আজ রবিবার, ১ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ।   ১৫ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

হাসপাতাল যেন মৃত্যুপুরী, কিছুই নেই রোগী ছাড়া

আরো খবর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইসরায়েলের অভিযানের পর গাজার সর্ববৃহৎ হাসপাতাল আল-শিফা ‘ডেড জোনে’ পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-ডব্লিউএইচও। ডব্লিউএইচও’র কয়েকজন এবং জাতিসংঘের আরো কয়েকজন কর্মকর্তা গত শনিবার গাজা সিটির হাসপাতাল আল-শিফা পরিদর্শন করে আসার পর এক মূল্যায়নে এ কথা বলেন বলে জানায় সিএনএন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) এ ডব্লিউএইচও-র পক্ষ থেকে এক পোস্টে বলা হয়, জাতিসংঘের দলটি প্রায় এক ঘণ্টা হাসপাতালের ভেতরে কাটিয়েছে। সে সময়ে হাসপাতালটির খুব কাছে প্রচণ্ড লড়াই চলছিল। দলটি হাসপাতালের প্রবেশ পথে একটি গণকবর দেখতে পেয়েছে। এবং বলেছে, ওই গণকবরে ৮০টির বেশি মৃতদেহ কবর দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসার অভাবে গত দুই বা তিন দিনে হাসপাতালের অনেক রোগী মারা গেছেন বলেও জানায় ডব্লিউএইচও। বিদ্যুৎ সংকটে গত এক সপ্তাহে গাজার আল-শিফা হাসপাতালে চার অপরিপক্ক শিশুসহ ৪০ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানিয়েছে জাতিসংঘ। গত শুক্রবার (১৭ নভেম্বর) গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, বিদ্যুৎ সংকটে চিকিৎসা সরঞ্জাম চালাতে না পারায় এর আগের ৪৮ ঘণ্টায় মারা গেছে ২৪ জন। জ্বালানি সংকটের কারণে হাসপাতালের জেনারেটরগুলো চালু রাখা যাচ্ছে না। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আশরাফ আল-কুদরা শুক্রবার বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো চালু রাখতে না পারায় হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ২৪ জন রোগী মারা গেছে। এদিকে তৃতীয় দিনের মতো গত শুক্রবারেও হাসপাতালটিতে অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। তাদের অভিযোগ- হাসপাতালের ভবনের নিচে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের গোপন সুড়ঙ্গ রয়েছে। সেখান থেকে হামলা পরিচালনা করছে সংগঠনটি। তবে ইসরায়েলি বাহিনীর এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে হামাস ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।  জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক সংস্থা ইউএনওসিএইচএ গাজার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানিয়েছে, মধ্য গাজার নুসাইরাত এলাকায় কয়েকটি আবাসিক ভবনকে লক্ষ্য করে গভীর রাতে বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে ঘটনাস্থলেই অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছে। ভবন গুঁড়িয়ে গিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছে প্রায় ১৪০ জন। আল-শিফায় এখন ২৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী এবং ২৯১ জন রোগী রয়েছে। চিকিৎসা সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত দুই বা তিন দিনে অনেক রোগী মারা গেছে। ৩২টি শিশুসহ অনেক রোগীর অবস্থা খুবই গুরুতর। দুইজন রোগী কোনো রকম ভেন্টিলেশন ছাড়াই আইসিইউ তে রয়েছে। ২২ জন ডায়ালাইসিসের রোগী জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা পাচ্ছেন না। হাসপাতালের কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগী জাতিসংঘের কর্মীদের বলেছেন, তারা তাদের ‘স্বাস্থ্য এবং জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। আল-শিফার রোগী এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষিণ গাজার অন্য দুইটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তারা ‘জরুরি ভিত্তিতে পরিকল্পনা করছে বলেও জানিয়েছে ডব্লিউএইচও। সেখানে বেশিরভাগ রোগীই যুদ্ধাহত, অনেকের শরীরের জটিল সব হাড় ভেঙে গেছে বা অঙ্গচ্ছেদ করা হয়েছে। কেউ কেউ মাথায় আঘাত, পোড়া ক্ষত, বুকে-পেটে গুরুতর আঘাত নিয়ে শয্যায় পড়ে আছেন। ২৯ জন রোগীর মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত রয়েছে। তারা এমনকি স্বাস্থ্য কর্মীদের সহায়তা ছাড়া নাড়াচাড়া পর্যন্ত করতে পারেন না। হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধের চিকিৎসা ও অ্যান্টিবায়োটিকে অভাবে অনেক রোগীর ক্ষত মারাত্মক রূপ নিয়েছে। গত বুধবার ভোর থেকে আল-শিফা হাসপাতালের ভেতর অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। যেখানে রোগী ও চিকিৎসাকর্মীদের পাশপাশি প্রাণ বাঁচাতে গাজার বিভিন্ন স্থান থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার ফিলিস্তিনি আশ্রয় নিয়েছিল। ইসরায়েলের দাবি, হামাস হাসপাতালটি তাদের সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। তাছাড়া হাসপাতালের নিচে ভূগর্ভে হামাসের একটি কমান্ড সেন্টার রয়েছে। যদিও হামাস এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উভয়ই ইসরায়েলের ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সিএনএন স্বাধীনভাবে কোনো পক্ষের দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। হাসপাতালে অভিযান চালানোর কারণে ইসরায়েলের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। যদি ইসরায়েল তাদের দাবির পক্ষে প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয় তবে দেশটির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠবে। গাজায় শরণার্থীশিবিরে ইসরায়েলের হামলায় নিহত ৮০: গাজার উত্তরাঞ্চলে শরণার্থীশিবিরে স্থানীয় সময় গত শনিবার ইসরায়েলের চালানো হামলায় ৮০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন হামাসের স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মকর্তা। এই শরণার্থীশিবিরে জাতিসংঘ পরিচালিত একটি স্কুলও ছিল। স্কুলটি ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধে গৃহহীনদের আশ্রয়শিবির হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাই করেছে এএফপি। এসব ভিডিওতে আবাসিক ভবনের মেঝেতে রক্ত ও ধুলামাখা অবস্থায় মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরেও ধ্বংসযজ্ঞ দেখা গেছে। গত ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বলছে, হামলায় এ পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলের বেসামরিক নাগরিক। এ ছাড়া ২৪০ জনকে জিম্মি করা হয়েছে। তবে হামাস সরকার বলেছে, ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর বিমান ও স্থল অভিযানে ১২ হাজার ৩০০ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৫ হাজারের বেশি শিশু। জাতিসংঘের মানবিক ত্রাণবিষয়ক প্রধান মার্টিন গ্রিফিথস গাজায় হামলায় হতাহতের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন। ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় গাজার স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। ওই দিন থেকেই গাজায় নির্বিচার হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। হামলার প্রতিবাদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ, মিছিল ও সমাবেশ করেছেন শান্তিকামী মানুষ। নাসের হাসপাতালের চিত্র: বাতাসে উটকো এক গন্ধ, সেই সঙ্গে ভাসছে স্বজনদের আহাজারি, রোগীদের সামাল দিতে চিকিৎসাকর্মীদের দৌড়াদৌড়ি আর চিৎকারের শব্দ — এভাবেই অবরুদ্ধ গাজার নাসের হাসপাতালের পরিস্থিতির বর্ণনা দিচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় প্রতিদিন শত শত মানুষকে হাসপাতালে আনা হচ্ছে। রোগীদের ভিড়ে হাসপাতালের কোথাও ঠাঁই নেই। এ অবস্থাতেও কোনোরকমে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালটি। হাসপাতালে আনা রোগীদের লাল, হলুদ ও সবুজ এই তিনটি পর্যায়ে চিহ্নিত করে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। লাল প্রতীকের অর্থ রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। অন্য দুটি প্রতীকের অর্থ রোগীর অবস্থা তুলনামূলক ভাল। হাসপাতালের চিত্রের বর্ণনা দেওয়া ওই ব্যক্তি জানায়, তিনি যখন হাসপাতালটিতে ছিলেন তখন ইসরায়েলি হামলায় আহত এক রোগীকে আনা হয়। তার জায়গা হয়েছিল হাসপাতালের মেঝেতে। সে সময় তিনি আহত ব্যক্তির ছবি তোলেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি এমন ছিল যে আমি যার ছবি তুলেছিলাম তার সম্পর্কে বেশিকিছু জানা খুবই কঠিন ছিল। হাসপাতালের কাগজপত্রে লেখা ছিল তাকে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে টেনে বের করা হয়েছে। তার নামই বা কী, তিনি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন — আমি তাও জানি না। তবে আহত ব্যক্তির অবস্থা তুলনামূলক ভালো বলে মনে হয়েছিল। কারণ তাকে সবুজ প্রতীকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওই ব্যক্তির ভাষ্য: নাসের হাসপাতালে ভয়াবহতার যে চিত্র তা বোঝানো কঠিন। সবকিছুই ঝাপসা। মানুষ দৌড়াচ্ছে, চিৎকার করছে। রোগী থেকে রোগীর দিকে ছুটছেন চিকিৎসক ও নার্সেরা। পরিবারের সদস্যরা মরিয়া হয়ে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজছেন। হাসপাতালে গন্ধও খুব কঠিন। এটি পোড়া চামড়ার মতো, অথবা সম্ভবত রক্ত এবং মাংসের গন্ধে মিশ্রিত পোড়া টায়ারের মতো। খুব অদ্ভুত এক গন্ধ। যুদ্ধের আগেও হাসপাতালে রোগী ছিল। তবে তখন যে পরিস্থিতি ছিল সেটি সামাল দেওয়ার মতো। এরপর ইসরায়েলি বাহিনী স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিলে এবং উত্তর গাজা থেকে বেসামরিক নাগরিকদের দক্ষিণ গাজার দিকে সরে যেতে বললে বাস্তুচ্যূত বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি হাসপাতালে আশ্রয় নিতে শুরু করে। এক চিকিৎসক বলছিলেন, যুদ্ধের আগে হাসপাতালে দৈনিক রোগী ভর্তির গড় সংখ্যা ছিল ৭০০। এখন প্রতিদিন নিয়মিত দুই হাজারেরও বেশি রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছে। গাজার অনেক হাসপাতালের মতোই নাসের হাসপাতালেও জ্বালানি সংকটের কারণে চিকিৎসা সরঞ্জাম চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অঞ্চলে সীমিত ত্রাণ সহায়তা পৌঁছালেও হাসপাতালের কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা বলেন, ‘আমরা কিছুই পাইনি। চিকিৎসার আশায় জ্বরে কাঁপতে থাকা শিশুদের হাসপাতালে আনা হচ্ছে। কিন্তু ওদের জন্য পর্যাপ্ত এসিটামিনোফেনের (প্যারাসিটামল) ব্যবস্থাটুকুও নেই। ছবি তোলা সেই ব্যক্তি বলছিলেন, তিনি প্রায়ই হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের পাশ দিয়ে যান। এটি সবসময়ই রোগীতে ভর্তি থাকে। টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এ হামলায় গাজার ৩৫টি হাসপাতালের মধ্যে ২১টি বন্ধ হয়ে গেছে আগেই। বাকি হাসপাতালগুলোও জ্বালানি সংকটে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।

আলোকিত প্রতিদিন/ ২০ নভেম্বর ২৩/ এসবি

- Advertisement -
- Advertisement -