আলমগীর মতিন চৌধুরীঃ
বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কের চরম অবনতি। নিরাপত্তাহীন হয়ে উঠেছে বাংলার আকাশ। যুদ্ধের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন জনগণ। কোটা বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির মৃত্যুতে উত্তাল বাংলাদেশ! সীমান্তের এপার- ওপারে ক্রমাগত জেগে উঠছে বাংলাদেশ ও ভারত বিরোধী স্লোগান। একের পর এক হুমকি পাল্টা হুমকি ভেসে আসছে দুই দেশ থেকে। ভারতের অভিযোগ বাংলাদেশের কট্টরপন্থী আন্দোলনকারীদের অত্যাচারে একেবারে দুর্বিষহ অবস্থায় পড়েছে সংখ্যালঘু হিন্দুরা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ভারতকে ‘সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বদলীয় প্রতিবাদ সমাবেশে হাসনাত আবদুল্লাহ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ভারত যদি এভাবে বাংলাদেশের সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়া অব্যাহত রাখে তাহলে ভারতের যত সেপারিস্টদের আশ্রয় দিয়ে সেভেন সিস্টার্সকে বিচ্ছিন্ন করে দেব। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড, বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্যবাদ বিরোধী আন্দোলন ও ‘সেভেন সিস্টার্স’ ইস্যু আলোচনায় আসায় নড়েচড়ে বসেছে ভারত। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে মিজোরাম-বাংলাদেশ সীমান্তসহ বিভিন্ন স্থানে বেশ বড় বড় কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করছে ভারত। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও আসামকে ঘিরে তিনটি নতুন সেনা ঘাঁটি তৈরির পর এবার মিজোরামে চতুর্থ একটি স্টেশন তৈরির সিন্ধান্ত নিয়েছে ভারতের প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ। সদ্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১৭ মাউন্টেন স্ট্রাইক কর্পসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মিজোরামে প্রস্তাবিত স্থানটি পরিদর্শন করেছেন। এটি ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত সুরক্ষায় এক নতুন কৌশলগত গুরুত্বের প্রতিফলন হিসাবে দেখছে ভারত। একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী (বিএসএফ) শিলচরে স্থায়ী প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরির কাজ করছে। তাদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে আধুনিক ও শক্তিশালী বাঙ্কার এবং বিস্ফোরণরোধী আশ্রয়স্থল তৈরি, শিলচর ও মিজোরাম ফ্রন্টিয়ারের অধীনে তিনটি ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে মাটির নিচে অস্ত্র মজুত করার সুবিধা তৈরি করা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যেকোনো পরিস্থিতিতে বাহিনীর দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো। মিজোরামের পশ্চিম ফাইলেং ব্লকের শিলসুরি গ্রাম ও দক্ষিণ মিজোরামের লংতলাই জেলার পারভা বর্ডার আউটপোস্ট এই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। পারভা আউটপোস্টটি ভারত-মিয়ানমার এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের সংযোগস্থলে অবস্থিত, যা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪,০৯৬.৭০ কিলোমিটার। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩,২৩৯.৯২ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করেছে ভারত। বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই বেড়া দেওয়ার কাজ আরও জোরদার করা হয়েছে। বাংলাদেশের ওই নেতার মন্তব্যকে অপমানজনক এবং বিভাজন সৃষ্টিকারী মন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করে, তিপরা মোথারা যুব শাখা ত্রিপুরার আগরতলায় বাংলাদেশের অ্যাসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনারের অফিসের সামনে তুমুল বিক্ষোভ দেখায়। এদিন একেবারে জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে বাংলাদেশের কট্টরপন্থী এবং ভারত বিরোধী মনোভাবাপন্ন নেতাদের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলতে থাকেন ত্রিপুরা ইয়ুথ ফেডারেশন এর সদস্যরা। শুধু তাই নয়, ওপার বাংলায় ভারত বিরোধী একাধিক মন্তব্যের জেরে এবার কঠিন কূটনৈতিক পদক্ষেপেরও আর্জি জানান তারা। ফলে বর্তমানে দুই দেশের রাজনৈতিক পর্যায়ে যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের ধারা উঠে আসছে তা কূটনীতির আলোচনার পথ ক্ষীণ হয় আসছে। সরকার ও নেতাদের মনেরাখা দরকার কূটনীতি সব সময় আস্থা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভারসাম্যের জায়গা। জবাব পাল্টা জবাবের প্রতিযোগিতার কারণে সম্পর্কের অবনতি ঘটেই চলেছে। অথচ সংলাপ ও ধৈর্যশীলতার সাথে উভয় দেশের আলোচনাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারতো। চলমান কালে বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কের অবনতি উদ্বেগের। দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা এমনিতেই দীর্ঘকাল থেকে দুর্বল। এই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে বাণিজ্য জ্বালানি পরিবহন এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট নীতিতে বাংলাদেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আবার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও ভারত বড় একটি বাজার এবং অংশীদার। সম্পর্ক খারাপ হলে ক্ষতি শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষেরই। ত্রিপুরা ইউথ ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট সুরজ দেববর্মা এক বক্তব্যে বলেন, ভুললে চলবে না ভারত সরকার এবং ভারতের সেনাবাহিনীর জন্যই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। এখন সেই দেশের লোকজন আমাদের শত্রু আখ্যা দিচ্ছে। আমাদের সর্বভৌমত্বকে অপমান করছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশে ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল, তা আরও অবনতির দিকে মোড় নিয়েছে। দুই দেশই এখন নিজেদের কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রের (আইভ্যাক) কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। ভারতের নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে বিক্ষোভের ঘটনা নিয়ে ঢাকা ও দিল্লি পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল এক ব্রিফিংয়ে দাবি করেন, ময়মনসিংহে পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে হত্যার প্রতিবাদে শনিবার ২০-২৫ জন যুবক বিক্ষোভ করেছেন। তারা নিরাপত্তা বেষ্টনী ভাঙার চেষ্টা করেননি, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেননি। পুলিশ কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাদেরকে সরিয়ে দেয়। এ নিয়ে তিনি বাংলাদেশি গণমাধ্যমের একাংশের ‘বিভ্রান্তিকর প্রচারণা’র সমালোচনা করেন। তবে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ভারতের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, দিল্লিতে কূটনৈতিক এলাকার ভেতরে বাংলাদেশ মিশনের অবস্থান খুবই নিরাপদ স্থানে, সেখানে হিন্দু চরমপন্থীরা ওই এলাকার মধ্যে আসতে পারবে কেন? তাহলে তাদের আসতে দেওয়া হয়েছে। এমন ঘটনা প্রত্যাশিত নয়। রাতে নজিরবিহীন ভাবে দিল্লির নিরাপদ কূটনৈতিক জোনের বাংলাদেশ হাউজের গেটে গিয়ে বিক্ষোভ দেখায় একদল উগ্রপন্থি। ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর যে কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক নিরাপত্তা ঘটনা, পারস্পরিক অভিযোগ এবং প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্য সেই দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম স্থগিত, উভয় দেশের মিশনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক তলব এসব ঘটনায় স্পষ্ট যে সম্পর্ক এখন কেবল নীতিগত মতপার্থক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি আস্থার গভীর সংকটে রূপ নিয়েছে। নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ ঘিরে ভারত ও বাংলাদেশের ব্যাখ্যা একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ভারত বলছে, এটি ছিল সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত প্রতিবাদ। ঢাকা বলছে, কূটনৈতিক এলাকার গভীরে প্রবেশ, হুমকি ও অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতির লঙ্ঘন। ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ভারত ভিসা ও বাণিজ্যে কড়াকড়ি আরোপ করে। অন্যদিকে ঢাকাও স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধ দেয়। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে তার বক্তব্য দেওয়ার বিষয়ে ঢাকা বারবার আপত্তি জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে দুবার অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা। তবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে এখনই ফেরত দেওয়ার সম্ভাবনা কম। সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন খুনি ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে খবর বেরিয়েছে। এ নিয়ে দুই দেশের উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের ‘বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড’ নিয়ে উদ্বেগ জানায়। হাদি হত্যায় জড়িতরা ভারতে ঢুকলে তাদের গ্রেপ্তার ও ফেরত দেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়। ভারত সেদিনই ঢাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানায়, তারা তাদের ভূখণ্ডকে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজে ব্যবহার করতে দেয় না। এরপর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তলব করে বাংলাদেশে ‘নিরাপত্তার অবনতি’ নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে। ভারতের ওই বিবৃতিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত বা অর্থবহ কোনো প্রমাণ ভারতের সঙ্গে শেয়ার করেনি। দিল্লির ওই বিবৃতিতে বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আহ্বান জানানো হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় তৌহিদ হোসেন বলেন, ভারতের কাছ থেকে এ বিষয়ে পরামর্শের প্রয়োজন নেই, কারণ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তারা নির্বাচনের কথা বলেনি। ওই দিনই নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কের ভিসা আবেদন কেন্দ্র দুপুরে হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের ফেরত দেওয়ার দাবিতে ‘জুলাই ঐক্য’ এর ব্যানারে ভারতীয় হাইকমিশন ঘেরাও কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পুলিশ অবশ্য রামপুরায় ওই মিছিল আটকে দেয়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে ক্রমেই উত্তেজনা বাড়ছে। দুই প্রান্তে সাম্প্রতিক নানা ঘটনা পরিস্থিতিকেই বিষিয়ে তুলেছে। দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি যেকোন সময়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিতে পারে। হতেপারে হামলা পাল্টা হামলা। এখন যুদ্ধের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের জনগণ।
আলোকিত প্রতিদিন/২৪ ডিসেম্বর ২০২৫/মওম

