নড়াইলে দেশের প্রথম ছয় লেনের ‘মধুমতি সেতু’ এবং নারায়ণগঞ্জে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম নাসিম ওসমান তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু’ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১০ অক্টোবর সোমবার নিজ কার্যালয় থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সেতু দুটির তিনি শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন । প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সড়ক পরিবহন এবং সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ঢাকায় সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ঈসা বিন ইউসুফ এবং জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি। এসময় ভিডিও কনফারেন্সে নারায়ণগঞ্জ এবং নড়াইলে সেতুপ্রান্তে দুই জেলাসহ আশপাশের অন্যান্য জেলার জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।
তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় সেতুর পূর্ব প্রান্তে এক বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম সেলিম ওসমান, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য লিকায়ত হোসেন খোকা, জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ, জেলা পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল, ব়্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানভীর মাহমুদ পাশা, নৌপুলিশের নারায়ণগঞ্জ জোনের পুলিশ সুপার মীনা মাহমুদ, সেতুর প্রকল্প পরিচালক শোয়েব আহমেদ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই, সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মো. শহীদ বাদল, মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি চন্দন শীল, সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহাসহ গণ্যমান্য অনুষ্ঠানে ছিলেন।
অন্যদিকে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে ৯৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে মধুমতি নদীর ওপর ৬৯০ মিটার দীর্ঘ মধুমতি সেতু নির্মিত হয়েছে। যা স্থানীয়ভাবে কালনা সেতু নামে পরিচিত। এটি নড়াইল, গোপালগঞ্জ, খুলনা, মাগুরা, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, যশোর এবং ঝিনাইদহ এই আটটি জেলাকে সংযুক্ত করেছে। প্রকল্প কর্মকর্তাদের মতে, সেতুটি চালু হওয়ার মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষ দ্রুত সড়ক যোগাযোগ সুবিধা পাবে। সেতুটি কালনাঘাট থেকে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্ব কমিয়ে দেবে। এটি দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল, যশোর থেকে ঢাকা পর্যন্ত ভ্রমণের সময়ও কমিয়ে দেবে। এই সেতু দিয়ে ঢাকা থেকে বেনাপোলের দূরত্ব হবে মাত্র ১৩০ কিলোমিটার।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলা এবং নড়াইল জেলার অন্তর্গত লোহাগড়া উপজেলার মধ্যে মধুমতি সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সেতুটি এশিয়ান হাইওয়ের একটি অংশ, যা রাজধানীকে দেশের বৃহত্তম বেনাপোল স্থলবন্দরসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। ২৭ দশমিক ১ মিটার চওড়া সেতুটিতে চারটি উচ্চ গতির লেন, ৪ দশমিক ৩০ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ রোড এবং দুটি সার্ভিস লেনসহ ছয়টি লেন রয়েছে। এই সেতুর কারণে বেনাপোল স্থলবন্দর, মোংলা সমুদ্রবন্দর ও নোয়াপাড়া নদীবন্দরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু, যা বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম নাসিম ওসমানের নামে নামকরণ করা হয়েছে। এই সেতুটি পূর্বে বন্দর উপজেলা মদনগঞ্জ এবং পশ্চিমে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সৈয়দপুরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে বন্দর উপজেলার লাখ লাখ মানুষ এই সেতুটি ব্যবহারে সুফল ভোগ করবে। সেই সঙ্গে পদ্মা সেতু দিয়ে যাতায়াত করা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষও মুন্সিগঞ্জ হয়ে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু দিয়ে মদনপুর হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যেতে পারবেন।
এটি নারায়ণগঞ্জ শহরকে বন্দর উপজেলার সঙ্গে সংযুক্ত করবে, অর্থনীতি চাঙা করবে, পদ্মা সেতুর মাধ্যমে চট্টগ্রাম এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলার মধ্যে যোগাযোগ সহজ করবে। সেতুটির প্রকল্প পরিচালক শোয়েব আহমেদ জানান, ১ দশমিক ২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলগামী যানবাহন এবং একইভাবে চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলগামী যানবাহন যানজট এড়াতে এবং সময় বাঁচাতে নারায়ণগঞ্জ শহরকে বাইপাস করতে সক্ষম করবে। এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে যানবাহনের ভ্রমণের সময় কমিয়ে দেবে।
এতদিন এই সেতুর দুই পাড়ের মানুষ এবং অন্যান্য এলাকার জনসাধারণের পারাপারের প্রধান মাধ্যম ছিল মোটরচালিত নৌযান। তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু চালুর ফলে পঞ্চবটি বিসিক শিল্প এলাকা, পঞ্চবটি মোড়, চাষাঢ়া মোড়, সাইনবোর্ড, নারায়ণগঞ্জের চট্টগ্রাম সড়ক বা ঢাকার পোস্তগোলা ও শনির আখড়া রুটে যানবাহনকে তীব্র যানজটের সম্মুখীন হতে হবে না বলে মনে করেন শোয়েব আহমেদ।
প্রকল্পটি ২০১০ সালে একনেকে অনুমোদন পেলেও ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্প পরিচালক বলেন, সেতু নির্মাণে ৬০৮ দশমিক ৫৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এরমধ্যে ২৬৩ দশমিক ৩৬ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের তহবিল থেকে এবং ৩৪৫ দশমিক ২০ কোটি টাকা সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট দিয়েছেন।
ওয়াকওয়েসহ সেতুটিতে ৩৮টি স্প্যান রয়েছে। এরমধ্যে পাঁচটি নদীতে এবং ৩৩টি পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে। হাঁটার পথসহ সেতুটির প্রস্থ ২২ দশমিক ১৫ মিটার। এছাড়া, ছয় লেনের টোল প্লাজা এবং দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাপ্রোচ রোডও নির্মাণ করা হচ্ছে।
শীতলক্ষ্যা নদী বন্দর উপজেলা এবং সোনারগাঁ উপজেলাকে জেলা সদর থেকে পৃথক করেছে। এ দুটি উপজেলা সরাসরি সড়কপথে জেলা সদরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল না। নৌকায় নদীপথের মাত্র ৩ থেকে ৫ কিলোমিটার দূরত্ব সড়ক পথে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হতো।
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুটি বন্দর উপজেলা এবং জেলা সদরের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করবে।


