানমন্ত্রী সভাপতিত্বে কৃষক কার্ড সংক্রান্ত সভা প্রথমে হবার কথা ছিল। এসভায় স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, অর্থ, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্টরা সভায় অংশ নেয়ার কথা ছিল বলে জানাযায়। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সরকারের এক মাস ১২দিন পূর্তি সময়ের মধ্যে প্রশাসনের মধ্যে শৃঙ্খলা আসতে শুরু করেছে। ঠিক তখনি প্রধানমন্ত্রীর আকষ্মিক পরিদর্শন, সচিবালয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারিরা নড়েচড়ে বসেছে। সচিবালয় জুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। সংসদীয় সরকারের শাসনাকালে এমন ঘটনা আগে কখনো দেখা যায়নি, সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর হটাৎ পরিদর্শন নজির সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্রপতি শাসিত হুসাইন মুহাম্মদের শাসন আমলে অর্থাৎ ১৯৮৮ সালের ৩ মে কোন সরকার ও রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে আকর্ষিক ভাবে শিল্প ও শ্রম মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করে ছিলেন। নতুন সরকার গত এক মাসে কখনো সরকারি নির্দেশে, আবার কখনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের উদ্যোগে উচ্চ পদ থেকে শুরু করে নিম্ন পদ পর্যন্ত বদলি, পদোন্নতিসহ নতুন নিয়োগ হয়েছে। টানা দেড় দশকের বেশি সময় ধরে শেখ হাসিনা ও প্রফেসর ড. ইউনুস এর নেতৃত্বাধীন সরকার ছিল। এ সময় যে প্রভাব প্রশাসনের সর্বস্তরে জেঁকে বসেছিল, তার অবসান ঘটাতে প্রশাসনিক এই রদবদল বলে জানা গেছে। এর মূলে রয়েছে সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় নতুন সরকারের চেতনা ও প্রতিশ্রুতি। অভিযোগ রয়েছে পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং তাদের সহযোগীরা নিজেদের খোলস পাল্টে বঞ্চিত হিসেবে জাহির করে আবার স্বরূপে ফিরে আসার চেষ্টা করছেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার গত এক মাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং বেসরকারি পর্যায়ে রদবদল ও পুনঃনিয়োগের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আসছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যাংক-বীমা ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেও এই পরিবর্তন অব্যাহত রয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে সুবিধাবঞ্চিত ও অন্যায়-অবিচারের শিকার হওয়া লোকজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুযোগ সন্ধানী কিছু লোক ও গোষ্ঠী। যাদের বিরুদ্ধে দলীয় লেজুড়বৃত্তি করে ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধি করা এবং রাষ্ট্র ও জনগণের বিপুল ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে। এখন এরা নতুন সরকারের সময়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা চালিয়ে আসছেন। এই সুযোগসন্ধানীদের চিহ্নিত, শক্ত হাতে দমন, সেবার মান নিশ্চিত করা হবে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রধান কাজ। তা না হলে প্রশাসনে সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারের যে অঙ্গীকার তা ব্যাহত হবে। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারের বহু বাণিজ্যিক এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও নানা কারণে অভিযুক্তরা আবার ফিরে আসার চেষ্টা করছেন, কেউ কেউ ইতোমধ্যে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকার কঠোর নজর দারি না করলে সুবিধাভোগি চক্রের কারণে আবারও সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা পেতে জনগণকে দুর্ভোগ পোহাতে হতে পারে। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র ও জনগণের অর্থ লোপাটের আশঙ্কা থেকে যাবে। অনিয়ম-অত্যাচার এবং অবিচার-দুর্নীতির অবসান ঘটাতে জুলাই অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান হয়েছে। একটি পরাক্রমশালী সরকার প্রধানকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। ও তার সহযোগীরা জনরোষের মুখে বিতাড়িত হয়েছে। সুশাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে দেশজনতা। দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়, পরিবর্তনটা অবশ্যম্ভাবী। তবে তা হতে হবে যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা ও অতীতের সার্ভিস রেকর্ডের ভিত্তিতে। সবাইকে হঠাৎ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। কারণ একটা রাজনৈতিক সরকারের দীর্ঘ মেয়াদ পার হয়েছে। সেখানে সব স্তরে তাদের লোক রয়েছে। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কেউ কেউ নিজে থেকেই সরে গেলেও অনেকে তা করেননি। দেশবাসীকে সুশাসন ও ন্যায়বিচার উপহার দিতে হলে স্বল্প মেয়াদে না হলেও মধ্যম, দীর্ঘ মেয়াদে এই পরিবর্তনটা সম্পন্ন করার প্রয়োজন। ‘রেগুলেটরি পয়েন্ট অব ভিউ’ যাকে বলি নিয়ন্ত্রক কিংবা ব্যবস্থাপনা প্রধানের ভূমিকা থাকবে, নতুন সরকারকে যথাযথ সহায়তা করবে। তাদের পরিবর্তনটা একটু দেখেশুনে করতে হবে। দেশে লাখ লাখ শিক্ষিত ও চাকরিপ্রত্যাশী বেকার যুবক রয়েছেন। সরকারের প্রশাসনকে তার নিজস্ব ধারায় চলার সুযোগ করে দিতে হলে সবার আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাগরিক বান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে। কারণ হলো, সব ক্ষেত্রেই পুলিশ দরকার হয়। এ জন্য পুলিশ ও সহযোগী আনসার বাহিনীতে পরিবর্তন প্রয়োজন। সরকারি চাকরি করলেই বেতনের বাইরে অর্থ রোজগার করা যায়- এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হবে না। পুরোনোরা এ ধারণায় অন্ধ হয়ে পড়েছে। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ভালো দক্ষ সৎ মানুষের দরকার। সেবা নিশ্চিত করতে পারলে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। বন্ধ প্রতিষ্ঠান খুলে শ্রমজীবী মানুষকে কর্মমূখী করে তুলতে হবে। সচেতনতা মূলক এমন পরিদর্শন সরকার প্রশাসনের মধ্যে কাজের গতি উৎসাহ সৃষ্টি করবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ মনে করছেন।

আলোকিত প্রতিদিন /২৯ মার্চ ২০২৬ /মওম

- Advertisement -
- Advertisement -