সম্পাদকীয় (সায়মা আনিকা):
বাংলাদেশের সংবিধান নারীর মর্যাদা ও অধিকারকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছে। আইন বলেছে—নারী মানুষ হিসেবে পূর্ণ, স্বাধীন ও সম্মানিত নাগরিক। কিন্তু বাস্তব জীবনের পথে নামলেই স্পষ্ট হয়, এই স্বীকৃতির সঙ্গে নারীর দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতার গভীর ফারাক রয়ে গেছে। আইন যেখানে নারীকে মর্যাদার আসনে বসিয়েছে, সমাজ সেখানে তাকে আজও সংগ্রামী ও অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতিত করে রেখেছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ ঘোষণা করেছে—সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। এই সমতার নীতির আওতায় নারীও পুরুষের মতোই সমান অধিকারভোগী। আবার অনুচ্ছেদ ২৮(২) স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রকে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো প্রকার বৈষম্য করতে নিষেধ করেছে। শুধু তাই নয়, নারীদের সামাজিক ও ঐতিহাসিক পশ্চাৎপদতা দূর করতে অনুচ্ছেদ ২৮(৪) রাষ্ট্রকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ দিয়েছে। অর্থাৎ সংবিধানের ভাষায় নারী কেবল সমান নয়, প্রয়োজনে রাষ্ট্রের বিশেষ সুরক্ষার দাবিদার।
এছাড়া অনুচ্ছেদ ৩১ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের মতো নারীরও জীবনের নিরাপত্তা, আইনের আশ্রয় ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে। অনুচ্ছেদ ২৯ নারীদের সরকারি চাকরিসহ সব রাষ্ট্রীয় সুযোগে সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। কাগজে-কলমে এই ধারাগুলো নারীর অধিকারকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছে।
কিন্তু এই সাংবিধানিক নিশ্চয়তা বাস্তবে কতটা কার্যকর—তার উত্তর লুকিয়ে আছে আদালতের বারান্দা ও সমাজের চোখে।
বাংলাদেশের বিচারালয়ে বহু নারী ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার মামলায় ন্যায়বিচারের আশায় দাঁড়িয়েছেন। আদালত একাধিক রায়ে নারীর সম্মান ও মর্যাদার কথা জোর দিয়ে বলেছেন। তবু বাস্তবে প্রমাণের অভাব, তদন্তের দুর্বলতা ও সামাজিক চাপের কারণে অনেক অভিযুক্ত শাস্তি এড়িয়ে গেছে। আইনের চোখে মামলার নিষ্পত্তি হলেও, সমাজে সেই নারীকে আজীবন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। তার পোশাক, চলাফেরা, চরিত্র নিয়ে যে বিচার সমাজ করেছে, তার কোনো প্রতিকার সংবিধান বা আদালতের রায়ে পাওয়া যায়নি।
পারিবারিক আইনেও নারীর সংগ্রাম কম নয়। বিবাহবিচ্ছেদ, ভরণপোষণ ও সন্তানের হেফাজত সংক্রান্ত মামলায় বহু নারী আদালতের রায় পেয়েছেন, কিন্তু সেই রায় বাস্তবায়নে বছরের পর বছর সংগ্রাম করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মা সন্তানের দেখাশোনা করলেও আইনি ক্ষমতা পায়নি। এই বাস্তবতা সংবিধানের সমতার নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির ক্ষেত্রেও সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪২, যা নাগরিকের সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করে, নারীর জন্য কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থেকেছে। আদালত নারীর সম্পত্তির অধিকার স্বীকার করলেও সমাজ সেই নারীকে সহজে গ্রহণ করেনি। অধিকার দাবি করায় অনেক নারী পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। আইনের চোখে তিনি ন্যায্য, কিন্তু সমাজের চোখে অপরাধী—এই দ্বৈত বাস্তবতা নারীর জীবনের অন্যতম নির্মম সত্য।
কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে আইন ও আদালতের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে বহু নারী যৌন হয়রানির অভিযোগ জানাতে গিয়ে চাকরি হারিয়েছেন, সামাজিকভাবে হেয় হয়েছেন। সংবিধান যে মর্যাদাপূর্ণ জীবনের কথা বলেছে, বাস্তব কর্মক্ষেত্রে তা এখনো অনেক নারীর জন্য অধরা।
এই সব উদাহরণ প্রমাণ করে, বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন নারীর অধিকার স্বীকার করলেও সমাজ ও বাস্তবতা এখনো সেই অধিকারকে পূর্ণভাবে মেনে নিতে পারেনি। নারী আদালতে ন্যায়বিচার পেলেও জীবনের বাস্তবতায় তাকে মূল্য দিতে হয়েছে একাকিত্ব, মানসিক চাপ ও সামাজিক বঞ্চনার মাধ্যমে।
নারীর অধিকার কোনো দয়া নয়, এটি সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার। আইন তখনই সার্থক হবে, যখন তা নারীর জীবনে কেবল রায় নয়, বাস্তব নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করবে। নারীর সংগ্রাম আসলে একটি রাষ্ট্রের ন্যায়বোধের আয়না।
বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হতে চায়, তবে নারীকে শুধু আইনে নয়, সমাজ ও জীবনের বাস্তবতায়ও সম্মানিত করতে হবে।

