আজ মঙ্গলবার, ২৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ।   ১০ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাদুঘর চালু মিসরে, আয়তন ৭০টি ফুটবল মাঠের সমান

আরো খবর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

প্রাচীন বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের একটি- মিসরের ‘দ্য গ্রেট পিরামিড অফ খুফুর’ কাছেই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে ‘দ্য গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম বা জিইএম’-এর।

এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর বলা হচ্ছে, যেখানে এক লাখেরও বেশি প্রত্নসামগ্রী রাখা হয়েছে। প্রাক-রাজবংশীয় সময় থেকে গ্রীক এবং রোমান যুগ পর্যন্ত প্রায় সাত হাজার বছরের ইতিহাস সেখানে ঠাঁই পেয়েছে।

বিখ্যাত মিসরবিদরা বলছেন, এই জাদুঘর চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে অন্য দেশে থাকা মিসরের প্রত্নসামগ্রী ফিরিয়ে আনার দাবি জোরদার হবে। তার মধ্যে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে থাকা ‘রোসেট্টা স্টোন’ও রয়েছে। তবে দ্য গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়ামের সবচেয়ে যে বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তা হলো প্রাচীন মিসরের বালক সম্রাট তুতেনখামুনের অক্ষত সমাধি থেকে পাওয়া পুরো সংগ্রহের একসঙ্গে প্রদর্শন। ব্রিটিশ মিসরবিদ হাওয়ার্ড কার্টার এটি আবিষ্কারের পর এই প্রথম এটি প্রদর্শিত হচ্ছে।

এই পুরো সংগ্রহের মধ্যে আছে তুতেনখামুনের দর্শনীয় সোনার মুখোশ, সিংহাসন এবং রথসহ মূল্যবান সব সামগ্রী।

“কিভাবে উপস্থাপন করা যায়, তা নিয়ে আমাকে চিন্তা করতে হয়েছে। কারণ সমাধিটি ১৯২২ সালে আবিষ্কারের পর এর সাড়ে ৫ হাজার সামগ্রীর মধ্যে ১ হাজার ৮০০র বেশি প্রদর্শন করা হয়েছে,” বলছিলেন আন্তর্জাতিক মিসরবিদ সমিতির সভাপতি এবং গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়ামের সাবেক প্রধান ড. তারেক তওফিক।

তিনি বলছেন, “আমার ধারণায় ছিল পুরো সমাধি সংগ্রহ প্রদর্শন। অর্থাৎ কিছুই আর গুদামে বা অন্য জাদুঘরে থাকবে না। যাতে শত বছর আগে হাওয়ার্ড কার্টার যেভাবে পেয়েছিলেন আপনি সেভাবেই তা দেখতে পারেন”।

প্রায় বারশ কোটি ডলার (১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার) ব্যয়ে তৈরি করা এই জাদুঘর বছরে অন্তত আশি লাখ দর্শনার্থী দেখতে পারবেন। এটি মিসরের পর্যটনকে চাঙ্গা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

“দ্য গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম মিসরবিদ্যা ও সাংস্কৃতিক পর্যটনের নতুন সোনালী যুগের সূচনা করবে বলে আমরা আশা করি,” বলছিলেন গিজা পিরামিডের গাইড আহমেদ সেদ্দিক।

তুতেনখামুনের প্রদর্শনী আর খুফুর সাড়ে চার হাজার বছরের পুরোনো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নৌকা বাদ দিয়ে গ্যালারীর বেশিরভাগ সামগ্রী গত বছর থেকেই দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা আছে।

আহমেদ সেদ্দিক বলছেন, “আংশিক খোলা সত্ত্বেও আমি জাদুঘরে অনেকগুলো ট্যুরের আয়োজন করেছি। এখন এটি গৌরবের চূড়ায় পৌঁছাবে। যখন তুতেনখামুনের সংগ্রহ খোলা হবে তখন আপনি কল্পনা করতে পারবেন যে পুরো পৃথিবী ফিরে এসেছে। কারণ এটা একটি আইকনিক ফারাও, সবচেয়ে বিখ্যাত রাজা।”

লন্ডন থেকে ভ্রমণে আসা স্যাম বলছিলেন, “আমরা সেখানে গিয়ে মিসরের প্রত্নসামগ্রী দেখার জন্য অপেক্ষা করছি”। আরেকজন ব্রিটিশ পর্যটক বলছিলেন, তিনি এর আগে তাহরির স্কোয়ারে নিওক্লাসিক্যাল মিসরীয় জাদুঘরে তুতেনখামুনের প্রদর্শনী দেখেছিলেন।

নতুন তৈরি হওয়া জাদুঘর প্রায় ৫ লাখ বর্গমিটারের, যা ৭০টি ফুটবল মাঠের সমান। দেয়ালে খোদাই করা হয়েছে প্রাচীন মিসরীয় লিপি। অ্যালাবাস্টার পাথরের ত্রিভুজাকার নকশা আর প্রবেশদ্বার করা হয়েছে পিরামিড আকৃতির।

এই জাদুঘরে ৩২০০ বছরের পুরোনো ও ১১ মিটার লম্বা সবচেয়ে বিখ্যাত ফারাও (সম্রাট) রামেসিস দ্য গ্রেটের মূর্তি আছে। এটি ২০০৬ সালে কায়রো রেল স্টেশনের কাছ থেকে নতুন জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছিল।

বিশাল সিড়ির কাছে প্রাচীন রাজা রাণীদের মূর্তি এবং উপরের তলায় বিশাল জানালা থেকে দেখা যাবে গিজা পিরামিড। নতুন এই জাদুঘরটির প্রস্তাব করা হয়েছিল ১৯৯২ সালে। আর নির্মাণ শুরু হয় ২০০৫ সালে। ধারণা করা হয়, এটি নির্মাণ শেষ করতে পিরামিড নির্মাণের মতো সময় লেগেছে।

তবে এই প্রকল্প বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় ও পরে কোভিড মহামারি এবং আঞ্চলিক যুদ্ধগুলোর সময়েও। মিসরে দীর্ঘদিন পর্যটনমন্ত্রী ছিলেন ড. জাহিদ হাওয়াস। তিনি বলেন, “এটা ছিল আমার স্বপ্ন। জাদুঘর পুরোপুরি চালু হয়েছে দেখে আমি সত্যিই খুশি।”

তিনি বলেন, “এখন আমি দুটি জিনিস চাই: প্রথমত, জাদুঘরগুলো চুরি করা প্রত্নবস্তু কেনা বন্ধ করুক; দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশ মিউজিয়াম থাকা রোসেট্টা স্টোন, লুভর জাদুঘরে থাকা ডেনডেরা জোডিয়াক এবং বার্লিন থেকে নেফারতিতির আবক্ষ মূর্তি ফিরে আসুক।”

দ্য রোসেট্টা স্টোন ১৯৯৯ সালে পাওয়া গিয়েছিল। এটি হায়ারোগ্লিফিকস পাঠোদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি। ফরাসি সেনারা এটি আবিস্কার করে। তবে পরে ব্রিটিশরা যুদ্ধের পর দখল করে নেয়।

অন্যদিকে ডেনডেরা জোডিয়াক একটি প্রাচীন মিসরীয় আকাশ মানচিত্র। ১৮২১ সালে ফরাসিরা একটি মন্দির থেকে এটি কেটে নিয়ে গিয়েছিল। এছাড়া মিসরের অভিযোগ, জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদরা মিসরের ফারাও আখেনাতেনের স্ত্রী নেফারতিরির মূর্তি পাচার করে নিয়ে গিয়েছিল।

ড. জাহিদ হাওয়াস বলছেন, “ওই তিন দেশ থেকে এগুলো ফিরিয়ে আনা দরকার উপহার হিসেবে। মিসর বিশ্বকে অনেক কিছু উপহার দিয়েছে”। তবে ব্রিটিশ জাদুঘর বিবিসিকে বলেছে, তারা এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাননি।

সূত্র:  বিবিসি বাংলা

আলোকিত প্রতিদিন/০২নভেম্বর ২০২৫/মওম

- Advertisement -
- Advertisement -