আলমগীর মতিন চৌধুরী ঃ
সংকটের মুখে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভালো কিছু আশা করা হলেও জনগণ ব্যবসায়ী শিল্পোদ্যোক্তারা হতাশ। বছর পেরিয়েও ব্যবসায়ে শান্তি, স্বস্তি, আস্থা গতি কিছু ফেরেনি। ক্রমেই বাড়ছে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। কমেছে বানিজ্য বিনিয়োগ। বানিজ্য প্রসারতায় নেই সরকারি উদ্যোগ। দেশি বিদেশি উদ্যোগে পড়ছে না সাড়া। এ জন্য বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকট, ঋণের উচ্চ সুদের হার, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ অসংখ্য অভিযোগ আশঙ্কার কথা উঠে এসছে ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষ থেকে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নীতি সহায়তার বদলে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে চলছে মিডিয়া ট্রায়াল। নানা ধরনের হয়রানি ও মিথ্যা মামলার বিড়ম্বনা ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। অনেক ব্যবসায়ীর বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞাসহ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে রাখা হয়েছে। বেশি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ গ্যাস না পাওয়া, মুদ্রার চরম অবমূল্যায়ন দেখা দিযেছে। মব সন্ত্রাস, আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি, ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজিসহ আরো বহু সমস্যায় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা দিশাহারা। শুধু তা-ই নয়, এত সব সংকট সত্ত্বেও সমাধানের লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেই বললেই চলে। সরকার পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা পর্যন্ত করা হচ্ছে না। তাঁদের সমস্যা দূর করা তো পরের কথা, সমস্যা কী বা সমস্যার গতি-প্রকৃতি নিয়ে কথা বলারও উদ্যোগ না নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিনিয়োগে চলছে মন্দা, চৈতী খরা। বাড়ছে না কর্মসংস্থান, বিপরীতে প্রতিদিনই চাকরি হারাচ্ছেন শ্রমজীবী মানুষ। একের পর এক বন্ধ হচ্ছে ব্যবসা ও শিল্প-কারখানা। চাপে তাপে ব্যবসায়ীরা অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হয়ে পড়ছেন। তাঁদের পুনরুদ্ধারে প্রণোদনা দিতে কমিটি করা হলেও নাম মাত্র কিছু ব্যবসায়ীকে এই সুবিধা দিয়ে বেশির ভাগকেই বঞ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ দেখা দিয়েছে। শিল্প-বাণিজ্যের দুরবস্থায় দেশের অর্থনীতি বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌছিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে নতুন করে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ কাজ হারিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। এই পরিস্থিতির মধ্যে দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার হয়েছে আরও বেকার হবে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সম্প্রতি জানিয়েছেন, ‘২০২৫ সালে শুধু শিল্প নয়, শিল্পোদ্যোক্তাদের মেরে ফেলা হচ্ছে। এটাকে আমরা ষড়যন্ত্র মনেকরি। শিল্প বাঁচাতে না পারলে দেশে দুর্ভিক্ষ হবে। শিল্পবিরোধী কর্মকান্ডের মাধ্যমে শিল্প-কারখানা গলাটিপে মেরে ফেলা হচ্ছে। গ্যাসসংকটে আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকেগেছে। চলতি মূলধন সংকুচিত হয়েছে। প্রতিনিয়ত আমাদের কারখানা লে-অফ ঘোষণা আসছে। বাঁচার তাগিদে কিছুদিন পর মানুষ রাস্তায় নামবে। দেশের পরিস্থিতি হবে আরো ভয়াবহ। এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক আবদুল আউয়াল মিন্টু যথার্থই বলেছেন, দেশে বর্তমানে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা-সব মিলিয়ে একটি অনিরাপদ ও অনিশ্চিত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিবেশে দেশি-বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্থিতিশীলতা না থাকলে ব্যবসা পরিচালনা করা শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভব। বিনিয়োগের জন্য আস্থার পরিবেশ অত্যন্ত জরুরি। কারণ বিনিয়োগ দু-এক দিনের বিষয় নয়। একজন বিনিয়োগকারী দীর্ঘ মেয়াদে তাঁর বিনিয়োগের নিশ্চয়তা অবশ্য চাইবেন। দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির স্বার্থে বিনিয়োগের জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আর এ জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। দেশের বিভিন্ন শ্রেণির ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে আরো ব্যবসায়িক ভয়াবহতা। বাংলাদেশে অর্থনীতির বেশিরভাগ সূচক খারাপ হচ্ছে। দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে বহুমুখী সংকট সামনে আনছেন ব্যবসায়ীরা। অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একটা নেতিবাচক ধারা দেখা যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতির জন্য এগুলোকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী সবাই। ৫ আগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর একদিকে যেমন বেশকিছু শিল্প কারখানা বন্ধ হয়েছে, আবার সম্ভাবনাময় অনেক শিল্প কারখানাও অর্থাভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। আবার অর্থায়ন সংকট, ঋণ সহায়তা, সুদহার বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ জানাচ্ছেন নিয়মিত। সার্বিকভাবে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়েও দুশ্চিন্তা ফুটে উঠছে ব্যবসায়ীদের কথায়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে চামড়া ও পাট শিল্পের একজন উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, পাটকলের মুনাফা এবং ব্যাংক ঋণের ভর করে খুলনায় দেশের বৃহত্তম চামড়া প্রক্রিয়া কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন। অতীত ও বর্তমান সংকট মিলিয়ে রপ্তানিমুখী দুটি শিল্প কারখানাই এখন রুগ্ন। পাটকলে সক্ষমতার ২৫ শতাংশ এবং চামড়া কারখানায় দশ ভাগের বেশি কাজে লাগাতে পারছেন না। তিনি আরো জানান, দুই কারখানার ৮০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ জমেছে। দৈনিক ব্যাংক সুদ হচ্ছে ৩০ লাখ টাকা। চামড়া ও পাটকল মিলে আড়াই হাজারের বেশি শ্রমিকের কাজ নেই। এশিয়ার মধ্যে বড় ফ্যাক্টরি তৈরি করেছি, যদি সরকার ব্যবসায়ীদের স্বার্থএগুলো না দেখে সেই অর্থে বাংলাদেশে নতুন করে কোনো লোক এই ধরনের রিস্ক নিয়ে নতুন করে আর ব্যবসা করবে না।” চামড়া কারখানায় বিনিয়োগ করে পাটকলের মূলধেনও ক্ষতি হয়েছে। ইতোমধ্যে ঋণখেলাপি হওয়ার আশঙ্কায় দিন পার করছে এই উদ্যোক্তা। প্রাণ আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে ব্যবসায়ীদের সমস্যা নিয়ে বলেন,“ব্যবসায়ীদের অবস্থা ভীষণ খারাপ। তাদের লোনের টাকা শোধ করতে বেগ পেতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা নিজেদের ব্যয় নিয়ে কষ্টের মধ্যে আছে। বিদেশি ক্রেতারা আরো স্বল্পমূল্যে পণ্য ক্রয় করতে চাচ্ছেন। ভারতীয় কম্পিটিশন আসতেছে গার্মেন্টস সেক্টরে। সো অভারঅল ব্যবসায়ীরা কিন্তু বিভিন্নমুখী চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন, এটা কিন্তু কেউ ডিনাই করতে পারবে না।” বর্তমানে বিনিয়োগে একটা ভাটা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্রে জানাগেছে অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে গত অর্থবছরের তুলনায় ৭১ শতাংশ কম। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, ঘুষ দুর্নীতি এগুলো কিন্তু কমে নাই। ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ জিডিপির ২৩.৫ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগ সেটা জিডিপির এক শতাংশের নিচে ছিল। সেটা কমে কমে ০.৩ এর কাছাকাছি রয়েছে। একটা বড় সময় ধরে বাংলাদেশে বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা কোনো সময়ই সারা পৃথিবীতেই কোনো জায়গায় বিনিয়োগ করতে চাইবে না যদি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকে। প্রতিবেদনের স্বার্থে অনেকের সাথে কথা বলে জানাগেছে, ইলেকশনের আগে তারা নতুন বিনিয়োগ করার কথা ভাবছে না। ঘুষ-দুর্নীতি এগুলো কিন্তু কমে নাই। ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে সিপিডির জরিপে ১৭টি সমস্যা সামনে এসেছে, এর মধ্যে দুর্নীতি এক নম্বরে রয়েছে। ব্যবসায়ের নিরাপত্তা জনিত কারণে ব্যবসায়ীরা সত্যটা বলতে পারছেন না। তারা ভয়ের মধ্যে থাকেন যে কী বলতে কী বলে আবার ব্যবসার ক্ষতি হয়। মব জাস্টিসের মধ্যে পড়ে যায় অনেকে। ফলে ব্যবসায়ের পরিবেশ পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন বিনিয়োগ ও অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারে প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত স্থিতিশীল পরিবেশ, আইন শৃঙ্খলার উন্নতি এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সফল গার্মেন্টস ক্রেতা, বিপনন ও সরবরাহকারী এবং সোর্সিং এক্সিবিশন খ্যাত ইনটেক্স বাংলাদেশের ১৬তম আসর আন্তর্জাতিক টেক্সটাইল সোর্সিং শোতে ১০টিরও বেশি দেশের ১২৫টির অধিক কোম্পানি অংশ নিয়েছিল, যা বিশ্বব্যাপী ক্রেতা, সরবরাহকারী এবং উৎপাদনকারীদের জন্য একটি গতিশীল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করার কথা থাকলেও সেখানে তেমন সাড়া দেখাযায়নি। দেশে ২০২৪ সালে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এফডিআই আগের বছরের চেয়ে ১৩ শতাংশ কমেছে। গত বছর প্রকৃত এফডিআই এসেছে ১২৭ কোটি ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ। ২০২৩ সালে নিট এফডিআই ছিল ১৪৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার। ২০২৬ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্প রপ্তানি ৫৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ইনটেক্স-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা, সাপ্লাই চেইনে বৈচিত্র আনা এবং টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পে উদ্ভাবন প্রদর্শনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু এবারের আসরে তেমন উল্লেখযোগ্য সাড়া না মেলার কারণ হিসাবে দেশের অস্থির রাজনীতি, নিরাপত্তাহীনতাকে দায়ি করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সাল শেষে বিদেশি বিনিয়োগের স্থিতি ১ হাজার ৮২৯ কোটি ডলার, যা দেশের জিডিপির মাত্র ৪ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় এ ক্ষেত্রে গড় হার ১৩ শতাংশ। ভারতের হার ১৪ শতাংশ। ভুটানের মতো দেশে এ হার ১৭ শতাংশ। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগে অর্থের ঘোষণার পরিমাণও কমেছে। ঘোষিত অর্থের পরিমাণ ১৭৫ কোটি ডলার। গত বছরের তুলনায় যা ৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে বিদেশে মাত্র ৭০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৮৫ কোটি টাকা। গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২১ সালে দেশের বাইরে সর্বাধিক ৮ কোটি ডলারের বিনিয়োগ করেন বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা। ২০২৪ সালে বৈশ্বিকভাবে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ১১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ধাক্কা। অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে মন্দা, শিল্প খাতে চাপ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি কম মনোযোগ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বাণিজ্য উত্তেজনা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং ভূরাজনৈতিক বিভাজন বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিবেশকে আরো জটিল করে তুলছে। সরকারের সদিচ্ছার কারনে দেশের বাণিজ্যিক আশা ভরসা তলানীতে অবস্থান করছে। ব্যবসা বানিজ্য কর্মসংস্থান নিয়ে সরকার অনেকটাই উদাসীন। অন্ধকারে কখন কিছুটা আশার আলো ছড়াবে সেই নিরব অপেক্ষায় করা ছাড়া কি বা করার আছে।
আলোকিত প্রতিদিন/০৬ জানুয়ারি ২০২৬/মওম

