আজ বৃহস্পতিবার, ২২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ।   ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা: জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন দর্শনার্থীদের মন ছুঁয়েছে

আরো খবর

রিপন পাল:

ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় স্থাপিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ সম্পর্কিত জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন দর্শনার্থীদের  মন ছুঁয়েছে। এ প্যাভিলিয়ন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নারী-পুরুষ, ছাত্র-ছাত্রী ও তরুণ-তরুণীরা পরিদর্শন করছে। নতুন বাংলাদেশের অর্জিত শ্রদ্ধা জানাতে মেলায় এ প্যাভিলিয়নটি তৈরি করা হয়েছে। যেখানে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনাকে মসনদ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। এখানে তরুণ-তরুণীরা আসছে শিখতে-শেখাতে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় প্রবেশ করে হাতের ডান দিকেই জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন প্যাভিলিয়নের অবস্থান। প্রবেশ গেইটের ভেতরে পূর্বের দিকেই এগিয়ে গেলেই প্রথমে চোখে পড়বে এই গ্যালারি। এখানে শহীদদের ও আন্দোলনে নেতৃত্বদের কর্মকান্ড তুলে ধরতে এই গ্যালারি সাজানো হয়েছে। এই গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে ১জুলাই থেকে ৩৬জুলাইয়ের দিন, ক্ষণ ও ঘটনা সংবলিত ছবি-লেখা। শহীদ ওসমান হাদীর আবৃতি ও বক্তব্য ভিডিও প্রদর্শন করা হচ্ছে। রয়েছে জুলাই বিপ্লবে শহীদদের ছবি।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন প্যাভিলিয়নে লেখা হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতের সংখ্যা ১৪হাজার ২৪০জন, স্থায়ী পঙ্গুত্ব ১হাজার ৬০০জন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ২৩৫জন, অঙ্গচ্ছেদজনিত সমস্যা ২৩জন, ¯ স্নায়ুজনিত আঘাত ৩২জন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ১২হাজার এবং মেরুদন্ডে আঘাত ৩০জন।
কেউ প্যাভিলিয়নে দেওয়া গুণিজনদের উক্তি নোট করছেন। কেউ বসে তা পড়ছেন। কেউবা অধীর আগ্রহে এক ধ্যানে শহীদ আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, শহীদ ফারহান ফাইয়াজসহ শহীদদের নিথর দেহের ছবি দেখছেন। কেউবা তাঁদের প্রতিকৃতির সঙ্গে ছবি তুলছেন। এ দৃশ্য প্রতিদিনের বাণিজ্য মেলার এ গ্যালারিতে।
এ বিষয়ে লেখা কবিতা ও বই। নতুন বাংলাদেশের চেতনার বাণী গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে। স্বল্পপরিসরে যেন সবই রাখা হয়েছে। পুরো গ্যালারিটাই যেন একটি আন্দোলন, স্মৃতি ও আবেগ। এ প্যাভিলিয়নে দর্শনার্থীদর ভিড় লেগেই থাকে।
জুলাইয়ের ছাত্র জনতার বিপ্লব স্মরণে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন প্যাভিলিয়নে তরুণ-তরুণী ও শিক্ষার্থীদের ভিড়। অনেকেই বাব-মায়ের সঙ্গে গ্যালারিতে স্থান পাওয়া ছবি, লেখা মনোযোগ দিয়ে উপলব্ধি করছেন। গ্যালারিতে স্থান পাওয়া লেখাগুলোর মধ্যে রয়েছে রক্তে আগুন লেগেছে। যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। শুধু কোটা নয় গোটা দেশটাই সংস্কারের প্রয়োজন। আওয়াজ উঠা কথা ‘ক’। রক্তের ক্যানভাসে লেখা নাম। জুলাই অভ্যুত্থানের বীর শহীদদের এখন পর্যন্ত সংগৃহীত তালিকা উপস্থাপন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরাম। শোক নয় দ্রোহ। সোনার বাংলা আজ মৃত্যুপুরী কেন। শহীদরা আমাদের শোক নয়, তারা আমাদের শক্তি। দুঃসাহসে এগিয়ে দেয়া বুক, প্রতিরোধে প্রসারিত দুই হাত, শহীদ আবু সাঈদ আমাদের অহঙ্কার, নতুন বাংলাদেশের অঙ্গীকার। এসব লেখা মনোযোগে দর্শনার্থীরা পড়ছেন। কেউবা আবেগ আপ্লুত হয়ে ওঠছেন।
এছাড়া গণঅভ্যুত্থানে হওয়া শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ ফারহান ফাইয়াজ, শহীদ মীর মুগ্ধসহ শহীদদের নাম ও ছবি এখানে স্থান পেয়েছে। এ বিষয়ে কবিতা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ১ থেকে ৩৬ জুলাইয়ের দিন, ক্ষণ ও ঘটনা। মীর মুগ্ধের সেই কথাগুলো পানি লাগবে কারো পানি। গণঅভ্যুত্থানে গণমাধ্যমে প্রাকাশিত সংবাদের অংশ, লাল জুলাইয়ের গল্প শুনুন, তোমাদেরর রক্ত বৃথা যেতে দেইনি। রক্তাক্ত জুলাই। লাশের ভিতর জীবনরে, নাইলে গদি ছাইরা দে। ভয় পেলে তুমি শেষ, রুখে দাড়ালে বাংলাদেশ। তোমার লাল জুলাই। কথায় কথায় বাংলা ছাড়, বাংলা কি তোর বাপ-দাদার। আমি কে তুমি কে, রাজাকার রাজাকার। বল বীর চিরউন্নত মম শির, বুকের ভিতর অনেক জড়, বুক পেতেছি গুলি কর। মাইরা তো ফেলছি, সামনে আসছে ফাগুন, আমরা হবো দ্বিগুন। এখন কি করবা?, দেশটা তোমার বাপের নাকি, করছো ছলা-কলা। কিছু বললেই ধরছো চেপে জনগণের গলা। লাখো শহীদের রক্তে কেনা, দেশটা কারো বাপের না। ধর্ম যার যার, দেশ সবার। এইরকম বহু মন ছুঁয়ে যাওয়া লেখা জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন প্যাভিলিয়নে স্থান পেয়েছে। এছাড়াও জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম এখানে স্থান পেয়েছে।
রাজধানীর বনশ্রী থেকে ব্যবসায়ী মোঃ ওবায়দুর রহমান কিরণ ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে নিয়ে মেলায় এসেছেন। প্রবেশ করেছেন জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন প্যাভিলিয়নে। প্রবেশ করে ছেলে-মেয়ে কিংবা নাতি-নাতনিদের উদ্দেশ্যে জুলাই-আগষ্টের বিভিন্ন সময়ের আন্দোলনের ছবি দেখিয়ে তার আদর্শের কথা তুলে ধরছেন। সেই ছবিগুলোর মর্মকথাও বলছেন। তুলে ধরছেন আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস। কথা বলতে বলতে তিনি এক সময় স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠেন। তার চোখে পানি চলে আসে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সৈকত মিয়া বলেন, পূর্বাচলে আয়োজিত মেলা রাজধানীর বাইরে হলেও এলাকাটি সুন্দর। কয়েক বছর পর এখানকার পরিবেশ আরো সুন্দর হয়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, মেলায় এলে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন প্যাভিলিয়নে একবার হলেও প্রত্যেকের আসা উচিত। নতুন প্রজন্মকে জানাতে মেলায় আরো বৃহত্তর পরিসরে জুলাই বিপ্লবের কার্যক্রম আরো ব্যাপকভাবে স্থাপন করা প্রয়োজন।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সচিব তরফদার সোহেল রহমান বলেন, মেলা প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং ছুটির দিন ১০টা পর্যন্ত চলে। মেলাতে বড়দের টিকেট মূল্য ৫০টাকা ও ছোটদের ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এবারের বাণিজ্য মেলায় অনলাইন টিকেটিং সহ বেশকিছু নতুন বিষয় রয়েছে। প্রবেশ গেইটে কোন ভিড় নেই। ক্রেতা-দর্শনার্থীরা নির্বিঘেœ মেলায় প্রবেশ করছে। তবে মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী ও জুলাই আহতরা কার্ড দেখিয়ে প্রবেশ মূল্য ছাড়াই মেলায় প্রবেশ করতে পারবেন। এবারের বাণিজ্য মেলা ব্যবসা সফল হবে বলে তিনি আশা করছেন।

আলোকিত প্রতিদিন/ ১৪ জানুয়ারি ২০২৬/মওম

- Advertisement -
- Advertisement -