7:25 pm |আজ বৃহস্পতিবার, ৭ই মাঘ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ২১শে জানুয়ারি ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সংবাদ শিরোনাম:
জীবনবোধের নামতা/ সৈয়দ রনো

জীবনবোধের নামতা/ সৈয়দ রনো

জীবনবোধের নামতা

সৈয়দ রনো

দুর্বিষহ জীবন যন্ত্রণায় যখন ওষ্ঠাগত প্রাণ ঠিক তখন হাতের নাগালের খড় কুটো ধরে বেঁচে থাকার নিরন্তন প্রচেষ্টা চালায় আসিফ। বাবা মায়ের একমাত্র পুত্র সন্তান। মা-বাবার স্নেহের ছায়াতলে তিলে তিলে বেড়ে উঠেছে সে। কিন্তু আজ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত নাকাল অবস্থা। ভাগ্যকেই বা সম্পূর্ণ দোষ দিয়ে কি হবে! বর্তমান শোচনীয় পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক হানা-হানি, কোন্দল কিংবা অসহিষ্ণু‎‎‏‏ পরিবেশ অনেক অংশে দায়ি। গণতান্ত্রীক এই রাষ্ট্রিয় শাসন ব্যবস্থায় ভেতরে ভেতরে স্বৈরতন্ত্রের যে চর্চা, তা আজ নতুন করে বলার কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ জানে নির্বাচনের নামে এ দেশে কী প্রহশন হয়েছে। যা দিন দিন সহনশীলতার মাত্রা অতিক্রম করাতে বিবেকবান মানুষের গায়ে ফুসকা পড়ার উপক্রম। রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থার প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলে একদলের মানুষ অন্য দলকে ঘায়েল করতে সত্যকে মিথ্যা বানায় আর মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে রাষ্ট্রিয়ভাবে নির্যাতনের চিত্র সে এক করুন ইতিহাস। বিশ্বায়নের সভ্যতা যেখানে দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে, মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে রাষ্ট্র বা সরকার যেখানে পৃষ্ঠ-পোষকতা করার কথা কিংবা পৃথিবীর প্রায় দেশেই করছে। সেখানে আমাদের দেশের এই বাস্তব করুণ চিত্র সত্যিই লজ্জাকর। জাতি হিসেবে আমাদেরকে ভাবিয়ে তোলে। এরকম এক বৈরি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সমাজ ব্যবস্থায় আসিফের পরিবার ভুক্তভূগীর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আসিফের পিতা মোখলেছ উদ্দিন একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা। যৌবনের প্রারম্ভে যুদ্ধে গিয়ে স্বাধীনতা ছিনেয়ে এনেছিলেন। এখন স্বাধীনতা শব্দটি এক ধূসর ইতিহাসের পাণ্ডুলিপি হয়ে আছে তার কাছে। পাক হানাদারদের গুলিতে হারিয়ে ছিলেন একটি পা। পচন ধরা পা কেটে ফেলে এখন এক পায়ে ক্রাচ ভর করে হাঁটেন। বেঁচে আছেন শুধু এক বুক ভয়াল যন্ত্রণাকে ঘিরে। একে বেঁচে থাকা বলে না, মৃত্যুর নামান্তর মাত্র। না ভালোভাবে সংসার চালাতে পারেন, না পুত্র আসিফ আর কন্যা আফিফার লেখাপড়ার খরচ দিতে পারেন। অনেক চেষ্টা করেছেন রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। কিন্তু সম্ভব হয়নি। সরকার দলের লেজুড়বৃত্তি না করলে কোনো অবস্থাতেই সরকারি পৃষ্ঠ-পোষকতা পাওয়া যায় না। ভুল ক্রমেই হোক আর শুদ্ধ ক্রমেই হোক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত হতে সংসার পরিচালনার জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকার একটি চেক গ্রহণ করেছিলেন, যা এখন তার জানের কাল হিসেবে প্রতি মুহুর্তে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে একটি ভাতা চালু ছিল, তাও সরকার প্রত্যাহার করে নিয়েছে। রাজনীতির কড়াল গ্রাষে নিষ্পত্তি হয়ে ধণী হচ্ছে আরো ধণী, গরীর হচ্ছে সহায় সম্বলহীন-নিঃস্ব। সেই কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে মোখলেছ সাহেবের পরিবার। সরাকরি দলের লেজুড়বৃত্তি করে মানুষ অবৈধ অর্থে তরতর করে উপরের দিকে উঠে যাওয়ার রেওয়াজ বাঙালীদের অনেক পুরনো ইতিবৃত্ত। এই ভূ-খণ্ডে মানব জাতির বসবাস পৃথিবী সৃষ্টির পাক কাল থেকেই। আদিম হিংস্রতা বর্বরতাকে উপেক্ষা করে মানুষ জীবন ধারণ করেছে। মানুষের বেশ কিছু সহজাত প্রবৃত্তি রয়েছে তার মধ্যে আরাম, আয়েশ, বিলাস, খায়েশ মানুষের গুণকীর্তন শোনা, অপরকে আপন করে নেয়ার বাসনা উচ্চাভিলাষ, নাম, খ্যাতি, যশ কুড়ানো ইত্যাদি ইত্যাদি। মানুষ যেমন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রাণী, তদরূপ অমানবিক হলে কিন্তু ক্রোধের বশে এই মানুষই পৃথিবীর সর্ব নিঃকৃষ্ঠ প্রাণী হয়। মানুষ যেমন পর-উপকারী এই মানুষই আবার পরের অমঙ্গলকারী। জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেক থাকার কারণে কিংবা বুদ্ধিমত্তার পরিচয়ে মানুষ ১৮ হাজার মাখলুকাতের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। মানব সৃষ্ট কম্পিউটার, আবার সেই কম্পিউটার যা অজান্তে প্রয়োজনীয় একটি বস্তুর কার্যক্রমকে নষ্ট করতে মানুষ ভাইরাস সৃষ্টি করেছে। মানুষকে মানুষ সংবর্ধনা দেয় আবার মানুষকে আটকে রাখতে তৈরি হয়েছে জেলখানা। ইহকাল কিংবা পরকালে বিচার হবে মানুষের। অন্য কোনো প্রাণীর বিচার হবে না। কারণ মানুষের রয়েছে মেধা, প্রজ্ঞা, বুুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তাসহ স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি। মানুষ যে কতো ভালো হতে পারে আবার এই মানুষই স্বার্থের কারনে কতো খারাপ হতে পারে, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা প্রয়োজন। আমাদের মূল গল্পের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে রাজনীতি। এখন রাজনীতি প্রসঙ্গে দু’চারটি কথা বলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছি। এশিয়া মহাদেশ কিংবা উপমহাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে কিংবা ধর্ম, বর্ন, বংশ, গোত্র, এলাকা ভেদে একেক দেশের রাজনীতির হালচাল একেক রকম। সামন্ত প্রভুদের হাত হতে রাজনীতি মুক্তি লাভের পর আবহাওয়া, জলবায়ু, কৃষ্টি-কালচার ভেদে একেক দেশের রাজনীতির কালচার একেক রকম। মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো আমাদের রাজনীতিকে উপজীব্য করে ফুটিয়ে তুলতেই এতো আলোচনা, এতো কথার আয়োজন। রাজনৈতিক দলের পালা বদলের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পালা বদল ঘটে আর জীবন যন্ত্রনা বেড়ে যায় আমাদের মতো সাধারণ মানুষের। সরকার আসে আর সরকার যায়। অথচ মানুষের দুর্বিষহ জীবন যন্ত্রণা বেড়ে আকাশচুম্বি হয়। আসিফদের মতো শত-সহস্র পরিবার ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে উপনীত হয়। মোখলেছ উদ্দিন পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা হবার পরেও রাজাকারের খেতাবে ভূষিত হোন। কারণ তিনি সরকারি দলের অন্ধ সাপোর্ট করতে পারেন না কিংবা জানেন না। সাদাকে সাদা বলা আর কালোকে কালো বলা মোখলেস সাহেবের ধমনিতে প্রবাহিত। চাটুকারিতা তার একদম অপছন্দের বিষয়। সংসার চালাতে পারছেন না। না জোটে তার পরিবারে ক্ষুধার অন্ন, না জোটে সঠিক চিকিৎসা। পুরনো ভাঙ্গা একটি ক্রাচে ভর দিয়ে আকাশ পানে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেন মোখলেছ সাহেব। যৌবনের প্রারম্ভে তার দু’চোখে স্বপ্ন ছিল ছেলে-মেয়েকে পড়ালেখা শিখিয়ে এক জনকে ডাক্তার, আরেক জনকে ইঞ্জিনিয়ার বানাবেন। মুক্তিযুদ্ধের ভাতা বন্ধ হবার পর তার স্বপ্ন ক্রমশ ফিকে হয়ে আসে। বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু সান্তনায় বুক বাঁধেন, যখন দেখেন এই দেশের ইঞ্জিনিয়াররা রডের বদলে বাঁশ দিয়ে সরকারিভাবে ভবন নির্মাণ করেন। ওরকম অসৎ ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ঠিকাদার তার ছেলে-মেয়েরা না হোক, সেটাই সৃষ্টি কর্তার নিকট দু’হাত তুলে প্রার্থনা করে সান্তনায় বুক বাঁধেন। এই সমাজ সংসার রাষ্ট্র কার্যত অর্থে তাকে কিছুই দেয়নি বরং কেড়ে নিয়েছে যৌবনের উত্তাল দিন। নতুন বিবাহিত স্ত্রী খাদিজাকে রেখে মুক্তিযুদ্ধে গেলেন। নবজাতক শিশুর নিষ্পাপ চাহনীও সেদিন তাকে আটকাতে পারেনি। দেশের প্রতি গভীর মমতাবোধের ফসল হচ্ছে এই বৃদ্ধ বয়সে দু’বেলা দু’মুঠো পেট পুরে খাওন জোটে না। চোখের সামনে ছেলেটির লেখাপড়ার জন্য হাঁড় ভাঙ্গা পরিশ্রম তার বেদনার ঘায়ে লবনের ছিটার মতো সারাক্ষন জ্বলতে থাকে। ছেলে আসিফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। পড়ালেখার খরচ ম্যানেজ করতে দুই-তিনটি টিউশনি করায়। মেয়েটিরও একই অবস্থা কলেজে পড়ালেখার অবসরে একটি সেলাই মেশিন আছে। যা দিয়ে কন্ট্রাক্টে সেলাই করে, নিজ কাধে করে মাল দিয়ে আসে দর্জির দোকানে। ছেলে-মেয়ের উপার্জনে ওদের পড়ালেখা ভালোভাবে চলতো, কিন্তু তার মধ্যে বাবা-মাকে খাবার আর ওষুধ কিনে দিতে গিয়ে ওরা ভিষণ পেরেশানির মধ্যে দিনাতিপাত করছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের আবিস্কৃত শ্রেষ্ঠ রোগ হয়তো দুশ্চিন্তা। যে রোগের ওষুধ নেই। সেই দুশ্চিন্তা এখন মোখলেছ সাহেবের পরিবারের নিত্য সাথী। রোগে, শোকে, দুশ্চিন্তায় জড়াগ্রস্থ মোখলেছ সাহেব ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। ভর করে হাঁটা ক্রাচটিও সেদিন ভেঙ্গে গেছে। এখন বাঁশের একটি লাঠি কিংবা স্ত্রীর কাধে ভর করে হাঁটা-চলা করেন। মাঝে মধ্যেই গলা দিয়ে রক্ত বেরোয়। শ্বাস কষ্টে প্রাণপাখি উড়ে যাবার উপক্রম। শরীরটা দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তবু বেঁচে আছেন মোখলেছ সাহেব এটাই সত্য, এটাই বাস্তব। হঠাৎ একদিন মোখলেছ সাহেবের পঙ্গু পায়ে ঘা দেখা দেয়। ছেলে আসিফ প্রায় জোর-জবরদস্তি করে ঢাকায় নিয়ে আসে ডাক্তার দেখাতে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ডাক্তাররা তার পায়ের ঘায়ে ক্যান্সার হয়েছে বলে জানান। মরার উপর খাড়ার ঘা। বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করে আসিফ। এরপর টাকা ম্যানেজ করতে ছুটে চলে গলি হতে রাজপথ, আর রাজপথ ধরে প্রাসাদসম অট্টালিকার গা ঘেষে ছুটতে থাকেন এই ব্যস্ততম ঢাকার শহরে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিউশনিতে ভালো ইনকাম নেই বলে মনোস্থির করে- সে রিকশা চালাবে। রাতে রাতে রিকশা চালিয়ে উপার্জিত টাকা দিয়ে কোনোভাবে চলে আসিফের বাবার চিকিৎসা। হঠাৎ একদিন একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে কাধে ব্যাগ নিয়ে ওঠে আসিফের রিকশায়। তারা মিরপুর যাবে বলে ৭০ টাকা ধার্য করে। তখন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। কিছুদূর যাওয়ার পর কল্যানপুর বাসস্ট্যান্ডে পুলিশ রিকশাটিকে আটকে দেয়। ছেলে এবং মেয়ের ব্যাগ তল্লাশ করে পায় গান পাউডার, তাজা বোমা, পিস্তল, গুলি ইত্যাদি। এগুলো দেখে আসিফের চোখ ছানাবড়া! কিংকর্তব্য বিমূঢ় আসিফ। কিন্তু পুলিশ আসিফসহ তিন জনকেই ধরে নিয়ে যায়। আসিফ অনেক ভাবেই বুঝাতে চায় সে রিকশা চালায়, এই ঘটনার সাথে জড়িত নয়। কিন্তু আসিফের পকেটে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র এবং ভাড়া নেয়া রিকশা মালিকের গ্যারেজের বক্তব্যে পুলিশ পুরোপুরি সন্দেহ করে আসিফকে। পুলিশের বক্তব্য হলো- তুমি যদি এদের দলের লোকই না হবে, তাহলে মাত্র তিন চার দিন যাবৎ রিকশা চালাবে কেন! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী রিকশা চালাবে তা অবাস্তব। আসিফ অনেক করে বোঝাতে চায় তার বাবা পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা, হাসপাতালে ভর্তি। কোনো কথায় কর্ণগোচর করেন না পুলিশের বড় বাবু। নিরুপায় আসিফ চিৎকার চেচামি করে ছুটে পালাতে চেষ্টা করলে পুলিশ গুলি চালায়। আসিফের পিঠে গুলি বিদ্ধ হয়। উপুড় হয়ে পরে যায় সে পিচ ঢালা রাজপথে। শুধু আসিফের ক্ষীণ কণ্ঠে উচ্চারিত হয়- বাবা আমি আসছি ওষুধ নিয়ে। ফিন্কী দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। ক্ষণিকেই রাজপথ বয়ে চলে রক্তের নহর। গুলি চালানো সেই পুলিশটি চিৎকার করে বলে- শালা রাজাকারের বাচ্চা জামাত, এবার পরপারে গিয়ে রাজাকারী করগা…..!!!!!!

 

আলোকিত প্রতিদিন/১০ আগস্ট’২০/এসএএইচ

 

 

 

এই পোস্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে শেয়ার করুন

All rights reserved. © Alokitoprotidin
এস কে. কেমিক্যালস এগ্রো লি: এর একটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠান