10:46 pm |আজ শনিবার, ১৫ই কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ৩১শে অক্টোবর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

সংবাদ শিরোনাম:
অনুশোচনা । সাদিয়া জামান হিরা

অনুশোচনা । সাদিয়া জামান হিরা

গল্প

অনুশোচনা
সাদিয়া জামান হিরা

       আজ বহুদিনের পুরনো একটা কথা মনে পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেলো নীলাদ্রির, প্রায়ই হয়। বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির শব্দ ছাড়া কোনো শব্দই শুনা যাচ্ছিলো না। বৃষ্টির এক টানা ঝমঝম শব্দ তার মনকে আরও বিচলিত করে তুলছিলো। বহুদিন চাপা পড়ে থাকা কথাটা ভিতরে আলোড়ন তৈরি করছিলো। কথাটা কাউকে বলা দরকার। কিন্তু এমন জঘন্য কথাটা কাকে বলা যায় সেটা ভেবে পেলো না সে। তাই ড্রয়ার থেকে তালা খুলে ডায়রীটা তুলে নিয়ে লিখতে বসলো।

২০.০৬.২০২০
      হঠাৎ করেই কোত্থেকে একটা সাদা-কালো বিড়ালের বাচ্চা এসেছে বাড়িতে। বাচ্চাটা দেখতে খুবই কিউট কিন্তু তার একটা চোখ কেউ তুলে নিয়েছে। বিড়ালের বাচ্চাটাকে দেখে খুবই মায়া লেগেছিলো আমার। পেটটা একদম ভেতর দিকে ঢুকে গেছে। তাকে মাছ দিয়ে ভাত মেখে দিলাম। খেতে পারলো না। মাছের কাঁটা দিলাম তাও খেতে পারলো না। বাচ্চাটার জন্য কেনো জানি আরও বেশি মায়া লাগতে লাগলো। বয়স বেশি হলে দেড় থেকে দুই মাস হবে। মা-কে ডেকে এনে বিড়ালছানাটাকে দেখালাম। মা আদর করে কোলে তুলে নিলো। তাকে ভালো করে গোসল করিয়ে এনে বাটিতে করে দুধ খেতে দিলো। রাতে বাবা এলে তাকেও দেখালাম বিড়ালটাকে। সেও পছন্দ করলো খুব। এভাবে বেশ কয়েকদিন খুব ভালোই যাচ্ছিলো। আমার অবসরের বেশিরভাগ সময়টাই বিড়ালটাকে নিয়ে কাটছিলো।

      দিন পনেরো পরের কথা। বিড়ালছানাটাকে আমি এখন ভীষণ অপছন্দ করি। এর কারণটা হলো ওর প্রতি সবার ভালোবাসা। আমি যেহেতু বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান তাই সবার ভালোবাসা আর প্রশ্রয় পেয়ে পেয়ে আহ্লাদী হয়ে উঠেছিলাম। আর বাড়ির সবাইকেও আমার সব কাজ বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হতো। কারণ আমি ভীষন জেদিও ছিলাম! কিন্তু এই বিড়ালছানাটার প্রতি সবার এতো ভালোবাসা দেখে আমি ভিতরে ভিতরে জ্বলে যেতে লাগলাম। মনে হয়েছিলো আমার প্রতি এতো দিন যে ভালোবাসাটা ছিলো সেটা আর নেই। আর এরকম মনে হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ছিলো। কারণ এই কয়েকটা দিনে আমি সবকিছুতে বড্ড অনিয়ম করতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু একসময় যে মা আমার মাথায় একটা চুল এলোমেলো থাকলেও হায় হায় করে ছুটে আসতো, সেই মা আমার অনিয়ম লক্ষ্যই করলো না! যেই বাবা প্রতিদিন ফেরার আগে আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করতো কী কী আনবে, সে এখন আমাকে ফোন দেয়ার আগে মা-কে ফোন দেয় এটা জানতে যে, বিড়ালের জন্য কী আনবে?

      একদিন তো আমার চকোলেট আনতে ভুলেই গেল, কিন্তু বিড়ালের জন্য ঠিকই বল নিয়ে এসেছিলো। অবশেষে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সবার আদর আবার পেতে হলে এই বিড়ালটিকে বাড়ি থেকে তাড়াতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। আমার এক ফ্রেন্ডকে ফোন করে বললাম বিড়ালছানাটাকে যেন দূরে কোথাও রেখে আসে। সে আমার কথা মতোই বিড়ালটাকে পাশের এলাকায় ছেড়ে দিয়ে এলো। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক বাবা! আপদ দূর হলো। এখন আমার আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রইলো না। কিন্তু আমার সব স্বপ্ন মিথ্যে হয়ে গেল যখন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম বিড়ালটার গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে মা বলছে “কী রে! কাল সারারাত কই ছিলি? হ্যাঁ?” ভাগ্যিস বিড়ালটা কথা বলতে পারে না। এরপর আমার ফ্রেন্ডকে বললাম আরও দূরে ফেলে দিয়ে আসতে। সে আমার কথামতোই কাজ করলো। এবার বিড়ালটি আর ফিরলো না। দুই দিন পার হয়ে গেল, তা ও না। মনে মনে আমি ভীষণ খুশি হলাম। কিন্তু বাসার সবার ভীষণ মন খারাপ। ৩ দিনের দিন রাতের বেলা বাবা ফোন দিয়ে বললো, ” তোদের জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। রেডি থাকিস।” আমি খুশিতে তাধিন তাধিন করে নাচতে লাগলাম! সারপ্রাইজটা কী হতে পারে আর কী উপলক্ষে তা ভাবতে লাগলাম! চকোলেট/ কেক/ টেডি বিয়ার/ ড্রেস নাকি দামী জুয়েলারি? এসব ভাবতে ভাবতেই কলিং বেলের আওয়াজ শুনতে পেলাম। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললাম। কিন্তু দরজা খুলেই আমার হাসি মুখটা ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেলো। বাবার কোলে সেই বিড়ালটা! যাকে আমি আমার ফ্রেন্ডকে দিয়ে আজিমপুর এতিমখানার পাশে ফেলে এসেছিলাম। বাবা একে কোথায় পেলো? বাবা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো, আমার শুনতে ইচ্ছে হলো না। দ্রুত নিজের রুমে এসে দরজা লক করে দিলাম।

      প্রতিদিন বিড়ালটাকে দেখে দেখে আমি অতিষ্ট। কিছুতেই কি এ আমার জীবন থেকে দূর হবে না? প্রতিদিন আমি নানা রকম পরিকল্পনা করি কিন্তু প্রত্যেকটাই বাতিল করে দেই। শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিলাম এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে। কিন্তু কীভাবে? সেই উপায়ও পেয়ে গেলাম। পরদিন বিড়ালটাকে নিয়ে গেলাম ছাদের উপর। ফেলে দিতে গিয়ে ভাবলাম এর মৃত্যুটা অনেক বেশি সহজ হয়ে যাচ্ছে। তারচেয়ে একটু ধীরে ধীরে মারা যাক একে। রুমে নিয়ে গিয়ে কাঁটা কম্পাসটা তুলে নিলাম জ্যামিতি বক্স থেকে। সেটা দিয়ে খুঁচিয়ে ওর আরেকটা চোখ ও নষ্ট করে দিলাম। এরপর ছাদ থেকে আসার সময় নিয়ে আসা লেবু কাঁটাগুলো ঢুকিয়ে দিলাম ওর শরীরে এখানে-সেখানে। বিড়ালটার মিউমিউ ডাক শুনে আমার ভিতরের পশুটার মায়াতো হলোই না বরং সে আরো হিংস্র হয়ে উঠলো। কিন্তু এক দিনের জন্য যথেষ্ট হয়েছে, তাই এখানেই থামলাম। কিন্তু ছেড়ে দিলাম না। বেঁধে রাখলাম ওকে আমার ঘরেই। সারাদিন খাবার দিলাম না। শেষে বিকেলে সুযোগ বুঝে রেখে এলাম ছাদে লেবুগাছের টবটার পাশে। বিড়ালটা খুবই দুর্বল হয়ে গিয়েছিলো আর এখন পুরোপুরি অন্ধও। তাই মনে হয় চুপচাপ সেভাবেই পড়ে রইলো। সন্ধ্যায় মা কাপড় নিতে গিয়ে ওকে নিয়ে এলো। সেদিন মায়ের চোখে পানি টলমল করতে দেখেছিলাম আমি। কিন্তু সেটা অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেয়ার মতোই আমার মনের আগুনকে আরো জ্বালিয়ে দিলো। এর একদিন পর আবার নিয়ে এলাম বিড়ালটাকে। এর একটা কান আর শরীরের একটা সাইড কেরোসিন ঢেলে ভিজিয়ে নিলাম। এরপর আগুন জ্বালিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ সেভাবে রেখে আগুনটা নিভিয়ে দিলাম। এরপর কিচেনে গিয়ে আগেই চুলায় বসানো দুধের পাতিলটা উল্টে দিলাম আর তার উপর বসিয়ে দিলাম বিড়ালটাকে। ব্যাস! আমার কাজ প্রায় শেষ। এবার কিচেনের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে মা-কে ডাকলাম আর এমন অভিনয় করলাম যেন আমি কিছুই জানি না। গ্যাসে দুধ বসিয়ে দিয়ে গিয়েছিলাম, এসে দেখি এই অবস্থা! সেদিনও সব চুকে বুকে গেল। সেদিন মা ওকে পশু হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ট্রিটমেন্ট করিয়ে আানলো। এর ৩ দিন পর। আজ আসল কাজটা করবো। একটা বালতিতে পানি নিয়ে বিড়ালটাকে নিয়ে এলাম বাবা-মায়ের ঘরের সাথে লাগোয়া ওয়াশরুমে। বাসায় কেউ নেই।

       বাবা অফিসে, মা গেছে ঠাম্মাকে নিয়ে হাসপাতালে। কাল থেকে এটাকে খেতে দেইনি আমি। এমনি আধ মরা হয়ে আছে। মরতে বেশিক্ষণ লাগবে না। এরপর বিড়ালটাকে ছেড়ে দিলাম সেই বালতির পানিতে। ওকে পানিতে হাবুডুবু খেতে দেখে আমার কী যে শান্তি লাগছিলো তখন সেটা বলার মতো না। দেখতে দেখতে কিছুক্ষণের মধ্যেই নিস্তেজ হয়ে উঠলো বিড়ালের দেহটা। এটাকে এভাবে রেখেই আমি চলে গেলাম আমার কাজে। সন্ধ্যায় মা বাড়ি এসে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলো বিড়ালটাকে খেতে দিয়েছি কি না? আমি সহজভাবেই উত্তর দিলাম, “সারাদিন ওকে দেখিনি। হয়তো কোথাও চলে গেছে আবার।” সেদিন রাতে আমাদের বাড়িতে মরা কান্নার রোল উঠলো। বিড়ালটার এই অবস্থা দেখে মা সেদিন খুব কান্না করেছিলো, বাবা নিজেকে সামলে রাখতে পারছিলো না।
      সেদিন কী করে যেন মা-বাবা দু’জনই বুঝেছিলো কাজটা আমার। মা এরপর আমার সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিলো। বাবা শুধু বলেছিলো, “তুমি আমার মেয়ে, ভাবতেই ঘৃণা হয়।” কিন্তু তবুও আমি নির্বিকার ছিলাম। এই ঘটনার ২-৩ মাস পরে এক কার এক্সিডেন্টে আমি আমার বাবা-মা দু’জনকেই হারিয়ে ফেলি। হয়তো এটা দৈব ঘটনা। কিন্তু তবু আজও আমি আমার কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হই নিজের কাছেই।
কী হয়ে গিয়েছিলো আমার, যে আমি এতোটা নিচে নেমে গেলাম!
সেটা আমি নিজেও জানি না!
আলোকিত প্রতিদিন/২১ সেপ্টেম্বর-২০২০/জেডএন

এই পোস্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে শেয়ার করুন

All rights reserved. © Alokitoprotidin
এস কে. কেমিক্যালস এগ্রো লি: এর একটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠান