এমএইচ চৌধুরীঃ
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুগ শ্রেষ্ঠ সাহসী কিংবদন্তি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধি মহা বীরের বিপ্লবী বিদায়- ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউ রেজা পহলবীর শাসনামলে তিন বছরের জন্য নির্বাসনে পাঠানোর পূর্বে তাঁকে ৬ বার গ্রেফতার করা হয়।
ইসলামি বিপ্লবের পর ১৯৮১ সালের জুনে তাঁকে গুপ্তহত্যার প্রচেষ্টা চালানো হয়, যার ফলে তার ডানহাত অসাড় হয়ে পড়ে।১৯৮০-র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধকালীন খামেনেয়ী ইরানের অন্যতম নেতা ছিলেন এবং সেই সময় তিনি অধুনা শক্তিশালী ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে দৃঢ় বন্ধন গড়ে তোলেন।
এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ এবং এর কমান্ডারদের নির্বাচন ও অপসারণ তিনি করে থাকেন। খামেনেয়ীর বিরোধীদের দমনের ক্ষেত্রে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীকে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত খামেনেয়ী ইরানের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তৎকালীন ও প্রথম সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনীর ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। মৃত্যুর অনতিবিলম্ব পূর্বে খোমেনী কর্তৃক মনোনীত তার উত্তরসূরী হোসেইন আলী মোন্তাজেরীর সঙ্গে একটি মতবিরোধ দেখা দেয়। ফলে তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী কে হবেন সে ব্যাপারে কোনো ঐক্যমত্য ছিল না।
১৯৮৯ সালের ৪ জুন বিশেষজ্ঞ পরিষদ ৪৯ বছর বয়সী খামেনেয়ীকে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করে। আকবর হাশেমী রফসঞ্জানীর মতে মৃত্যুর পূর্বে খোমেনী তার উত্তরসূরী হিসেবে খামেনেয়ীকে মনোনীত করে গিয়ে ছিলেন। ১৯৭৯ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে খামেনেয়ী আস্তান কুদস রাজাওয়ীর সেবকদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনেয়ী ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।তিনি ইরানের রাষ্ট্রপ্রধান, সামরিক বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ, ফরমান জারিকারী এবং অর্থনীতি, পরিবেশ, পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় পরিকল্পনা প্রভৃতি খাতে সরকারি নীতিনির্ধারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগ্রহীতা।করিম সাজ্জাদপুরীর মতে সরকারের নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি সামরিক বাহিনী ও গণমাধ্যমের ওপর খামেনেয়ীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ পরিষদ, রাষ্ট্রপতি ও মজলিসের (আইনসভা) সকল পদপ্রার্থীরা অবিভাবক পরিষদ দ্বারা পুননীরিক্ষিত হন, আর এই অবিভাবক পরিষদের সদস্যগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা কর্তৃক মনোনীত হন। এরকম ঘটনাও ঘটেছে যেখানে নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর অবিভাবক পরিষদের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও খামেনেয়ীর নির্দেশে তা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।ফোর্বস সাময়িকী ২০১২ সালে তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ২১ জন ব্যক্তির তালিকায় স্থান দেয়।খামেনেয়ী পারমাণবিক অস্ত্র সম্পর্কে ফতোয়া জারি করে বলেন যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার ইসলামি বিধান অনুযায়ী নিষিদ্ধ। পশ্চিমা বিশ্বের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আজীবন এই মানুষটি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ইসলামি বিপ্লব ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা, শিয়া-সুন্নি বিভেদ মিটিয়ে মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে কাজ করেছেন। তিনি বিপন্ন ফিলিস্তিনীদের পক্ষে এবং জাতিগত আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনকে নিজের জীবন ও কর্মের মুল স্তম্ভ বানিয়ে, এর ওপর ভিত্তি করে আবর্তিত তাঁর দীর্ঘ ৩৭ বছরের শাসনকাল কাটিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য ভাষণ দিয়েছেন তিনি তাঁর সে কথাগুলো ইরানের আপামর জনগণ ও পৃথিবীর সমস্ত ইসলামী বিপ্লবীদের সময়োপযোগী সাহসী দিকনির্দেশনা দিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে লড়েছেন জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত। তাঁর বলা কয়েকটি কথা স্মরণীয়ঃ
ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ ধরে রাখতে তিনি বলতেন-
১ “আত্মসমর্পণের চেয়ে প্রতিরোধের খরচ অনেক কম।
২ “যদি কোনো জাতি শত্রুর সামনে মাথা নত করে, তবে তাকে আরও বড় অপমান ও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।”
৩ “ফিলিস্তিন ইস্যুকে তিনি সবসময়ই মুসলিম উম্মাহর প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখতেন।
৪” ইসরায়েলের অস্তিত্ব সম্পর্কে বলতেন-
“ইসরায়েল কোনো রাষ্ট্র নয়, এটি ফিলিস্তিনি জাতি এবং অন্যান্য মুসলিম জাতিগুলোর বিরুদ্ধে একটি সন্ত্রাসী গ্যারিসন (সৈনিক ঘাঁটি)। এই অঞ্চলের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এটি পশ্চিমাপন্থী দেশগুলোর একটি সন্ত্রাসী আস্তানা।
৫” যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে বলতেন- “আমেরিকানদের ওপর কখনো বিশ্বাস করা যায় না। তারা হাসিমুখে কথা বলে ঠিকই, কিন্তু তাদের পেছনের হাতে খঞ্জর লুকানো থাকে।”
৬” পরমাণু কর্মসূচি ও বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তাঁর বিখ্যাত ফতোয়া ও বক্তব্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত বিষয়ে বলেছেন- “আমরা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চাই না, কারণ আমাদের ধর্ম (ইসলাম) গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি বা ব্যবহার করাকে হারাম (নিষিদ্ধ) ঘোষণা করেছে। আমাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও বৈজ্ঞানিক।
৭” স্বনির্ভরতা অর্জনের বিষয়ে বলেছেন-
“তরুণ প্রজন্মের উচিত বিজ্ঞানের শিখরে পৌঁছানো। কারণ জ্ঞানই হলো শক্তি। যে জাতির জ্ঞান নেই, তাকে অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়।
৮”মুসলিম ঐক্য শিয়া-সুন্নি বিভেদ সম্পর্কে বলতেন-“যারা শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে বিবাদ উস্কে দেয়, তারা না শিয়াদের বন্ধু, না সুন্নিদের বন্ধু। তারা আসলে ইসলামের শত্রু এবং সাম্রাজ্যবাদীদের ক্রীড়নক। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতিটি বক্তব্যে একটি শক্তিশালী ‘জাতীয় সংহতি’ এবং ‘পাশ্চাত্যের ওপর নির্ভরশীলতা ত্যাগের’ আহ্বান থাকতো। তিনি মনে করতেন, ইরানকে বিশ্বের বুকে টিকে থাকতে হলে সামরিক এবং বৈজ্ঞানিক উভয় ক্ষেত্রেই শক্তিশালী হতে হবে। যেটা শুধু ইরান নয়, পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
আলোকিত প্রতিদিন/০১মার্চ ২০২৬/মওম

