বিশেষ প্রতিবেদক:
বীর মুক্তিযোদ্ধা, একুশে পদকপ্রাপ্ত ভাষা সৈনিক, স্বৈরাচার পতন সংগ্রামের অগ্রনায়ক, ক্রান্তিকালের কান্ডারী, বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ১৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন স্মৃতি ফাউন্ডেশন আগামী ১৬ মার্চ-২০২৬ রোজ সোমবার দিনব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহন করেছে। অনুষ্ঠান সূচি নিম্নে প্রদান করা হলো: ১৬ই মার্চ-২০২৬, সোমবার, বাদ যোহর বীর মুক্তিযোদ্ধা, একুশে পদকপ্রাপ্ত ভাষা সৈনিক, স্বৈরাচার পতন সংগ্রামের অগ্রনায়ক, ক্রান্তিকালের কান্ডারী বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ১৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মিলাদ মাহফিল।
আয়োজনে: ড. খোন্দকার আকবর হোসেন (বাবলু), সদস্য, আহ্বায়ক কমিটি, মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপি ।
খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন-এর সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত: খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন (১৯৩৩-২০১১) আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার খিরাই পাচুরিয়া গ্রামে ১৯৩৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা খোন্দকার আবদুল হামিদ ছিলেন একজন মশহুর আলেম এবং তাঁর মাতা ছিলেন আকতারা খাতুন। খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ১৯৪৭ সালে মানিকগঞ্জ হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯৪৯ সালে মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫২ সালে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স), ১৯৫৩ সালে এমএ এবং ১৯৫৫ সালে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালে খোন্দকার দেলোয়ার বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থীর স্বপক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন। খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি মানিকগঞ্জ মহকুমা আদালতে আইন পেশায় নিয়োজিত হন। খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ১৯৫৭ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন এবং তখন থেকেই তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের শুরু। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধীদলের (কপ) প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে মানিকগঞ্জ মহকুমায় গঠিত ইলেকশন মনিটরিং কমিটির প্রধান ছিলেন খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। ১৯৬৫ সালে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পাটির মানিকগঞ্জ মহকুমা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। আইনজীবী সমিতিগুলোর কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি ১৯৬৬ সালে ছয়দফা কর্মসূচি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী গণআন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তিনি ১৯৭০ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পাটির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ছিলেন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক এবং তিনি মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকবাহিনীর গণহত্যা শুরুর পরপরই মানিকগঞ্জে গঠিত বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন খোন্দকার দেলোয়ার।
খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কর্তৃক ১৯৭৮ সালে গঠিত জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলে যোগ দেন এবং দলের মানিকগঞ্জ জেলা শাখার আহবায়ক নিযুক্ত হন। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার পর খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন দলের মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৯ সালে পুনরায় তিনি বিএনপির মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ সাল থেকে বিএনপির জাতীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি।
খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মানিকগঞ্জ-১ (ঘিওর-দৌলতপুর) নির্বাচনী এলাকা থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মানিকগঞ্জ-১ নির্বাচনী এলাকা থেকে পঞ্চম (১৯৯১), ষষ্ঠ (১৯৯৬), সপ্তম (১৯৯৬) ও অষ্টম (২০০১) সংসদে সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি পঞ্চম, ষষ্ঠ ও অষ্টম জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন সংসদীয় দলের চীফ হুইপ এবং সপ্তম জাতীয় সংসদে বিরোধী সংসদীয় দলের চীফ হুইপ ছিলেন। তিনি দুই মেয়াদে পার্লামেন্ট মেম্বার্স ক্লাবের সভাপতি এবং বিভিন্ন সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও সদস্য ছিলেন। খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন বেশসংখ্যক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জনকল্যাণমূলক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তিনি ১৯৭৬-১৯৭৮ এবং ১৯৮৪-১৯৮৫ সালে মানিকগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সভাপতি এবং ১৯৭৯-১৯৮১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি ছিলেন ‘মানিকগঞ্জ খোন্দকার নূরুল হোসেন ল’ একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ।
তিনি তাঁর নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন কলেজ এবং পাচুড়িয়া মাদ্রাসা। ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলার সার্বিক উন্নয়নে তাঁর ব্যাপক অবদান রয়েছে। আশির দশকের শেষদিকে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারী শাসন বিরোধী আন্দোলনে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় মোর্চা লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। তত্বাবধায়ক সরকার কৃর্তক ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির পর বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হন। গ্রেফতার হওয়ার প্রাক্কালে তিনি দলের মহাসচিব আব্দুল মান্না্ন ভূইয়াকে বহিস্কার করে তদস্থলে স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে দলের মহাসচিব পদে নিয়োগ দান করেন। এক-এগারোর পর যখন বেগম খালেদা জিয়াসহ দলের সিনিয়র নেতৃবর্গ আটক ছিলেন, খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন তখন অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে সঙ্কটের মোকাবেলা করে দলের ঐক্য ও অখন্ডতা অক্ষুন্ন রাখেন। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলের পর পুনরায় তিনি বিএনপির মহাসচিব নিযুক্ত হন।
খোন্দকার দেলোয়ার স্মরণীয় হয়ে থাকবেন জাতীয় স্বার্থে পালিত তাঁর সংগ্রামী ভূমিকার জন্য। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে ক্ষমতা দখলকারী সেনাসমর্থিত সরকারের দিনগুলোতে তাঁর ভূমিকার কথা স্মরণ করলে দেখা যাবে, গণতন্ত্র পুনরুদ্বারের সংগ্রামে তিনি ছিলেন আপসহীন এক দুর্দান্ত সাহসী নেতা। সেটা এমন এক সময় ছিল ওই সরকার যখন দুই নেত্রীকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়ার এবং রাজনীতিবিদদের উতখ্যাত করার ভয়ঙ্কর চেষ্টা চালাচ্ছিল। সরকার একদিকে দলীয় নেতাদের গ্রেফতার করেছিল, অন্যদিকে দলের ভেতর থেকে কোনো কোনো নেতা গোপনে সরকারকে সহযোগিতা দেয়ায় সে সময় বিশেষ করে বিএনপির অস্থিত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল। তেমন এক কঠিন সময়ে নিজে গ্রেফতার বরণ করার ঠিক আগমুহুর্তে খোন্দকার দেলোয়ারকে বিএনপির মহাসচিব পদে নিযুক্ত করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। দলের জন্য তো বটেই, এই সিদ্বান্ত দেশ ও জাতির জন্যও অত্যন্ত সঠিক এবং সুফলপ্রসূ বলে প্রমাণিত হয়েছে। মামলা ও গ্রেফতারের হুমকি এবং দমন-পীড়নের ভয়-ভীতি দেখানোসহ সব পন্থাতেই তাকে বাগে আনার চেষ্টা করেছে সরকার। দলীয় সভা-সমাবেশের পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলন ও টিভির টকশোতে তিনি দুর্দান্ত সাহস বক্তব্য রেখেছেন, সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং জাতীয় নির্বাচন দেয়ার দাবিতে সোচ্চার থেকেছেন। প্রবীণ সাংবাদিক আতাউস সামাদ যথার্থই বলেছেন, খোন্দকার দেলোয়ার ছিলেন রাজনীতির দুঃসময়ের কাণ্ডারি। বলা বাহুল্য, গভীর দেশপ্রেম এবং গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন মনোভাব ছিল বলেই খোন্দকার দেলোয়ারের পক্ষেে এমন অনমনীয় অবস্থান নেয়া এবং বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করা সম্ভব হয়েছিল।
একই কারণে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারসহ রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রতিপক্ষরা পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। আমরাও মনে করি, খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মনে-প্রাণে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। নিজে বিএনপি করলেও অন্য দলগুলোর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধ ছিল। ছিল পরমতসহিষ্ণুতা। প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনা করতেন তিনি, কিন্তু বিদ্বেষ বা শত্রুতা নয়, সবকিছুর পেছনে থাকত কেবলই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। জাতীয় স্বার্থে কখনও একচুল পরিমাণ ছাড় দেননি তিনি। নিখাদ ছিল তাঁর দেশপ্রেম। ভাষা আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকার জন্য খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন একুশে পদকে ভূষিত হন। সিঙ্গাপুরে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ২০১১ সালের ১৬ই মার্চ তাঁর মৃত্যু হয়।
আলোকিত প্রতিদিন/এপি

