কামাল হোসেন, গাজীপুর সদর প্রতিনিধি: নির্বাচনে পরিবর্তনের প্রত্যাশায় ছয় লাখের বেশি মানুষ কাগজে উন্নয়ন, মাঠে অবহেলা—বাস্তবে নেই স্বাস্থ্যসেবা ও দাপ্তরিক কাঠামো সদর হয়েও ‘সদর সুবিধা’ থেকে বঞ্চিত গাজীপুর সদরবাসী গাজীপুর সদর উপজেলা—নাম শুনলেই ধারণা হওয়া উচিত এটি জেলার সবচেয়ে সুবিধাসম্পন্ন এলাকা। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। প্রশাসনিক কাঠামোর অগোছালো বিন্যাস, স্বাস্থ্যসেবার তীব্র সংকট, দাপ্তরিক জটিলতা, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও নাগরিক সুবিধাহীনতায় দীর্ঘদিন ধরেই ভোগান্তিতে রয়েছে সদর উপজেলার বাসিন্দারা।
সমস্যার দীর্ঘসূত্রতায় মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে, আর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ক্ষোভ এখন প্রত্যাশায় রূপ নিয়েছে, সদর উপজেলায় সদর সুবিধা চাই।
কিন্তু ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার সময় পুরনো উপজেলার বড় অংশ সিটির আওতায় চলে গেলে নতুন এক বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। পুনর্গঠিত সদর উপজেলা দাঁড়ায় চারটি ইউনিয়ন নিয়ে—মির্জাপুর, পিরুজালী, ভাওয়ালগড় ও বাড়িয়া। এখানেই শুরু হয় অস্বাভাবিক ও দেশের বিরল প্রশাসনিক কাঠামো। তিনটি ইউনিয়ন জেলায় উত্তর-পশ্চিমে, আর বাড়িয়া ইউনিয়ন পুরোপুরি পূর্ব দিকে—যার দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। স্থানীয়দের ভাষায়, একই উপজেলায় দুটি আলাদা পৃথিবী।
গাজীপুর সদর উপজেলার মূল প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ভেতর থেকে। যদিও নামমাত্র একটি উপজেলা পরিষদ ভবন আছে, কিন্তু বাস্তব কার্যক্রম সিটিতে হওয়ায় এখানে নেই সেবা গ্রহণের উপযোগী অফিস ব্যবস্থা।
উপজেলার নিজস্ব সংসদীয় আসন নেই; বরং প্রশাসনকে সামলাতে হচ্ছে চারটি ভিন্ন সংসদীয় আসনের বিভিন্ন অংশ। ফলে জন্মেছে চরম দাপ্তরিক জটিলতা। মির্জাপুর, পিরুজালী ও ভাওয়ালগড় থেকে বাড়িয়া ইউনিয়ন পর্যন্ত দূরত্ব ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার। দাপ্তরিক সেবা নিতে একজন সাধারণ মানুষকে ২–৩ ঘণ্টা শুধু যাতায়াতেই হারাতে হয়। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, উপজেলা যদি সিটিতে হয়, তাহলে আমরা কোন সদর উপজেলার মানুষ?
এদিকে গাজীপুর সদর উপজেলায় সরকারি নথিতে দেখানো হয়েছে, সরকারি হাসপাতাল ২টি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১টি, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ৫টি, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র ৫টি, কমিউনিটি ক্লিনিক ৪৯টি, বেসরকারি ক্লিনিক ৩৬টি। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া বাস্তবতা, সরকারি হাসপাতাল—শূন্য। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স—নেই। উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র—নেই। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ৫টির মধ্যে ৩টি আংশিক সচল। কাগজে দেখানো বেসরকারি ক্লিনিকের সংখ্যাও বাস্তবে অনেক কম। এলাকায় একটি সিএমএইচ থাকলেও তা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত নয়। ফলে প্রতিদিন রোগীদের যেতে হয় গাজীপুর সিটির হাসপাতালগুলোতে—যেখানে পৌঁছাতে লাগে ২৫–৩০ কিলোমিটারের যানজটপূর্ণ পথ। স্থানীয়দের ক্ষোভ—“চিকিৎসা নিতে গিয়ে মানুষ মরছে, আর কাগজে দেখায় সদর উপজেলায় সকল ধরনের হাসপাতালসহ কলেজ হাসপাতালও আছে!
বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মির্জাপুর, পিরুজালী ও ভাওয়ালগড়—এই তিন ইউনিয়নে রয়েছে দুই শতাধিক শিল্পকারখানা। প্রতিদিন কাজ করেন লাখো শ্রমিক। সরকারি হিসাবে ২০২২ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ৩ লাখ ৪৫ হাজার হলেও স্থানীয়রা বলছেন—এখন তা ছয় লাখ ছাড়িয়েছে।
এত জনবহুল এলাকায় নেই, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, শ্রমিক হাসপাতাল, কৃষি অফিস,
সমাজসেবা অফিস, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যক্রম,
বিচ্ছিন্ন বাড়িয়া ইউনিয়নের পরিস্থিতি আরও করুণ।
এছাড়াও ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়ক, যা গাজীপুর সদর উপজেলার ভেতর দিয়েই প্রবাহিত। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে লক্ষাধিক যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু—সড়কের পাশের মানুষের জন্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নেই। নেই পর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নেই দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ব্যবস্থা, এছাড়াও মহাসড়ক উপরে রয়েছে ভাসমান দোকানপাট। ফলে সড়কটি উপজেলা বাসিন্দাদের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এত গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক থাকা সত্ত্বেও উন্নয়ন এখনো সীমিত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের প্রধান দাবি, পূর্ণাঙ্গ উপজেলা পরিষদ ভবন ও প্রশাসনিক কমপ্লেক্স নির্মাণ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা, শিল্পাঞ্চলভিত্তিক শ্রমিক হাসপাতাল, বাড়িয়া ইউনিয়নের বিচ্ছিন্নতা দূর করা, যোগাযোগ উন্নয়ন ও বিকল্প সড়ক সহ
সিটি কর্পোরেশনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বাধীন উপজেলা প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত করা। এছাড়াও নতুন বাজেট ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা।
সাধারণ ভোটাররা বলছেন, গাজীপুর সদর উপজেলা একটি অদ্ভুত প্রশাসনিক কাঠামোর ভুক্তভোগী অঞ্চল। নামে সদর—বাস্তবে সবচেয়ে অবহেলিত। আগামী নির্বাচন তাই শুধু একজন প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচন নয়। এটি ছয় লাখ মানুষের জীবিকা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ও প্রশাসনিক অধিকারের পুনরুদ্ধারের নির্বাচন।
মানুষ এবার প্রতিশ্রুতি নয়—বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়।
এদিকে সচেতন নাগরিক মহল বলছে, এই নির্বাচনে গাজীপুর সদর উপজেলার মানুষ শুধু একজন প্রার্থী নয়—একটি বাস্তব পরিবর্তন খুঁজছে। বহু বছর ধরে স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, দাপ্তরিক সেবা ও প্রশাসনিক কাঠামোতে যে অবহেলা চলেছে, তা আর মেনে নেওয়া যাবে না। যারা নির্বাচনে আসবেন তারা যেন পরিষ্কারভাবে প্রতিশ্রুতি দেন—সদর অঞ্চলের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, শ্রমিক হাসপাতাল, কার্যকর উপজেলা প্রশাসন এবং বিচ্ছিন্ন বাড়িয়া ইউনিয়নের সেবা-সংকট দ্রুত সমাধান করবেন। জনগণ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব কাজ দেখতে চায় সাধারণ মানুষ।
আলোকিত প্রতিদিন/এপি
- Advertisement -

