আলোকিত ডেস্ক:
রাজধানী ঢাকায় ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে যেন চেপে বসেছে বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণের কারণে বাড়ছে ফুসফুসজনিত রোগসহ নানা ধরনের রোগবালাই। কমছে মানুষের গড়আয়ু। অন্যদিকে বায়ুদূষণ প্রতিরোধে দৃশ্যমান ও কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে উদাসীনতা একেবারেই স্পষ্ট। বায়ুদূষণ রোধ করতে হলে এর অন্যতম উৎসগুলো বন্ধ করার ক্ষেত্রে জোর দিয়েছেন পরিবেশবিদ ও পরিবেশবাদীরা। বিশ্বজুড়ে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউ এয়ারের তথ্য অনুযায়ী সোমবার (১১ ডিসেম্বর) ঢাকার বাতাসের মান ‘অস্বাস্থ্যকর’। এদিন সকাল ৮টার দিকে ৩২৭ স্কোর নিয়ে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে ঢাকা। একইসময়ে ২২৭ স্কোর নিয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কুয়েতের কুয়েত সিটি। ২২২ স্কোর নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সারাজেভো। ২১৭ স্কোর নিয়ে চতুর্থ স্থানে রয়েছে পাকিস্তানের লাহোর। ২১২ স্কোর নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে ভারতের দিল্লি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বায়ুদূষণ: আইকিউএয়ারের এই তালিকায় আরও বলা হয়েছে, ঢাকার বাতাসে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণাই (পিএম ২.৫) দূষণের অন্যতম উৎস। অর্থাৎ ঢাকার বাতাসে যে পরিমাণ বস্তুকণা আছে, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ডের চেয়ে ২১ গুণের বেশি। বাতাসের এই মানদণ্ড পরিমাপ করে ঘরের বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহারেরও পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার নিয়মিত বায়ুদূষণের পরিস্থিতি তুলে ধরে থাকে। এই তালিকায় দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ সময়ই প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান দখল করে থাকে ভারতের দিল্লি এবং পাকিস্তানের লাহোর। পরিবেশ অধিদপ্তরের সবশেষ দেওয়া তথ্যমতে, গত ১৪ নভেম্বর বায়ুদূষণে ঢাকার অবস্থান ছিল ১৭২। সেদিন ২৪৩ স্কোর নিয়ে বায়ুদূষণে শীর্ষে ছিল নারায়ণগঞ্জ। গত ৭ নভেম্বর সব ছাড়িয়ে ৩১২ স্কোরে পৌঁছেছিল নারায়ণগঞ্জ, যা ‘সবচেয়ে অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ঢাকার বাইরে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী ও চট্টগ্রামেও বাড়ছে বায়ুদূষণের মাত্রা। রাজধানীতে চলতি বছরের বায়ুদূষণ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্ট্যামফোর্ডের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)। ক্যাপসের গবেষকদের মতে, ২০২৩ সাল হতে পারে সবচেয়ে দূষিত বছর। একইসঙ্গে বিগত আট বছরের মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে (জানুয়ারি-অক্টোবর) গড়ে প্রায় ১৭.৯৩ শতাংশ বেশি বায়ুদূষণ হয়েছে। ২০২২ সালের তুলনায় যা ৭.৫ শতাংশ বেশি। এদিকে চলতি বছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বৈশ্বিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বায়ুদূষণের কারণে বছরে বাংলাদেশের মানুষের গড়আয়ু প্রায় ৭ বছর কমে যাচ্ছে। বায়ুদূষণ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য: বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্মাণকাজের সামগ্রী ঢেকে না রাখা, বর্জ্য অব্যবস্থাপনা, পরিবহন ও ইটভাটার অব্যবস্থাপনাই বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। স্ট্যামফোর্ড বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘বায়ুদূষণ বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই শীতকালে এর মাত্রা ৭ থেকে ৮ গুণ বেশি হয়ে থাকে। ঢাকায় নির্মাণকাজ, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বর্জ্য পোড়ানো এবং ইটভাটার কারণে বায়ুদূষণের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলছে বলে জানান এই গবেষক। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘ফিটনেসবিহীন যানবাহনের ডিজেল বা পেট্রোলগুলোও অত্যন্ত নিম্নমানের। ছোট যানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াও বায়ুদূষণের জন্য দায়ী। কারণ যানের সংখ্যা যত বাড়বে ততই দূষণ বাড়বে। ইটের ভাটাগুলোতেও অতিরিক্ত সালফারযুক্ত কয়লাসহ নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহৃত হচ্ছে। ঢাকার বায়ুদূষণকে দুটি পর্বে ভাগ করে নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ ইকবাল হাবিব বলেন, ‘একটি বহির্দেশীয় দূষণ অন্যটি অভ্যন্তরীণ। অভ্যন্তরীণ দূষণ মূলত যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণ না করার কারণে প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘খোদ সিটি করপোরেশন ভোরবেলা ঝাড়ু দিয়ে ধুলোবালি উড়িয়েও বাতাসের দূষণ করতে থাকে। এছাড়া নগরে যে সীমিত সংখ্যক গাছপালা আছে সেই গাছের পাতাগুলোতেও ধুলোর আস্তরণ পড়ছে প্রতিনিয়ত। আর সবুজ পাতায় ধুলোর আস্তরণ পড়ে যাওয়ায় পর্যাপ্ত সালোকসংশ্লেষণ তৈরি হচ্ছে না। ফলে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পাচ্ছেন না মানুষ। ফার্মগেট এলাকায় জরিপ করে দেখেছি যে বায়ুদূষণের কারণে সেই এলাকার বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্নায়ুতান্ত্রিক অসুস্থতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে’ বলেন ইকবাল হাবিব। ক্যাপসের চেয়ারম্যান গবেষণা তুলে ধরে বলেন, ‘শ্বাসকষ্টসহ ফুসফুসজনিত নানা রোগ, হরমোন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ঝুঁকি, ত্বক প্রদাহজনিত রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এমনকি শিশুদের মস্তিষ্ক বিকাশে বাধাসহ নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন সবাই। ড. আহমদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘বিভিন্ন গবেষণা বলছে, প্রতি বছর বাংলাদেশের এক লাখ চল্লিশ হাজারের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের গড়আয়ু ৬ বছর তিন মাস কমে যাচ্ছে। দুঃখজনক যে এই মৃত্যুর সারিতে তরুণ প্রজন্মও রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো এই দূষণগুলো থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারে। আবার আর্থিক সচ্ছলতা থাকায় রোগাক্রান্ত হলেও ভালো চিকিৎসা নিতে পারে। কষ্টদায়ক বিষয় যে সমাজের নিম্নআয়ের মানুষেরা অধিক বায়ুদূষণের শিকার হচ্ছেন। ফলে পরিবেশগত ন্যায্যতা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারী- এই তিন ধরনের মানুষ বায়ুদূষণের কারণে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বায়ুদূষণের সমাধান কী পরিবেশবিদ ও পরিবেশবাদীদের মতে, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী দূষণ প্রতিরোধের মূল দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়হীনতা আর গ্রহণযোগ্য নয় বলেও জানান তারা। একটি শক্তিশালী আইন থাকার পরেও এই আইনের কোনো কার্যকরী প্রয়োগ না থাকায় বায়ুদূষণ কমছে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। পরিবেশ ও মানুষ বাঁচাতে হলে সরকারের উদ্যোগে সচেতনতামূলক উদ্যোগের পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের বাস্তবায়ন ছাড়া বিকল্প নেই বলেও মত তাদের। বায়ুদূষণের প্রত্যেকটি কারণই সমাধানযোগ্য বলে জানান নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ ইকবাল হাবিব। সরকারের অবহেলার কারণেই এই পরিণতি বলে মনে করেন তিনি। পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুমান ব্যবস্থাপনার উপপরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল মোতালিব সিটি করপোরেশনকে দোষারোপ করে জানান, দূষণ কমাতে সিটি করপোরেশনকে বারবার অবহিত করা হলেও তারা যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। এদিকে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, ৯৫ ভাগেরও বেশি বর্জ্যের সুব্যবস্থাপনা করা হয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উপপ্রধান এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মফিজুর রহমান ভুঁইয়া বলেন, ‘ধুলোবালি রোধের জন্য জলকামান দিয়ে পানি ছিটিয়ে থাকি। নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে যারা আইন মানেন না সেখানে ম্যাজিস্ট্রেটরা আইনগত পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন। যতই পদক্ষেপ নেন না কেন কিছু সীমাবদ্ধতা এখনও রয়েছে বলে স্বীকার করেন উত্তর সিটি করপোরেশনের এই কর্মকর্তা।
আলোকিত প্রতিদিন/ ১১ ডিসেম্বর ২৩/ এসবি

