আজ বৃহস্পতিবার, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ ।   ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

চালকদের কর্মঘণ্টা নেই, বাড়ছে দুর্ঘটনা

-Advertisement-

আরো খবর

- Advertisement -
- Advertisement -

আলোকিত ডেস্ক: 

একজন গাড়িচালক দিনে কত ঘণ্টা কাজ করবেন? সড়ক পরিবহন বিধিমালায় এই সময় নির্ধারণ করে দেওয়া আছে দিনে আট ঘণ্টা, তবে একটানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি নয়। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যায় না। এরপর সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে মূল দোষ যখন চালকের উপর আসে, তার প্রতিক্রিয়ায় বাসচালক মাহবুবুর রহমান জিয়া বলে ওঠেন- একজনকে দিয়া টানা ১৫-১৬ ঘণ্টা গাড়ি চালাইলে ড্রাইভারের তো করার কিছুই থাকে না। সেও তো মানুষ, ঘুম তো আসবেই। বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার জিয়া ২০ বছরের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ধরনের ভারী যানবাহন চালিয়ে আসছেন। এখন তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুর-আব্দুল্লাহপুর রুটের একটি গাড়ি চালান। সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালকের দায় কতটা- সকাল সন্ধ্যার প্রশ্নে পরিবহনকর্মীদের কর্মঘণ্টার প্রসঙ্গটি তোলেন তিনি। সাম্প্রতিক একটি দুর্ঘটনার নজির তুলে ধরেন জিয়া, বছিলা ব্রিজের ঢালে গত ২৩ সেপ্টেম্বর ভোরের সেই দুর্ঘটনায় পাঁচজন মারা গিয়েছিলেন। একটা ড্রাম্প ট্রাক ও একটি সিএনজি অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটেছিল সেখানে। জিয়া বলেন, পরে জানলাম ড্রাম্প ট্রাকের ড্রাইভার সারা রাত গাড়ি চালাইছে। আর সিএনজি ড্রাইভারও রাতে দেরি করে ঘুমিয়ে আবার ভোরে উঠেই গাড়ি নিয়ে বের হইছিল। দুজনের চোখেই ছিল ঘুম। সেই কারণেই নাকি অ্যাক্সিডেন্টটা হইছে। আমার মনে হয় সড়কে এই ঘুমটাই চালকের প্রধান শত্রু। এর কারণেই অনেক অ্যাক্সিডেন্ট হয়। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন হয়, নানা পদক্ষেপও নেওয়া হয়, তাতেও দেশে সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যে চোখ রাখলে দেখা যায়, গত চার বছরে সড়কে মৃত্যু ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।

২০১৯ সালে ৪৬৯৩টি দুর্ঘটনায় নিহত ৫২১১, আহত ৭১০৩ জন

২০২০ সালে ৪৭৩৫টি দুর্ঘটনায় নিহত ৫৪৩১, আহত ৭৩৭৯ জন

- Advertisement -

২০২১ সালে ৫৩৭১টি দুর্ঘটনায় নিহত ৬২৮৪, আহত ৭৪৬৮ জন

২০২২ সালে ৬৮২৯টি দুর্ঘটনায় নিহত ৭৭১৩, আহত ১২৬১৫ জন

২০২৩ সালে (সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) ৪২২৭টি দুর্ঘটনায় নিহত ৪৩৪৬, আহত ৭৭২৩ জন

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যের বরাতে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, সড়কে গড়ে প্রতিদিন ৬৪ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। বছরে নিহতের সংখ্যা ২৩৩৬০ জন।

মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে। প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ আহত হচ্ছে। প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৮০ হাজার মানুষ প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজারের বেশি ১৭ বছরের কম বয়সী শিশু। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ২২০ জন মানুষ প্রতিবন্ধী হচ্ছে কেবল সড়ক দুর্ঘটনায়। সড়কে দুর্ঘটনা এবং মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন সময়ই বেপরোয়া গাড়িচালনাকে দায়ী করে আসছেন এই দপ্তরের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তবে চালকরা সড়কে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন কেন- সেই প্রশ্নের উত্তর মিলল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজের কাছে। তিনি বলেন, যতদিন পর্যন্ত চালকদের বেতন কাঠামোর আওতায় না আনা হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনা বাড়বে ছাড়া কমবে না। কারণ চালকরা মালিকদের কাছ থেকে চুক্তিতে গাড়ি নিয়ে বের হন। ফলে বেশি ট্রিপ দেওয়ার মানসিকতায় তারা সড়কে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালান। দুর্ঘটনা ঘটার এটি একটি অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করেন কাজী নেওয়াজ। এদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান মনে করেন, সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালক চতুর্থ কারণ। তিনি বলেন, এক নম্বর কারণ অব্যবস্থাপনা, তারপরে আছে গাড়ির ফিটনেস। তিন নম্বর কারণ বেহাল সড়ক ব্যবস্থা। সাইদুর বলেন, ম্যানেজমেন্টের কাজ হচ্ছে চালকের কর্ম ঘণ্টা নির্ধারণ করে দেওয়া। কিন্তু আমাদের দেশে কোনো চালকই নির্দিষ্ট কর্ম ঘণ্টা অনুযায়ী কাজ করতে পারেন না। আমাদের দেশে চালকরা একটানা ১৬ ঘণ্টা, ১৮ ঘণ্টা কিংবা ২২ ঘণ্টাও গাড়ি চালাচ্ছেন। একটা সময় চালকের চোখে ঘুম তো আসবেই। ঘুমে তাদের চোখ বন্ধ হয়ে গেলে পলকের মধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। কী কী কারণে দুর্ঘটনা: সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকদের একটানা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর পাশাপাশি নানা কারণ বিভিন্ন সময় চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তার মধ্যে রয়েছে- সড়কে চালকদের প্রতিযোগিতা, যততত্র গাড়ি থামানো, যাত্রীদের যত্রতত্র পারাপার, আলাদা লেইন না থাকায় একাধিক ধরনের গাড়ি একসঙ্গে চলা, ফুটপাত বেদখল ইত্যাদি। এআরআইয়ের সহকারী অধ্যাপক কাজী নেওয়াজ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ গাড়িচালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বা গতির খেলা। এর সঙ্গে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, গাড়ি-সড়কের ফিটনেস ও চালকদের মানসিক অবস্থাও জড়িত। যা বলছেন চালকরা: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) গত সেপ্টেম্বর মাসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই মাসে দুর্ঘটনায় যে যানটি সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনায় পড়েছে, তা হল মোটরসাইকেল। জুবায়েদ আল মাসুম নামে এক মোটরসাইকেল চালক বেহাল সড়ককে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে দেখালেন। ঢাকায় বসবাসরত এই চাকরিজীবী  বলেন, আমদের দেশের সড়কগুলো মোটরসাইকেল চালকদের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সড়কই খানাখন্দে ভরা। এছাড়া সড়কের ধার দিয়ে জমে থাকে বালি ও ইট-পাথরের টুকরা। এতে চাকা পিছলে অনেক মোটরসাইকেল চালকই ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হন। ১৮ বছর ধরে ব্যক্তিগত গাড়ি চালিয়ে আসা মো. বিল্লাল হোসেন মহাসড়কে তিন চাকার ধীর গতির যানবাহনের বেপরোয়া চলাচলকে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করছেন। পাশাপাশি বড় ট্রাক ও লরির হেডলাইটকে সমস্যা হিসেবে দেখালেন তিনি। বিল্লাল বলেন, রাতের মহাসড়কে যেসব বড় বড় ট্রাক ও লরি চলে, সেগুলোর বেশিরভাগই অতিরিক্ত হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করে। কোনো লরি কিংবা ট্রাকে ৮টি পর্যন্ত হেডলাইট লাগানো থাকে। সেগুলোর আলোও অনেক বেশি উজ্জ্বল। একারণে প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের মতো ছোট যানবাহনের চালকদের চোখ ধাঁধিয়ে যায় বলে মনে করেন তিনি, যার ফল হিসেবে দুর্ঘটনা ঘটে। সিরাজুল ইসলাম নামে এক ট্রাকচালক ঘুমের পাশাপাশি অসচেতনতা ও ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতাকেও কারণ হিসেবে দেখান। তিনি বলেন, বেশিরভাগ পথচারী খুব অসচেতন। তারা হুটহাট করে দৌড় দিয়ে রাস্তা পার হয়। ডানে-বামে কিছু দেখে না। এমন অবস্থায় দ্রুতগতির গাড়ির সামনে পড়লে চালকের কিছু করার থাকে না। আবার অনেক চালকও অসচেতন। তারা একটু তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে বেশি গতিতে গাড়ি চালায়। ঢাকার আদাবরের মনসুরাবাদ এলাকায় বসবাসকারী সিরাজুল প্রায় ১৬ বছর ধরে ট্রাক চালালেও এখন পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনা ঘটাননি বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, আমি গাড়িতে উঠে কখনও তাড়াহুড়ো করি না। সবসময় দেখেশুনে ধীরেসুস্থে গাড়ি চালাই। কারণ আমি দেখেছি, যারা বেশি তাড়াহুড়ো করেছে, তারাই অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। সেটা পথচারী হোক কিংবা চালকই হোক। দুই যুগ ধরে ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চলের একটি রুটের বাস চালিয়ে আসা মো. মিজান সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালকদের চেয়ে বেশি দোষ দিতে চান পরিবহন মালিকদের। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বেশিরভাগ গাড়িই ‘ফিটনেস সমস্যা’ নিয়ে চলে, কারণ মালিকরা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে অর্থ খরচ করতে চায় না। তার ভাষায়, দেখা যায় যে টায়ারের মেয়াদ শেষ হলেও সেগুলো পরিবর্তন করেন না মালিকরা। যানবাহনের  যে কোনো সমস্যায় জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালানোর চেষ্টা করেন। সেই  ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি নিয়ে চালক রাস্তায় বের হলে দুর্ঘটনা তো ঘটবেই।  অথচ দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু চালকদের দোষ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ খোকন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ফিটনেসবিহীন লক্কর ঝক্কর যানবাহন ৮০ ভাগ দায়ী। মালিক পক্ষের ভিন্ন কথা: দীর্ঘ সময় ধরে চালকদের গাড়ি চালানোকে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে মানতে নারাজ বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান রমেশ চন্দ্র ঘোষ। তিনি বলেন, একটি দুর্ঘটনায় ঢালাওভাবে শুধু চালকদের দোষারোপ করা যেমন ঠিক না, তেমনি চালকদের একটানা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে, এই অভিযোগও ঠিক না। বিষয়টি এমন হলে কম দূরত্বের রুটে তো দুর্ঘটনা হওয়ার কথা নয়। আর অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বা যানজট না হলে আমাদের দেশের বেশিরভাগ রুটেরই দুরত্ব ৪-৫ ঘণ্টার। একজন চালক একদিন গাড়ি চালালে পরেরদিন তার ডিউটি দেওয়া হয় না। আর এখন দূরপাল্লার বেশ কয়েকটি রুটে চালকদের জন্য বিশ্রামাগার করছে সরকার। সেসব স্থানে অতিরিক্ত চালক রাখা হবে। শ্যামলী পরিবহনের মালিক রমেশ ঘোষ দক্ষ চালকের সঙ্কটের বিষয়টি তুলে বলেন, ভবিষ্যতে এই সঙ্কট আরও প্রকট হবে, কারণ সর্বশেষ সড়ক আইনে একটি দুর্ঘটনার জন্য চালকদের যে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, তাতে এই পেশায় কেউ আর আসতে চাইবে না। মামলা বাড়ছে, দুর্ঘটনা কমছে না: সড়কে অনিয়ম দেখলেই মামলা করছেন দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে সারাদেশে মোটরযান আইনে মোট মামলা হয়েছিল ৬ লাখ ১৩ হাজার ১৯টি। এসব মামলায় জরিমানা আদায় হয়েছিল ৭৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা। পরের বর ২০২১ সালে মামলার সংখ্যা ৩ লাখ ৪২ হাজার ৮৯৩টি বেড়ে ৯ লাখ ছাড়িয়ে যায়। জরিমানা আদায়ও বেড়ে হয় ২২১ কোটি ৭ লাখ টাকা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ খোকন বলেন, মামলা দিয়ে কোনোদিন দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। তিন চাকার ধীর গতির গাড়ি মহাসড়কে দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। নানা নির্দেশেও তা বন্ধ হচ্ছে না কেন- প্রশ্নে হানিফ বলেন, “হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের মাসোহারা দিয়ে নামমাত্র ভুয়া ফিটনেসের কাগজ বানিয়ে মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এরা। এআরআইয়ের সহকারী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ বলছেন, দুর্ঘটনা কমাতে দায়িত্বশীলরা নানা কথা বললেও কাজ সেভাবে হচ্ছে না। তার ভাষ্যে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণ শনাক্ত করে প্রতিকারের অনেক সুপারিশও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনা কমাতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। সবকিছু কাগজে-কলমেই থেকে যাচ্ছে।

আলোকিত প্রতিদিন/ ২৮ নভেম্বর ২৩/ এসবি

- Advertisement -
- Advertisement -