আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
আমেরিকা কি অভিবাসীদের দেশ থেকে এখন প্রবাসীদের দেশে পরিণত হচ্ছে? ২৫০ বছরে পদার্পণ করা দেশটির সমসাময়িক চিত্র অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে এক ঐতিহাসিক এবং নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে, যত মানুষ দেশটিতে প্রবেশ করেছেন, তার চেয়ে বেশি মানুষ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার পর এমন চিত্র আর দেখা যায়নি। আমেরিকান সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন এই গণপ্রস্থান বা নেগেটিভ নেট মাইগ্রেশনকে তাদের কঠোর অভিবাসন নীতির সাফল্য হিসেবে দেখলেও মুদ্রার উল্টো পিঠ বলছে ভিন্ন কথা। কেবল অবৈধ অভিবাসীরাই নন, রেকর্ডসংখ্যক মার্কিন নাগরিকও এখন উন্নত জীবন, সাশ্রয়ী ব্যয় এবং নিরাপত্তার খোঁজে পাড়ি জমাচ্ছেন ভিনদেশে।‘স্বপ্নের দেশ’ ছেড়ে পালাচ্ছেন খোদ মার্কিনিরাই
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য এখন ‘আমেরিকান ড্রিম’ বা আমেরিকান স্বপ্ন মানেই হলো দেশটিতে আর বাস না করা। লিসবনের অলিগলি থেকে শুরু করে ডাবলিনের ট্রেন্ডি জেলাগুলোতে এখন পর্তুগিজ বা আইরিশ ভাষার চেয়ে আমেরিকান ইংরেজিই বেশি শোনা যাচ্ছে। ছাত্র, ফ্রিল্যান্সার থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ; সবাই এখন বিদেশের মাটিতে ভাগ্য খুঁজছেন।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ হারিয়েছে। ২০২৬ সালে এই বহির্গমন আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেখানে ২০২৩ সালে দেশটিতে প্রবেশের সংখ্যা ছিল ৬০ লাখ, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৬-২৭ লাখে।
সাক্ষাৎকারে অনেক মার্কিন নাগরিক জানিয়েছেন, জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়, বন্দুক হামলাসহ সহিংস অপরাধ এবং অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তাঁদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে।
১ লাখেরও বেশি মার্কিন শিক্ষার্থী এখন সস্তায় ডিগ্রির জন্য বিদেশে পড়ছেন। মেক্সিকোর সীমান্তে মাশরুমের মতো গজিয়ে ওঠা নার্সিং হোমগুলোতে ঠাঁই নিচ্ছেন মার্কিন বৃদ্ধরা, কারণ সেখানে সেবার খরচ অনেক কম। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে লিসবনে পাড়ি জমানো মাইকেল লে ব্ল্যাংক বলেন, আমার ৮ বছরের ছেলের স্কুলে দুইবার বন্দুক হামলার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর আমি সিদ্ধান্ত নিই আর এখানে নয়। ইউরোপে জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত।
ইউরোপের ২৭টি দেশের প্রায় প্রতিটিতেই আমেরিকানদের বসবাসের হার রেকর্ড ছাড়িয়েছে। পর্তুগালে আমেরিকানদের সংখ্যা কোভিড-পরবর্তী সময়ে ৫০০ শতাংশ বেড়েছে। গত বছর জার্মানি এবং আয়ারল্যান্ডে যত জার্মান বা আইরিশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরেছেন, তার চেয়ে বেশি আমেরিকান ওই দেশগুলোতে গিয়ে স্থায়ী হয়েছেন।
বিদেশে আয় করা অর্থের ওপর কর ছাড়ের সুবিধা থাকায় অনেক মার্কিন নাগরিক এখন আলবেনিয়ার মতো দেশেও ভিড় করছেন। এমনকি মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদনের সংখ্যাও ২০২৪ সালে ৪৮ শতাংশ বেড়েছে।
আমেরিকানদের বিদেশে পাঠাতে এখন কাজ করছে বিশেষায়িত অনেক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ব্ল্যাক্সিট গ্লোবাল এবং নারীদের জন্য শি হিট রিফ্রেশ বেশ জনপ্রিয়। গ্যালপ-এর জরিপে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মার্কিন নারীদের ৪০ শতাংশই সুযোগ পেলে স্থায়ীভাবে বিদেশে চলে যেতে চান।
একসময় আমেরিকানরা মনে করতেন তাদের দেশই বিশ্বের সেরা। কিন্তু এখন টেম্পল ইউনিভার্সিটির গবেষক ক্যাটলিন জয়েস বলছেন, আমেরিকানরা বিদেশে গিয়ে দেখছেন সেখানকার জীবন অনেক ভালো। তারা ইউরোপের সামাজিক গণতান্ত্রিক নীতিগুলো পছন্দ করছেন।
আলোকিত প্রতিদিন/২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬/মওম

