আজ সোমবার, ৩ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ ।   ১৭ জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

সাহিদা আক্তারের ছোটগল্প : নিখোঁজ

-Advertisement-

আরো খবর

- Advertisement -
- Advertisement -

নিখোঁজ
সাহিদা আক্তার

“কেন তুমি এসব করছো? কি চাইছো বলোতো-কি করিনি আমি তোমার জন্য। যার প্রতিদান তুমি এভাবে দিচ্ছো। কোথা থেকে উঠে এসেছো সব ভুলে গেছো! এতোটাও অকৃতজ্ঞ হইওনা। তোমার এগুলো মানায়না। ভীষণ শান্তভাবে কথাগুলো বলছিলো শায়নক সিরাজ।” -“না না আমি কিছুই মনে করতে চাইনা। যেটা ফেলে এসেছি সেটা অতীত। অতীতকে বর্তমানের সাথে গুলিয়ে ফেলোনা। অতীত আমার যেমনই থাকনা কেন বর্তমানকে নিজের চেষ্টা শ্রম দিয়ে গড়ে তুলেছি। তাই পিছনের ঐ দিনগুলোর কথা মনেও করতে চাইনা। চিৎকার করে বলতে লাগলো রুকমিনি”। এই বাসায় যার কথাই শেষ কথা। যেনো বাণী চিরন্তন। দাপটের দমকা হাওয়ায় আশেপাশের মানুষগুলো মরে বেঁচে থাকে। সামনে এসে কিছু বলতে গেলেই তার কপালে বহুত দুঃখ জুটিয়ে ছাড়ে। তাই তার সামনেও কেউ যেতে চায়না। পুরুষ শাসিত সমাজের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানো নারীবাদীরা প্রতিবাদে রাতের যে ঘুম হারাম করেছে তাদেরকে ডেকে এনে দেখালে বুঝবে কতখানি সফল হয়েছে তারা। নারী শাসিত সমাজ কাকে বলে। -“চুপ করো তুমি তোমার চিৎকারে এ পাড়াতে কাক চিলও বসতে পারেনা। দিন দিন তোমার বেপরোয়া আচরণ বেড়েই চলছে আর নেওয়া যায়না। শায়নক বলতে বলতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।” রাশ ভারী আপাদমস্তক একজন ভদ্রলোক মানুষ সে। কি করবে কি বলবে ভেবে পায়না। ভীষণ শান্তিপ্রিয় প্রাণখোলা মিশুকে মানুষ। সেদিন একচোট হয়ে গেলো কিছু আর না বলে শায়নক ঘুমিয়ে পড়লো। পরেরদিন আবার সেই একই ঝগড়া । অফিস বন্ধ থাকায় শায়নক বাহিরে যেতে চাইছিলো না। সারা সপ্তাহে এই একটা দিন সে একটু স্বস্তি পায় কাজ ও দায়িত্বের নাগপাশ থেকে। তার মধ্যে এমন যন্ত্রণা! সত্যিই আর পেরে উঠছিলো না সে তার যেনো দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।হঠাৎ রুকমিনির ঘরের দিকে খেয়াল করে দেখে দরজা এখনো বন্ধ। -খুলেইনি। প্রায় প্রতি সকালেই শায়নকের সকালের নাস্তা অফিসে আর দুপুরের খাবার ক্যান্টিনে। মাঝে মাঝে রাতের খাবারটা বাসায় খাওয়ার সৌভাগ্য হয়। তাও ম্যাডামের মর্জির উপর। যাক গে আজকের খাবারটাও নাহয় বাহিরেই খাই বলেই উঠে বাইরে বেরিয়ে গেলো শায়নক। সেদিন সারাটাদিন শায়নক বাড়ি ফিরলোনা। কাজের চাপে তার একমাত্র বোনের বাসায় যাওয়া হয়না। যাক আজ একটু সময় পাওয়া গেলো এই সুবাদে বোনটাকে দেখে আসি। বাহিরে আর তেমন কিছুই খেলোনা বোনের হাতের রান্না খাবে বলে। এই একটা জায়গায় তার ভীষণ শান্তি। ঘরে ঢুকতেই বোন মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলো তার খাওয়া হয়নি। রাজ্যের খাবার একজায়গায় করে পাশে বসে খাওয়ালো। তারপর দুই ভাই বোনের কথা বিনিময়ের মধ্যে হঠাৎ বোন শারিকা বললো “তুই কি সাবরিনা ভাবিকে একদম ভুলে গেছিস দাদা? ” -এজন্যই তোদের বাসায় যাইনা। -আমার হিরের টুকরা ভাবি ছিলো। আর এটা কি কোথাকার শয়তান, লোভী। -তুই আর সাবরিনার কথা মুখেও আনবিনা যেভাবে সে চলে গেলো আর আমাকে রুকমিনিকে মেনে নিতে বাধ্য করলো। -আমি ওকে কোনদিন ক্ষমা করবোনা একজনমের চিতায় আমাকে রেখে গেলো। শায়নকের গলাটা ভারী হয়ে আসছিলো। -সে তো ভালো মানুষ ছিলো ওর শয়তানি বুঝবে কি করে দাদা বল। শারিকা বলতে বলতে বললো আজ আমাকে বলতে দে দাদা আমাকে থামতে বলবিনা। -কোথায় ছিলো রুকমিনি সাবরিনা ভাবী ওকে তুলে নিয়ে এসেছিলো কি অবস্থায়!ভাবীর দুঃসম্পর্কের বোন লাগতো এলাকায় সে নাকি এক ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পালিয়ে পালিয়ে গিয়ে তার এক ছেলে হয়। পরে যদিও ছেলেসহ তাকে অস্বীকার করে সেই ছেলেটি। একদম কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলো আর ভাবী গ্রামে বেড়াতে গিয়ে ওর ট্র্যাপে পড়ে ওকে নিয়ে আসে। কিছুদিন পরেই ভাবী অসুস্থ হয় আর ধীরে ধীরে ভাবীর সব কিছু নিজের করে নিতে থাকে। জানিনা ভাবীকে কি সম্মোহনী জাদুতেই যে অন্ধ করে ফেলেছিলো ভাবী কিছুই চোখে দেখেতোনা ওকে ছাড়া। ভাবীর স্বামী সন্তান নাকি একমাত্র ওর কাছেই নিরাপদ আর ভালো থাকবে। নিজে জোড় করে বিয়ে দিলো কিন্তু বেশিদিন সইতে পারলোনা চলে গেলো না ফেরার দেশে। -আমার কি মনে হয় জানিস দাদা ভাবীকে হাতে সঙ্গে ওই মেরেছে।তারপর শুরু হলো ওর আসল রূপ দেখানো। আর তুমি শুধু কম বয়স কম বয়স বলে সব সহ্য করছিলে। ওর ছেলের সব দায়িত্ব তুমি নিয়ে নিলে নিজের সন্তানদের থেকেও বেশি। তারপরও কি লোভ তোমার বাড়ি ঘর সব কিছু নিজের নামে করে নিলো। ছেলেটাকেও বানিয়েছে নিজের কার্বনকপি। মানুষ তো মোটেও হয়নি। বরং তোমার নিজের ছেলে মেয়েকে দূরে পাঠিয়েছো ওদের জন্য। যদিও দূরে গিয়েই ওরা বেঁচে গেছে। মানুষ হয়েছে। এখানে থাকলে ওদের জীবনটা একেবারে শেষ করে দিতো। তোমাকে ওরা কতবার বলেছে বাবা তুমিও আমেরিকায় চলে আসো আমাদের কাছে। তোমাকে আর চাকরী করতে হবেনা। তোমার সেই এক কথা আমি আমার প্রিয় দেশ ছেড়ে যাবোনা। ওখানে দম বন্ধ হয়ে আসে। আমি জীবনের বাকীক’টা দিন এখানেই মাটির কাছাকাছি থাকবো। আমি তোমাকে আবারো বলছি ও তোমাকে বিষ দিয়ে মেরে ফেলবে তুমি চলে যাও ছেলে মেয়েদের কাছে। শায়নক এতক্ষণ কিছুই বলেনি চুপ করেছিলো এই প্রথম কেউ রুকমিনি সম্পর্কে কিছু বলার সুযোগ পেলো।ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো দেখি কি করি। আমি তো ওকে সব দিয়েছি শুধু পেনশনটা আমার দুটো ছেলে মেয়ের জন্য রেখেছিলাম। তাও……….। শায়নক বাড়ি ফিরে আর কোন কথা বললোনা রুকমিনির সাথে। এভাবে কয়েকদিন চলে যাবার পর রুকমিনি হঠাৎ একদিন শায়নক এর ঘর থেকে একটা চিঠি পেলো। রুকমিনি, একদিন আমার থমকে যাওয়া জীবনের দ্বারপ্রান্তে তুমি এসেছিলে হাসিমুখে, হাজারখানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে। আমার বিশ্বাস আর ভরসার মজবুত ভীত হতে না হতেই তোমার আমার দুরত্ব বাড়তে থাকে।এক জন্মের চিতা বুকে নিয়ে আমি চেষ্টা করেছি তোমার মন রক্ষা করতে। হয়তো তোমাকে ভালোবেসেছিলাম না হয় নিজের দায়িত্বের কাছে দায়বদ্ধ ছিলাম। তুমি জানো আমি তোমাকে কতভাবে মানিয়ে ও মেনে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তুমি বোধ হয় আমার কোন বেনামী অসুখ। যা আমাকে সবার থেকে আলাদা করে দিয়েছিলো। অনুভূতিহীন বেঁচেছিলাম এতোদিন। অনুভূতিহীন যাদের জীবন আছে। তারা জীবনে আসলে কতটুকুইবা বাঁচে!অশ্রুসিক্ত নয়নে চলে গেলাম তোমার থেকে পালিয়ে বাঁচতে নয় তোমাকে শান্তিতে থাকতে দিতে। চলে গেলাম। ভালো থেকো রোজ। আজ থেকে তোমার জন্য হলাম নিখোঁজ।

০৪-০৯-২০২৩ইং

- Advertisement -
- Advertisement -