আজ বৃহস্পতিবার, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ।   ১২ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গজননীর জানাজায় জনতার ঢল

বেদনাবিধুর শেষ মুহূর্ত. খালেদা জিয়ার প্রতি জাতির শ্রদ্ধাঞ্জলি. শহীদ জিয়ার পাশে সমাহিত

আরো খবর

আলমগীর মতিন চৌধুরীঃ

খালেদা জিয়ার জানাজা সম্পন্ন। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দেশ বিদেশী বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবিন্দ। বিএনপি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজা নামাজ সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বেলা ৩টা বেজে ২ মিনিটে খালেদা জিয়ার জানাজা শুরু হয়। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক খালেদা জিয়ার জানাজা পড়ান। জানাজার আগে খালেদা জিয়ার পুত্র বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তার মায়ের জন্য সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং কারও কাছে কোনো ঋণ থাকলে পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন। যতদূর চোখ যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ। সকাল থেকে খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে মানুষের ঢল নামে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, সংসদ ভবনের সামনের মাঠসহ আশাপাশের এলাকায়। জানাজাস্থল পরিপূর্ণ হয়ে যাওয়ায় খামারবাড়ি, ফার্মগেট, আসাদগেট, মিরপুর রোড এবং বিজয় সরণিসহ আশেপাশের এলাকায়ও বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়েই জানাজায় অংশ নেন। খোলেদা জিয়াকে শেরেবাংলা নগরে স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে। সম্ভবত এই মুহূর্তে দেশজুড়ে সবচেয়ে শ্রদ্ধা স্মরণে আলোচনার শীর্ষে বঙ্গ জননী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি আড়াল হলেও রয়ে যাবেন মননে’ নেতা বিদায় নেন, কিন্তু থেকে যায় আদর্শ। সত্যি বেগম খালেদা জিয়া জাতির মননে স্মরণীয় বরণীয় হয়ে থাকবে থাকবেন, প্রয়াণের পরও শেষ হবে না তার কর্মময় জীবনের গল্প। গণতন্ত্রের মা খালেদা জিয়া চলে গেলেও কেবল টিকেই থাকবে না, বরং নতুন করে জাগ্রত হবে গণতন্ত্রের আদর্শ। পুরো জাতি খালেদা জিয়ার প্রয়াণে শোকাহত। বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে যিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন। এই নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আলোকিত প্রতিদিন পরিবার জনগণের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে। বিশ্বের বহু নেতা যখন এই অপূরণীয় ক্ষতিতে শোকবার্তা জানাচ্ছেন, তখন তার স্মৃতির প্রতি সম্মানার্থে আমরা আবারও প্রতিজ্ঞা করছি গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় সব কাজের সাথে থাকবে আলোকিত প্রতিদিন। খালেদা জিয়ার জানাজা। যতদূর চোখ যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানী ঢাকার রাস্তাঘাটে আছড়ে পড়েছে অগণিত জনতার ঢেউ। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ রূপ নিয়েছে জনসমুদ্রে। জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের দক্ষিণ প্লাজায় খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে সকাল থেকেই সমবেত হতে থাকেন শোকাহত মানুষেরা। দিনের শুরুতেই মানুষের সারি তৈরি হতে থাকে এবং সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা আরও দীর্ঘ হয়। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকা থেকে শোকাহত মানুষের লাইন আসাদ গেট পেরিয়ে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। প্রধান সড়কের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি রাস্তা ও গলিপথে মানুষ ধৈর্যের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অনেকের হাতে ছিল দলীয় পতাকা ও প্ল্যাকার্ড, আবার অনেকেই নীরবে দোয়া করছিলেন। জনসমাগম কেবল সড়কেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন এলাকায় মানুষকে উড়াল সড়কের ওপর এবং আশপাশের ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে জানাজার কার্যক্রম একনজর দেখার চেষ্টা করতে দেখা যায়। হলিক্রস রোড এলাকা, পূর্ব ও পশ্চিম তেজতুরীপাড়া, গ্রিনরোড ও আশপাশের গলিগুলোতেও ব্যাপক জনসমাগম লক্ষ্য করা যায়। তীব্র যানজট উপেক্ষা করেই স্থানীয় বাসিন্দারা জানাজায় অংশ নিতে দাঁড়িয়ে যান। বিএনপি সমর্থকদের পাশাপাশি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন, এমন সাধারণ নাগরিকদেরও পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, যা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের ব্যাপক প্রভাবের প্রতিফলন। বয়স্ক মানুষ, নারী ও তরুণ—সব বয়সের মানুষই উপস্থিত ছিলেন; অনেককেই শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত দেখা যায়। এই অভূতপূর্ব জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ ও চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের মোতায়েন করা হয়। আশপাশের সড়কে যান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। বিশৃঙ্খলা এড়াতে কর্তৃপক্ষ সবাইকে শান্ত থাকার এবং নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানায়। অনেক শোকাহত মানুষ খালেদা জিয়াকে দেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাস গড়ে দেওয়া এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন। ফার্মগেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তি বলেন, ‘খালেদা জিয়া শুধু একটি দলের নেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এ দেশের সব মানুষের নেত্রী। খালেদা জিয়ার জানাজার কারণে বাড়ানো হয়েছিল মেট্রোরেলের ট্রিপের সংখ্যা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে এসেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে মানুষের ঢল নেমেছে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এবং সংসদ ভবনের সামনের মাঠসহ আশাপাশের এলাকায়। খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় এসেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর ও পাকিস্তানের পার্লামেন্টের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক। এছাড়া ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানেরাও জানাজায় অংশ নিতে এসেছেন। জানাজা নামাজ শেষে বিকেলে শেরেবাংলা নগরে স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে খালেদা জিয়াকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তার সরকারের প্রথম মেয়াদকাল ছিল গণমাধ্যমের জন্য সবচেয়ে স্বাধীন সময়। এ জন্যও আমরা তাকে শ্রদ্ধা জানাই। এত সংগ্রাম ও ত্যাগের পরও খালেদা জিয়ার জীবদ্দশায় প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। সাত বছরেরও বেশি সময় তাকে কারান্তরীণ ও গৃহবন্দি অবস্থায় কাটাতে হয়েছে। যা ছিল আইনের অপব্যবহারের এক দৃষ্টান্ত। তিনবারের নির্বাচিত এই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বন্দিদশায় যে আচরণ করা হয়েছে, তা ছিল মর্যাদাহানিকর। দুই বছরের বেশি সময় তাকে নির্জন কারাবাসে রাখা ছিল নিষ্ঠুর ও অমানবিক। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর দলটি হয়ে পড়ে নেতৃত্বহীন। সেই অবস্থায় খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসতে বাধ্য হন। আত্মপ্রচারবিমুখ ও রাজনীতির জগতে অনভিজ্ঞ গৃহবধূ হয়েও তিনি ধীরে ধীরে কিন্তু দৃঢ়ভাবে দল ও দেশের রাজনীতিতে নিজের ছাপ রেখে গেছেন। সুযোগসন্ধানীদের মতো আপস না করার যে দৃঢ়তা তিনি দেখিয়েছিলেন, সেটাই ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির জয়ের অন্যতম মূল কারণ। আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তার অবদান ছিল অসামান্য। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তার বিজয় ছিল অভূতপূর্ব। এর মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া দৃঢ় ও সুস্পষ্ট লক্ষ্যসম্পন্ন এক রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরশাদের সমঝোতার প্রস্তাবের কাছে নতি স্বীকার করতে বারবারই অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি। আর সেই কারণেই এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির যে রাজনৈতিক ভূমিকা, তা সম্পূর্ণভাবে খালেদা জিয়ার কৃতিত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে দল ও দলের নেত্রী জায়গা করে নেয় সাধারণ মানুষের মনে। এ দেশের জনগণ বুঝতে পারে এখানে এমন একজন নেত্রী আছেন, যার কথা ও কাজে মিল আছে এবং লোভনীয় প্রস্তাব দিয়েও তাকে টলানো যায় না। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু, নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি দায়িত্বের গুরুত্ব উপলব্ধি করে যথাযথভাবে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন মর্যাদাসম্পন্ন, সংবেদনশীল, ভিন্নমতের প্রতি উদার, দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং নিজের গুরুদায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন। তিনি জানতেন, তার শেখার অনেক কিছু আছে এবং সেই শেখার প্রচেষ্টা তিনি অব্যাহত রেখেছিলেন। বিদ্যমান রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনে বিরোধী দল আওয়ামী লীগের দাবি মেনে নিয়ে নিজের রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রকৃত পরীক্ষা দেন তিনি। আমাদের রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও জনগণের পছন্দ বিবেচনায় নিয়ে তিনি বিরোধীদের এই দাবি মেনে নেন। এতে তার উদারতা ও ভিন্নমত গ্রহণের সক্ষমতা প্রকাশ পায়, যা তিনি নিজে কখনো প্রচার করেননি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি ছিল এক বিরল দৃষ্টান্ত এবং ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির এক সুযোগ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিরোধীরা এটাকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে না দেখে উল্টো নিরবচ্ছিন্ন হরতালের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলকে হয়রানি করতেই ব্যবহার করেছেযা পরবর্তীতে দেশ জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। খালেদা জিয়ার প্রয়াণে দেশবাসির সাথে আমরা শোকাহত। এমন সময়ে আমাদের উচিত বাংলাদেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নের প্রতি তার অঙ্গীকার নিয়ে ভাবা এবং তার দেখানো পথ ধরে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া। দেশের প্রতি বঙ্গ জননী বেগম খালেদা জিয়ার ভালোবাসা ও জনগণের প্রতি অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন করতে সত্যিকার অর্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এখনি সুসময়।

আলোকিত প্রতিদিন/৩১ ডিসেম্বর ২০২৫/মওম

- Advertisement -
- Advertisement -