আজ শুক্রবার, ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ।   ৬ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বিমানে ফোন ‘এরোপ্লেন মোড’ করার আদ্যোপান্ত

আরো খবর

 জান্নাত আক্তার রিয়া:

স্মার্টফোনের সেটিংস অপশনে গেলেই আমরা একটি ছোট বিমানের আইকন দেখতে পাই, যা ‘এরোপ্লেন মোড’ নামে পরিচিত। সাধারণ মানুষের কাছে এটি কেবল একটি সাধারণ বাটন মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এই ফিচারের মূল উদ্দেশ্য হলো ফোন বন্ধ না করেই এর সমস্ত ওয়্যারলেস বা বেতার তরঙ্গ নির্গমন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া। এটি সক্রিয় করলে ফোনের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি (RF) সিগন্যালগুলো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যার ফলে সিম কার্ডের সেলুলার নেটওয়ার্ক, ওয়াই-ফাই এবং ব্লুটুথ চিপগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

এরোপ্লেন মোড বা অফলাইন মোড কোনো একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির একক আবিস্কার নয়, বরং এটি টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার এবং এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ২০০০-এর শুরুর দিকে যখন মোবাইল ফোনের ব্যবহার বাড়তে শুরু করে, তখন দেখা গেল মোবাইলের শক্তিশালী রেডিও তরঙ্গ বিমানের নেভিগেশন এবং পাইলটের হেডফোনে এক ধরনের অস্বস্তিকর শব্দ তৈরি করছে। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ২০০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ফোন নির্মাতারা এই বিশেষ ফিচারটি যুক্ত করেন। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল বিমান উড্ডয়নের সময় ফোন বন্ধ না করেই যাত্রী যেন ফোনের গ্যালারি, অফলাইন গেম বা মিউজিকের মতো ফিচারগুলো ব্যবহার করতে পারেন।

বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে জনপ্রিয় সব স্মার্টফোন ব্র্যান্ড যেমন: Samsung, Xiaomi (Redmi), Vivo, Oppo, Realme, iPhone, ও Infinix সহ সব ধরনের অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস ডিভাইসে এই সিস্টেমটি ডিফল্ট হিসেবে দেওয়া থাকে। যখন একজন ব্যবহারকারী এরোপ্লেন মোড অন করেন, তখন ফোনের ভেতরে থাকা রেডিও ট্রান্সমিটারগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশের প্রধান সিম অপারেটর যেমন: গ্রামীণফোন (GP), রবি (Robi), বাংলালিংক (BL), এয়ারটেল এবং সরকারি সিম টেলিটক সবগুলোই নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে কাজ করে। এরোপ্লেন মোড চালু করার সাথে সাথে ফোনটি এই অপারেটরদের টাওয়ার থেকে সিগন্যাল নেওয়া এবং পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। ফলে মুহূর্তের মধ্যেই ফোনে ‘No Service’ লেখা চলে আসে। এটি সিমের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং সিগন্যাল রিসেট করার একটি চমৎকার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

আপনি যখন এয়ারপোর্টে পৌঁছান এবং বিমানে আসন গ্রহণ করেন, তখন টেক-অফ বা উড্ডয়নের ঠিক আগে কেবিন ক্রুরা ঘোষণা দেন “অনুগ্রহ করে আপনার মোবাইল ফোনটি বন্ধ করুন অথবা এরোপ্লেন মোড চালু করুন।” এটি মূলত দুটি প্রধান কারণে বলা হয়। প্রথমত, বিমানের উড্ডয়ন ও অবতরণের সময়টি সবচেয়ে সংবেদনশীল থাকে, তখন পাইলটদের গ্রাউন্ড কন্ট্রোলের সাথে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখতে হয়। সামান্য মোবাইল সিগন্যালও এই রেডিও যোগাযোগে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিমান যখন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে আকাশে ওঠে, তখন ফোনটি নিচের শত শত টাওয়ারের সাথে দ্রুত সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করে, যা মোবাইল নেটওয়ার্ক সিস্টেমে জট তৈরি করতে পারে।

বিমানে থাকা ছাড়াও সাধারণ অবস্থায় এরোপ্লেন মোড আমাদের বেশ কিছু সুবিধা দিয়ে থাকে। যেমন, এটি ফোনের ব্যাটারি সাশ্রয় করতে অভাবনীয় ভূমিকা রাখে। যখন আমরা এমন কোনো এলাকায় থাকি যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক খুব দুর্বল, তখন ফোন বারবার সিগন্যাল খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা করে এবং এতে ফোনের ব্যাটারি খুব দ্রুত খরচ হয়ে যায়। এমন অবস্থায় এরোপ্লেন মোড চালু করলে ব্যাটারির অপচয় বন্ধ হয়। দ্বিতীয়ত, ফোন দ্রুত চার্জ করার ক্ষেত্রে এটি একটি পরীক্ষিত পদ্ধতি। নেটওয়ার্ক ও ব্যাকগ্রাউন্ড ডাটা বন্ধ থাকায় ফোন অনেক দ্রুত চার্জ গ্রহণ করতে পারে। অনেক সময় মোবাইলে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না বা ডাটা কানেকশন কাজ করে না, এমন সময় ফোন রিস্টার্ট না দিয়ে শুধু এরোপ্লেন মোড কয়েক সেকেন্ডের জন্য অন করে আবার অফ করলেই নেটওয়ার্ক রিসেট হয়ে যায় এবং সমস্যার সমাধান হয়। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ বা বিশ্রামের সময় অপ্রয়োজনীয় কল বা মেসেজের বিরক্তি এড়াতে এটি একটি আদর্শ উপায়।

অনেকে মনে করেন এরোপ্লেন মোড চালু না করলে বিমান নিশ্চিতভাবে ক্র্যাশ করবে, তবে এটি একটি ভুল ধারণা। মূলত এটি কোনো বড় দুর্ঘটনা রোধের চেয়ে বিমানের সূক্ষ্ম যোগাযোগ ব্যবস্থাকে পরিষ্কার ও নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্যই ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে অনেক এয়ারলাইনস ইন-ফ্লাইট ওয়াই-ফাই ব্যবহারের অনুমতি দেয়, যা বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সিতে কাজ করে এবং বিমানের জন্য নিরাপদ। পরিশেষে বলা যায়, এরোপ্লেন মোড কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা বা বিমানের নিয়ম নয়, বরং এটি ডিজিটাল জীবনে ভারসাম্য বজায় রাখার একটি স্মার্ট টুল। আপনি যে ব্র্যান্ডেরই ফোন বা যে সিমই ব্যবহার করেন না কেন, প্রাথমিক লেভেল থেকে এই ফিচারের সঠিক ব্যবহার জানা থাকলে আপনি আপনার স্মার্টফোনকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারবেন। এটি যেমন আকাশপথে হাজার হাজার যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনে ফোনের দীর্ঘস্থায়িত্ব বাড়াতেও সাহায্য করে।

আলোকিত প্রতিদিন /০৫ মার্চ ২০২৬ /মওম

- Advertisement -
- Advertisement -