আলমগীর মতিন চৌধুরীঃ
দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিন পর প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশে মাটিতে ফিরেছেন আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানিয়েছেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। দীর্ঘ ১৭ বছর পর প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরলেন তিনি। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে প্রতীক্ষার পালা শেষ হয়েছে বিএনপির কোটি কোটি নেতাকর্মী ও ভক্ত-সমর্থকের। নেতার এ প্রত্যাবর্তন নেতাকর্মীদের প্রতীক্ষার অবসানই শুধু নয়, বিএনপির রাজনীতির নতুন পথের সূচনা ও দেশের জনগণ নয়া আলোর দিশা খুঁজে পেয়েছে। আগামীর সুখ শান্তির সংকল্পেরও বার্তা বয়ে এনেছে। তারেক রহমান এখন ঢাকায়। ধীরে এগোচ্ছে গাড়িবহর, হাত নেড়ে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন তারেক রহমান। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লাল-সবুজ বাসে করে ৩০০ ফিট এলাকার গণসংবর্ধনা মঞ্চে উঠেই হাত নেড়ে দলের নেতাকর্মী ও সর্বসাধারণের উদ্দেশে শুভেচ্ছা জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

প্রিয় নেতার আগমন উপলক্ষে বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট পর্যন্ত সড়কের দুপাশে জড়ো হয়েছেন লাখ লাখ নেতাকর্মী ও দেশের সাধারণ মানুষ। আসলে তারেক রহমানের গাড়িবহর বিমানবন্দর থেকে রাজলক্ষ্মী ঘুরে ৩০০ ফিটে নির্মিত মঞ্চের দিকে গাড়িবহরটি ধীরগতিতে আসে, যেন অপেক্ষমাণ মানুষ তাকে এক পলক দেখতে পারেন। তিনিও যেন মানুষের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারেন। এই পথ পাড়ি দিয়ে তারেক রহমানকে মঞ্চে আসতে প্রায় ৪ ঘন্টা সময় লেগেছে। মঞ্চে দেশবাসি ও দলের পক্ষথেকে তারেক রহমানকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বিএনপির মহাসচিব ফকরুল ইসলাম আলমগীর। তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, সবাই মিলে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। আমরা আজ ঐক্যবদ্ধ হলে একটি সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো। তিনি বক্তব্যে আরো বলেন, জুলাই আন্দোলনে সকলের চাওয়া পাওয়া ও শহীদ ওসমান হাদির প্রত্যাশিত দেশ গড়তে সকলে ঐক্যবদ্ধ হবারও আহবান জানান। তারেক রহমান উপস্থিত জনসমুদ্রের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব অনুধাবন করে বলেন, আমরা ঐক্য গড়ে তুলতে পারলে উন্নয়ন সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো। এসময়ে তিনি খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে বলেন, খালেদা জিয়া নিজের জীবনের থেকে তিনি দেশ ও দেশের মানুষকে বেশি ভালোবাসেন। তারেক রহমান সবাইকে দেশ গড়তে কাজ করার আহবান জানান। তৎকালীন ওয়ান/ইলেভেন সরকারের আমলে দেশের টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশ ছেড়েছিলেন তারেক রহমান। এরপর দেশের রাজনীতিতে গড়িয়েছে অনেক জল। একে একে কেটে গেছে ১৭টি বছর। দেশের আকাশে প্রবেশ করেই আবেগঘন স্ট্যাটাসে তারেক রহমান লিখেছেন- ‘দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিন পর বাংলাদেশের আকাশে! ১৭ বছর আগে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তারেক রহমান যখন দেশ ছেড়েছিলেন তখন তিনি ছিলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব। এখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তো বটেই, দলের দ্বিতীয় প্রধান নেতাও তিনি। তার মা বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এক মাসের বেশি সময় ধরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নির্ধারিত সময় অনুসারে বৃহস্পতিবার ২৫ ডিসেম্বর সকালে তারেক রহমান ও তার স্ত্রী-কন্যাকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করে।

সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটে বিমানটি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেখানে যাত্রাবিরতির পর তারেক রহমানকে বহনকারী বিমান বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাটি স্পর্শ করে। বিমানবন্দরে তারেক রহমানকে স্বাগত জানান দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। এসময় তিনি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কুলাকুলি ও কুশলবিনিময় করেন এবং উপস্থিত সবার উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। এর আগে গতকাল বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় দিনগত রাত সোয়া ১২টা) তাকে বহনকারী বিমান ঢাকার উদ্দেশে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর ত্যাগ করে। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে রাজধানীর পূর্বাচলের ৩০০ ফিট এলাকায় গণসংবর্ধনার আয়োজন করেছে বিএনপি। প্রিয় নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে নেতাকর্মীদের ঢল নেমেছে রাজধানীর পথে পথে। কুড়িল বিশ্বরোড থেকে ৩০০ ফিট সংবর্ধনা মঞ্চ পর্যন্ত সড়কের উভয় পাশে তারেক রহমানকে স্বাগত জানিয়ে টাঙানো হয়েছে বর্ণিল ব্যানার ও ফেস্টুন। তারেক রহমানকে অভ্যর্থনা জানাতে গত কয়েক দিন ধরেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা ঢাকায় আসতে শুরু করেন। বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা প্রতিটি প্রবেশমুখে ছিল বিএনপি নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখর। তাদের চোখেমুখে ছিল উল্লাস আর কণ্ঠে ছিল নেতার ফিরে আসার আগমনী স্লোগান। এদিকে, তারেক রহমানের গণসংবর্ধনা ঘিরে ঢাকায় ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও গত কয়েকদিন ঘরেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তৎপর রয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারেক রহমানের নিরাপত্তা সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে তার নিরাপত্তায় স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) চাওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে দলটি। সমাবেশ শেষে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যাবেন। সেখান থেকে তিনি যাবেন গুলশান অ্যাভিনিউর ১৯৬ নম্বর বাসায়। তিনি এ বাসায়ই থাকবেন। ২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তারেক রহমানের বাংলাদেশে ফেরা যৌক্তিক কারণেই খুবই গুরুত্ব পেয়েছে। সর্বশেষ তাঁর মা বেগম খালেদা জিয়ার মারাত্মক অসুস্থতার সময় তিনি তাঁর দেশে না ফেরা নিয়ে যে ফেসবুক স্ট্যাটাস দেন, সেটা কিছু প্রশ্নের জবাব দিলেও তৈরি করেছিল আরও নতুন কিছু প্রশ্ন। কিন্তু ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার দিন তাঁর দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার কারণে নির্বাচন নিয়ে কারও মনে কিছুটা শঙ্কা যদি তৈরি হয়েও থাকে, সেটা একেবারে দূর করে দিয়েছে। এমন এক সময়ে তারেক রহমান বাংলাদেশে আসছেন, যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো সবচেয়ে ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। নানা জল্পনা–কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তিনি দেশে ফিরেছেন। তাঁর এই দেশে ফেরা তাঁর দিক থেকে খুব বেশি উদ্যাপনের সুযোগ নেই। কারণ, তাঁর সামনে আছে অকল্পনীয় বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ যেমন আছে নির্বাচনের আগে বিএনপির প্রধান হিসেবে, তেমনি এই চ্যালেঞ্জ আছে তিনি যদি বিজয়ী হয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। বাংলাদেশ যে আবার গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে যাচ্ছে, রাজনৈতিক দল হিসেবে তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্বের দাবিদার তারেক রহমান ও তাঁর দল বিএনপি। এদিকে ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমান গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসভবনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে এখানে থাকবেন বলে দলীয় বিশেষ সূত্র নিশ্চিত করেছেন। সরেজমিনে দেখা যায়, নিরাপত্তার স্বার্থে বাসভবনের আশপাশের সব সড়কে সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। সকাল থেকেই সংশ্লিষ্ট এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ, সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। বাসভবনের প্রবেশমুখসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। তল্লাশি শেষে প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদেরই এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। বাসভবন ঘিরে নিরাপত্তা জোরদারের কারণে সাধারণ যানবাহন ও পথচারীদের বিকল্প সড়ক ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে। এছাড়া, তারেক রহমানের বাসভবনের সামনে সাংবাদিকদের অপেক্ষায় থাকতে দেখাগেছে। তারেক রহমানের দেশে আগমনে বিভিন্ন দল, সংগঠন ও সংস্থা স্বাগত জানিয়েছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আগমনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ হবে বলে মনে করেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে কিছু রাজনৈতিক শূন্যতা আছে। তারেক রহমানের আগমনে তা পূরণ হবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে স্বাগত জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ২৫ ডিসেম্বর দুপুর দেড়টার দিকে জামায়াত আমির তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে তারেক রহমানকে স্বাগত জানান। জামায়াত আমির লিখেছেন, ‘জনাব তারেক রহমান, সপরিবারে সুস্বাগতম! জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী কামরুল ইসলাম সজল ও সুপ্রিম কোর্ট শাখার সম্পাদক ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের নেতৃত্বে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। তারেক রহমান দেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহবান জানিয়েছেন।
লোকিত প্রতিদিন/২৫ ডিসেম্বর ২০২৫/মওম

