বিশেষ প্রতিবেদক: গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুরস্কার ঘোষণার পর সমালোচনার মুখে সেটি স্থগিতও করা হয়। পরে পুরস্কারের তালিকা থেকে তিনজনের নাম বাদ দিয়ে নতুন করে পুরস্কার ঘোষণা করতে বাধ্য হয় বাংলা একাডেমি।
এবার বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৫ সালের জন্য নয়টি ক্যাটাগরিতে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্তদের নামের তালিকা ঘোষণা করা হয় সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি)। প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, এ বছর কবিতায় পুরস্কার পাওয়ার কথা ছিল কবি মোহন রায়হানের। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) অমর একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে তার এ পুরস্কার নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মোহন রায়হানকে পুরস্কারের জন্য বাছাই করায় আপত্তি জানিয়েছেন প্রগতিশীল ও জাতীয়তাবাদী ধারার ২৭ জন কবি ও লেখক। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) এক যৌথ বিবৃতিতে নিন্দা জানিয়ে মোহন রায়হানের পুরস্কারের প্রত্যাহারের দাবি জানান। বিবৃতিদাতাদের অভিযোগ যা নিয়ে বিবৃতিদাতাদের অভিযোগ, মোহন রায়হান ফ্যাসিবাদের দোসর, কবিতা ব্যবসায়ী এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ‘কর্নেল তাহেরের খুনি’ আখ্যাদানকারী। বিবৃতিতে বলা হয়, ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিপক্ষে অবস্থানকারী অসংখ্য দেশপ্রেমিক ও জ্যেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিকদের বাদ দিয়ে বর্তমান সময়ে তাকে এই পদক দেওয়ার মাধ্যমে ঠিক কী রাজনৈতিক অর্জন হবে, তা আমাদের জানা নেই। আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এবং বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাখার চলমান প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি চিহ্নিত ‘আওয়ামী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সিন্ডিকেট’ সুকৌশলে এই ধরনের বিতর্কিত পদক্ষেপ গ্রহণ করাচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিএনপি ও তারেক রহমানকে জনগণের কাছে দ্রুত অজনপ্রিয় করে তোলা এবং দলটির রাজনৈতিক পতন ত্বরান্বিত করা।
এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ৫ আগস্টের পর এই চিহ্নিত আওয়ামী সিন্ডিকেট ফ্যাসিবাদী ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’-এর ব্যানারে নানা সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে পুনরায় মাঠে নেমেছে। মূলত একটি দেশবিরোধী চিহ্নিত সাংস্কৃতিক চক্র রাষ্ট্রীয় নানা সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার অবৈধ চেষ্টায় নানা ছলচাতুরীর মাধ্যমে তাদের এই হীন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তারা দীর্ঘদিনের নির্যাতিত ও বঞ্চিত লেখকদের পাশ কাটিয়ে সুকৌশলে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। অথচ এদের বেশিরভাগই আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসর; যাদের মধ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে কটূক্তিকারী এবং ইতিহাস বিকৃতিকারী ‘ইনডেমনিটি’ নাটকের কুশীলব শ্যামল জাকারিয়াসহ অন্যরা রয়েছেন।
২৭ কবি-সাহিত্যিকের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হলেও এতে স্বাক্ষর করেছেন ২২ জন। তারা হলেন—একুশে পদকপ্রাপ্ত ছড়াকার ও সিনিয়র সাংবাদিক আবু সালেহ, কবি মাহবুব হাসান, কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ, কবি শাহীন রেজা, কবি শামসুদ্দিন হারুন, কবি ফেরদৌস সালাম, ছড়াকার আতিক হেলাল, কথাসাহিত্যিক ইউসুফ শরীফ, কবি কামার ফরিদ, কবি তরঙ্গ আনোয়ার, কবি আইয়ুব সৈয়দ, কবি খান মোহাম্মদ খালেদ, ছড়াকার সালাম ফারুক, কবি শহীদ আজাদ, ছড়াকার জুলফিকার শাহাদাত, কবি আবু জুবায়ের, কবি শান্তা মারিয়া, কবি শাহিন রিজভি, কবি সৈয়দ রনো, ছড়াকার আমিনুল ইসলাম মামুন, কবি শামীমা চৌধুরী ও কবি ঢালী মোহাম্মদ দেলোয়ার।
বিবৃতি স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে একজন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কবি শামসুদ্দিন হারুন। আলোকিত প্রতিদিনকে তিনি বলেন, অবিলম্বে পুরস্কারের তালিকা থেকে বিতর্কিত ব্যক্তির নাম প্রত্যাহার করে একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও যোগ্য কবিকে এই সম্মাননা প্রদানের জোর দাবি জানাচ্ছি।
বিবৃতিদাতাদের মধ্যে অন্যতম জাতীয়তাবাদী লেখক ফোরামের সভাপতি কবি শাহীন রেজা এ বিষয়ে তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘যাকে আমি খুনি বলে বিশ্বাস করি; তার ছেলের কাছ থেকে পদক নিতে আদর্শ কেন বাধা হয়ে দাঁড়ায় না?’
কবি ও সম্পাদক সৈয়দ রনো বলেছেন- বিবৃতিদাতাদের তালিকায়। তিনি বলেন, মোহন রায়হানের মতো ফ্যাসিস্টকে পুরস্কার প্রদানের নিন্দা জানিয়ে তিনি এবারের বইমেলা বয়কট করেছেন। মোহন রায়হানের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, প্রিয়জন প্রকাশনী আয়োজিত শহীদ জিয়াউর রহমান স্মরণে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে মোহন রায়হানকে দাওয়াত করা হলে মোহন রায়হান স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কর্নেল তাহেরের খুনি স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের অনুষ্ঠানে তিনি যাবেন না। ন্যূনতম নৈতিকতা, ব্যক্তিত্ব বা আদর্শ থাকলে জিয়াপুত্রের হাত থেকে তিনি কীভাবে পুরস্কার নেন।
জিয়াউর রহমানকে নিয়ে কী লিখেছেন মোহন রায়হান বিবৃতি দেওয়া কবি-সাহিত্যিকরা বলছেন, মোহন রায়হান ‘তাহেরের স্বপ্ন’ শিরোনামের একটি কবিতায় শহীদ রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে নিয়ে কটূক্তি করেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘আর হলোনা বাড়ি ফেরা’ শীর্ষক মোহন রায়হানের চতুর্থ কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে কর্নেল তাহেরকে নিয়ে লেখা ওই কবিতাটি। পাঠকের সুবিধার্থে পুরো কবিতাটি এখানে তুলে দেওয়া হলো—
যিনি আবু তাহের কর্নেল
যিনি ফাঁসিমঞ্চে হাসলেন
তিনি এখন লজ্জায়
কালো হন, প্রতিদিন আমার স্বপ্নের মধ্যে।
গতকাল ভোররাতে আমাকে সে
নিয়ে গেল দেশের একটি সেনাবাসে
ইশারায় খুব আস্তে আস্তে তাঁর ক্র্যাচে
হেঁটে হেঁটে সারি সারি জোয়ানের
কবরের পাশে দাঁড়ালেন।
অনেকের গলায় ফাঁসির চিহ্ন
কারো বুক গুলিবিদ্ধ, কারো দেহ থেঁতলানো,
তারা প্রত্যেকেই হঠাৎ জেগে উঠল
অভিবাদন জানাল পেশাগত কায়দায়;
তাহের তাদের প্রত্যেকের সাথে করমর্দন ক’রে,
আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, আমি বিপুল উৎসাহে
আনন্দে তাদের প্রতি হাত এগিয়ে দিলাম
কিন্তু তারা প্রত্যেকে আমাকে প্রত্যাখ্যান ক’রল;
ঘৃণায় তাদের চোখ মুখ ভুরু নাক কুঞ্চিত হল।
অপমানে আমি চিৎকার ক’রতে গেলে
তাহের আমার মুখ চেপে ধরলেন;
সরে আসলেন আমাকে নিয়ে।
হাঁটতে হাঁটতে ভোরের রুপালি হাওয়ায়
বুক ভরে নিয়ে আমরা এলাম শেরেবাংলা নগর,
বিরাট চত্বর পেরিয়ে মূল্যবান পাথরে
নির্মিত কবরটির কাছে আসতেই লাফ দিয়ে দাঁড়ালেন
একজন জেনারেল, থরথর কাঁপন শুরু হল তার
হাতজোড় করে ক্ষমাভিক্ষা করলেন;
মুদু হেসে তাহের তখন তার কাঁধ স্পর্শ করলেন
বিনীত বন্ধুর মতো, নতজানু জেনারেল
তাহেরের প্রতি হস্ত প্রসারণ করলেন;
কিন্তু তাহের ভ্রুক্ষেপ করলেন না বরঞ্চ কঠিন
শক্ত হল তাঁর চোয়াল, ঘৃণায় উপচে পড়ল চোখ।
সেখান থেকে লাল-সালু-ঘেরা এক মঞ্চে
নিয়ে এলেন আমাকে তিনি; ‘তাহের, তোমায় লাল সালাম’
হাজার জনতার ভিড়ে; তাহের তোমায় লাল সালাম
স্লোগানে ফেটে গেল আকাশ-বাতাস,
কয়েকজন ধবধবে পা’জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত
থলথলে গাল নেতা এগিয়ে এলেন তাঁর দিকে; একজন
তাঁর চোখের চশমা খুললেন, একজন তাঁর ভরাট কণ্ঠের
গম্ভীর আওয়াজ জনতার কণ্ঠে মিলিয়ে দিলেন।
কিন্তু তাহের তাদের প্রত্যেককে পাশ কাটিয়ে
ধীরপায়ে তাঁর কাঠের ক্র্যাচ ঠুকে ঠুকে
মাইকের সামনে এগিয়ে গেলেন,
বিশাল জনসমুদ্র মুহূর্তে নীরব হ’য়ে গেল।
তাহের শুধু কান্নায় ভেঙে প’ড়ে বললেন :
স্বাধীনতাযুদ্ধে আমার একটি পা শুধু উড়ে গেছে
কিন্তু আমি খোঁড়া নই
অথচ তোমরা পা থাকতেও পঙ্গু।
সাহিত্য সমালোচকরা যা বলছেন-
কবিতাটি নিয়ে কবি ও প্রাবন্ধিক বকুল আশরফের মতে, এ কবিতায় রূপকভাবে জিয়াউর রহমানকে কর্নেল তাহেরের খুনি ও কবরে শোয়া ‘সারি সারি জোয়ান’-এর গণহত্যাকারী হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছেন মোহন রায়হান। এশিয়া পোস্টকে বকুল আশরাফ বলেন, ‘কবিতাটিতে দেখানো হয়েছে মোহন রায়হান স্বপ্নে কর্নেল তাহেরকে দেখেন। তাহের তাকে নিয়ে যান সেনাবাহিনীর কবরস্থানে, যেখানে নিহত সৈনিকদের কবর। পরে তারা শেরেবাংলা নগরে যান, যেখানে কবরে শায়িত এক জেনারেল ক্ষমা চান। আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন থেকে আমরা দেখে আসছি, তিনি (মোহন রায়হান) ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে জিয়াউর রহমানকে স্বৈরশাসক, হত্যাকারী ইত্যাদি বলে বিষোদ্গার করতেন। জিয়াউর রহমানকে ভিলেন বানানো আর জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে নিন্দা-মন্দ করাই ছিল তাদের তৎকালীন জাসদের রাজনীতি।’
বকুল আশরাফ আরও বলেন, কবিতার বিশেষ প্যারায় উল্লেখ আছে, ‘‘হাঁটতে হাঁটতে ভোরের রুপালি হাওয়ায় বুক ভরে নিয়ে আমরা এলাম শেরেবাংলা নগর,/ বিরাট চত্বর পেরিয়ে মূল্যবান পাথরে নির্মিত কবরটির কাছে আসতেই লাফ দিয়ে দাঁড়ালেন একজন জেনারেল,/ থরথর কাঁপন শুরু হল তার হাতজোড় করে ক্ষমাভিক্ষা করলেন; মৃদু হেসে তাহের তখন তার কাঁধ স্পর্শ করলেন/ বিনীত বন্ধুর মতো, নতজানু জেনারেল তাহেরের প্রতি হস্ত প্রসারণ করলেন;/ কিন্তু তাহের ভ্রুক্ষেপ করলেন না বরঞ্চ কঠিন শক্ত হল তাঁর চোয়াল, ঘৃণায় উপচে পড়ল চোখ ।’’ জিয়াউর রহমানকে তাহেরের ‘প্রতিপক্ষ’ ও রূপক অর্থে ‘হত্যাকারী’ হিসেবে দেখিয়ে তার প্রতি ‘উপচে পড়া ঘৃণা’ দেখিয়েছেন মোহন রায়হান।
মোহন রায়হানের আলোচিত কবিতা নিয়ে বকুল আশরাফের ব্যাখ্যা সমর্থন করে বিশিষ্ট কবি ও মুক্তিযোদ্ধা ড. মাহবুব হাসান বলেন, এটা স্পষ্ট মোহন রায়হানের কবিতাটি একটি উদ্দেশ্যমূলক রচনা। কবিতাটিতে দেখানো হয়েছে জিয়াউর রহমান কবর থেকে উঠে কর্নেল তাহেরকে স্যালুট করছেন। এটা হয় কীভাবে। জিয়া তো তার সিনিয়র ছিলেন। আর কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দিয়েছে তৎকালীন সামরিক আদালত। এখানে জিয়াকে জড়ানোটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অগ্রহণীয় বলে মনে করেন তিনি।
মোহন রায়হান যা বলছেন: মোহন রায়হানের পুরস্কার পাওয়া নিয়ে বিরোধিতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, যারা আমাকে নিয়ে কথা বলছে তারা বহু লোককে দিয়ে তদবির করেও পুরস্কার পায়নি। তাই খেপে গেছে। তারা এরশাদের দালাল ছিল। সব জায়গায় যখন যে সরকার আছে, তার সুবিধা নিয়েছে। আমাকে দেখান, আমি কারও সুবিধা নিয়েছি কি না। আমার কোনো ক্ষমতার মোহ নেই, কোনো পুরস্কারের মোহ নেই। এই পুরস্কারের জন্য আমার কোনো প্রত্যাশাও নেই। পুরস্কার না নিলে আমার কী আসে যায়?
জিয়াউর রহমানকে কটূক্তি করে কবিতা লেখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু-মিত্র বলে কিছু থাকে না। হ্যাঁ—আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে অটুট থাকা যায়। কিন্তু আন্দোলনের কৌশল হিসেবে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হয়। আমি তো তখন জিয়াউর রহমানকে নিয়ে, তাহেরকে নিয়ে কবিতা লিখেছি। স্বাভাবিকভাবে জিয়াউর রহমান এসেছে। আমি যখন জাসদের (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছি—হাসানুল হক ইনু যখন শেখ হাসিনার সঙ্গে ঐক্য করল তখন আমরা একটি গ্রুপ নিয়ে চলে আসি।
তিনি আরও বলেন, আমি যখন যেটা সঠিক মনে করেছি, সেটার প্রতিবাদ করেছি। আমি কখনোই দলদাস ছিলাম না। জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে আমি অংশ নিয়েছি। রাজপথে ছিলাম। সেসবের প্রমাণও আছে। এরপর আমরা কবিতা পরিষদ পুনর্গঠন করেছি এবং বৈষম্যমুক্তির জন্য কবিতা-স্লোগান দিয়ে উৎসব করেছি।
বিতর্ক ওঠার পর পুরস্কার নিয়ে কী ভাবছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মোহন রায়হান বলেন, তারা (বিবৃতিদাতারা) যা বলছে, তা ভুল। তারা যদি বিএনপিকে কনভিন্স করে সেটাও ভুলভাবে কনভিন্স করবে। এতে আমার কিছু আসে যায় না। আমি কোনো পুরস্কারের জন্য লালায়িত নই।
কবি আবু জুবায়ের ফেসবুক পোস্টে লিখেন: শুধু কবিতা নয়, মোহনের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ: সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক ভয়াবহ ‘ডিপ স্টেট’-এর নেপথ্য রূপরেখা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রে কবি মোহন রায়হানের পরিচয় দীর্ঘদিনের হলেও, তাঁর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড কেবল সাহিত্যিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; তা গভীর এবং অন্ধকার রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আশির দশকের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সস্তা আবেগ পুঁজি করে মোহন রায়হান নিজেকে একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবে জাহির করলেও, গত ১৭ বছরের আওয়ামী শাসনামলে তাঁর প্রকৃত রূপ উন্মোচিত হয়েছে। তিনি ক্ষমতার অলিন্দে নিজেকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যে, শেখ হাসিনার নানা সফরে তাঁর উপস্থিতি ছিল নিয়মিত।
সমালোচকদের মতে, মোহন রায়হান আদতে কোনো কবি নন, বরং তিনি একজন ধূর্ত ‘পাবলিক ফাংশন’ এবং ‘সেলফ মার্কেটিং’-এর কারিগর, যিনি কবিতার আবরণে নিজের আখের গুছিয়েছেন। তাঁর সাহিত্য মান নিয়ে খোদ কবিসমাজেই প্রশ্ন রয়েছে অনেকের মতে তাঁর তথাকথিত কবিতাগুলো স্রেফ গদ্যধর্মী প্রলাপ মাত্র। কিন্তু এই দুর্বল সাহিত্যিক সত্তার আড়ালে তিনি গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী রাজনৈতিক সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো এর আন্তর্জাতিক সংযোগ। রাজধানীর পরীবাগে জনৈক ভারতীয় চিকিৎসকের সাথে অংশীদারিত্বে মোহন রায়হান গড়ে তুলেছেন ‘সাউল হার্ট সেন্টার’। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল নামেমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্র; প্রকৃতপক্ষে এটি প্রতিবেশী দেশের একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়নের গোপন আস্তানা। এখান থেকেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের জন্য একটি ‘সফট কর্নার’ বা সহানুভূতি তৈরির নীল নকশা করা হয়। ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক বিপ্লবের পর যেখানে ফ্যাসিবাদী দোসরদের বিচারের মুখোমুখি হওয়ার কথা, সেখানে ৬ আগস্টেই মোহন রায়হানকে দেখা যায় শিল্পকলা একাডেমির সামনে তথাকথিত ‘বিপ্লবী’ সাজে।
এই ভোলবদল কেবল ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার কৌশল নয়, ছিল একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের প্রথম ধাপ। মোহন রায়হানের এই মিশনের প্রধান সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন যিনি এক সময় জাতীয় পার্টি ও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ সুবিধাভোগী ছিলেন। এই ‘মোহন-স্ট্যালিন’ জুটি এখন জাতীয়তাবাদী শক্তির খোলস পরে বিএনপির ভেতর একটি ‘সাংস্কৃতিক ডিপ স্টেট’ তৈরির মিশনে নেমেছে। অভিযোগের আঙুল আরও গভীরে যায় যখন দেখা যায়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে চরম অবমাননা করে নির্মিত ‘ইন্ডেমনিটি’ নাটকের কুশলী ও কুলাঙ্গারদের সুকৌশলে বিএনপির বলয়ে প্রবেশ করানো হচ্ছে। মান্নান হীরার লেখা এবং বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের প্রযোজনায় নির্মিত সেই নাটকের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা, যারা একসময় শহীদ জিয়ার চরিত্র হনন করেছিল, আজ তারা মোহন রায়হান ও রেজাউদ্দিন স্ট্যালিনের হাত ধরে বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহলে ভিড়ছে।
এমনকি অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে এসব বিতর্কিত ব্যক্তিদের ছবি তোলার ব্যবস্থা করে দিয়ে তাদের রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। যখন দেশের প্রকৃত জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক সাংস্কৃতিক কর্মীরা গত ১৭ বছর রাজপথে জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, তখন এই সিন্ডিকেট পরীবাগের ‘সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে’ বসে আড্ডাবাজি ও গান-বাজনার আড়ালে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ডা বাস্তবায়নে সতীর্থ স্বজন বলে একটা সংস্থা গড়ে তোলে।
অর্থ্যাত সাউল আর স্তীর্থ স্বজন দুটোই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধায়নে তৈরি । ৫ আগস্টের পর ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’-কে পুনরায় সক্রিয় করার নাম করে আওয়ামী লীগের ‘ফ্যাসিবাদী ন্যারেটিভ’ বহনকারী কবি ও বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সদস্যদের পুনর্বাসন করছে। এর নেপথ্যে কাজ করছে কবি তারেক সুজাতের মতো ব্যক্তিদের বিশাল অংকের অর্থায়ন। এই সিন্ডিকেটের ধূর্ততা এতটাই চরম যে, তারা ইতিমধ্যে বিএনপির নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির মতো সংবেদনশীল স্থানে নিজেদের লোক ঢোকাতে সক্ষম হয়েছে।
এই চক্রের কোনো আদর্শিক ভিত্তি নেই; এরা কেবল ক্ষমতার পরজীবী। আজ আওয়ামী লীগ নেই বলে এরা জাতীয়তাবাদী সাজছে, কিন্তু কাল পরিস্থিতির সামান্য পরিবর্তন হলে এরাই হয়তো দাড়ি-টুপি রেখে বায়তুল মোকাররমের সামনে ‘গোলাম আযম কবিতা পরিষদ’ খুলে বসতে দ্বিধা করবে না। জুলাই বিপ্লবের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে এই ‘সাংস্কৃতিক বিষধর সাপ’দের পুনর্বাসন করা কেবল রাজনৈতিক পরাজয় নয়, বরং জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য এক বিরাট হুমকি। শিল্পকলা একাডেমির মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানে এদের মতো ব্যক্তিদের প্রভাব বজায় থাকা মানেই হলো ফ্যাসিবাদের শিকড়কে জলসেচন করা। দেশপ্রেমিক ছাত্র-জনতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এই ‘ছদ্মবেশী’ এজেন্সির অপারেটিভদের ব্যাপারে এখনই কঠোর হতে হবে, অন্যথায় জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক ধারা অচিরেই বিলুপ্তির মুখে পড়বে। এসব বিতর্কিত আলোচনার কারণে বাংলা একাডেমি মোহন রায়হানের পদক স্থগিত করেন।

