সৈয়দ এনামুল হুদা: বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন সূর্যোদয় ঘটল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর, মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আফরোজা খানম রিতা দেশের প্রথম নারী হিসেবে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। স্বাধীনতার পাঁচ দশকের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এই গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কোনো নারীর অভিষেক আগে কখনো ঘটেনি—যা রিতার ক্যারিয়ারে যোগ করল এক অনন্য মাইলফলক। সংগ্রামের পথ বেয়ে সাফল্যের শিখরে আফরোজা খানম রিতার জীবন কোনো পুষ্পশয্যা ছিল না। পারিবারিক ঐতিহ্য, সফল ব্যবসায়িক ক্যারিয়ার এবং রাজনৈতিক পথ—সবখানেই তিনি প্রমাণ করেছেন নিজের শ্রেষ্ঠত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা এই নেত্রী একদিকে যেমন মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান হিসেবে করপোরেট জগতে সফল, অন্যদিকে রাজপথের লড়াকু সৈনিক হিসেবেও পরীক্ষিত।
এক নজরে মন্ত্রণালয়ের ঐতিহাসিক বিবর্তন : ১৯৭২ সালে এম মনসুর আলীর হাত ধরে শুরু হওয়া এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন এম কে আনোয়ার, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং রাশেদ খান মেননের মতো দিকপালরা। এমনকি সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে শেখ বশির উদ্দিনও এখানে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তবে ২০২৬ সালের এই নতুন অধ্যায়ে রিতার অন্তর্ভুক্তি যেন নারী নেতৃত্বের এক শক্তিশালী বিজ্ঞাপন।
ভোটের ময়দানে রেকর্ড ও উত্তরাধিকার: রিতার ধমনিতে বইছে রাজনীতির রক্ত। তাঁর পিতা, প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ হারুনার রশীদ খান মুন্নু ছিলেন সাবেক মন্ত্রী। বাবার উত্তরসূরি হিসেবে রাজনীতিতে এলেও রিতা নিজের যোগ্যতায় জায়গা করে নিয়েছেন। গত নির্বাচনে তিনি দেশের ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যবধানে জয়ী নারী প্রার্থী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন, যা তাঁকে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার মতো জননন্দিত নেতাদের সারিতে দাঁড় করিয়েছে।
রাজপথের লড়াকু নেত্রী: বিগত স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে রিতার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়ন, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ এবং অসংখ্য মিথ্যা মামলার পাহাড়ও তাঁকে বিচ্যুত করতে পারেনি। দলের কঠিন সময়ে নেতা-কর্মীদের আর্থিক ও মানসিক সাহস জুগিয়ে মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপিকে পুনর্গঠিত করেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলী ও জেলা বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও আদর্শ পরিবার: সাফল্য শুধু রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি এক সার্থক জননী। তাঁর তিন সন্তানই বিদেশের নামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশের শিল্প ও চিকিৎসা খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন: বড় ছেলে মাইমুনুল ইসলাম অন্তু: মুন্নু সিরামিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মেজো ছেলে রাশীদ সামিউল ইসলাম অর্ক: মুন্নু ফেব্রিক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ছোট ছেলে রাশীদ রাফিউল ইসলাম অর্নব: মুন্নু মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক। তার স্বামী মইনুল ইসলামও মুন্নু গ্রুপের ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন।
আগামীর প্রত্যাশা: জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার আধুনিকায়ন, পর্যটন শিল্পের বৈশ্বিক বিকাশ এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহ সচল রাখা—এই চ্যালেঞ্জিং কাজগুলো এখন রিতার কাঁধে। শিল্প ও রাজনীতির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা তাঁর এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের পর্যটন ও বিমান খাতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, এমনটাই প্রত্যাশা দেশের সাধারণ মানুষের। আফরোজা খানম রিতার এই সংগ্রামী জীবন ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণ কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলাদেশের সকল নারীর জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম।
আলোকিত প্রতিদিন/এপি

