জমাদিউল আউয়াল ; আরবের শীতকাল

জমাদিউল আউয়াল ; আরবের শীতকাল

{যেসব দিবসের ও যেসব মাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও ফজিলত কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, সেসব দিনে ও মাসে সবাই ইবাদত করবেন এবং করেও থাকেন- এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং যেসব দিন ও মাসের বিশেষ ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য কোরআন ও হাদিসে উল্লেখ করা হয়নি, সেসব দিন ও মাসে বেশি করে নেক আমল করলে আমলকারী অবশ্যই অন্যদের চেয়ে এগিয়ে যাবেন ও অগ্রগামী হবেন।}

আরবি বর্ষপঞ্জি বা হিজরি সনের পঞ্চম মাস হলো ‘জমাদিউল আউয়াল’। এর জোড়া মাস হলো ‘জমাদিউস সানি’; এটি হিজরি আরবি সনের ষষ্ঠ মাস। আরবিতে এই মাস দুটির নাম হলো- প্রথমটি ‘আল জুমাদাল ঊলা’; দ্বিতীয়টি ‘আল জুমাদাল উখরা’ বা ‘আল জুমাদাল আখিরাহ’ অথবা ‘আল জুমাদাস সানিয়াহ’। সহজ করে বললে, প্রথমটি ‘জুমাদাল ঊলা’; দ্বিতীয়টি ‘জুমাদাল উখরা’ বা ‘জুমাদাল আখিরা’ অথবা ‘জুমাদাস সানিয়াহ’। ইমাম ফাররা (রহ.) বলেন, আরবি মাসের নামগুলো পুরুষবাচক, তবে ‘জুমাদা’ এ দুই মাস নয়; কারণ এ দুটি স্ত্রীবাচক।

তিনি আরও বলেন: ‘জুমাদা’ শব্দের পুরুষবাচক প্রয়োগ দেখলে বুঝতে হবে এটি ‘শাহার’ শব্দের প্রতিশব্দরূপে ব্যবহৃত হয়েছে। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে এই মাস দুটি ‘জমাদিউল আউয়াল’ ও ‘জমাদিউস সানি’ নামে সমধিক পরিচিত। এর বাংলা অর্থ হলো, প্রথম জুমাদা ও দ্বিতীয় জুমাদা বা প্রথম শীত ও দ্বিতীয় শীত; অর্থাৎ শীতকালের প্রথম মাস ও শীতকালের দ্বিতীয় মাস। (আল মুনজিদ)।

আরবি বর্ষপঞ্জির বারোটি মাসের মধ্যে ছয়টি মাসের নামের শেষে অতিরিক্ত বিশেষ কোনো বিশেষণ যুক্ত হয়নি। সেই মাসগুলোর প্রথম চারটি হলো: তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ মাস তথা ‘রবিউল আউয়াল’, ‘রবিউস সানি’, ‘জমাদিউল আউয়াল’ ও ‘জমাদিউস সানি’। অন্য দুই মাস হলো হিজরি সনের একাদশ ও দ্বাদশ মাস তথা ‘জিলকদ’ ও ‘জিলহজ’। বছরের অন্য ছয়টি মাসের নামের শেষে বিশেষ কোনো না কোনো বিশেষণ যুক্ত রয়েছে। এ মাসগুলো হলো প্রথম ও দ্বিতীয় মাস; সপ্তম, অষ্টম এবং নবম ও দশম মাস। যথা আল মুহাররামুল হারাম (নিষিদ্ধ মহরম মাস), আস সফরুল মুসাফফার (বর্ণিল সফর মাস); আর রজবুল মুরাজ্জাব (মহিমান্বিত রজব মাস), আশ শাবান নুল মুআজ্জম (মহান শাবান মাস), আর রমজানুল মোবারক (বরকতময় রমজান মাস), আশ শাউওয়ালুল মুকাররাম (সম্মানিত শাওয়াল মাস)। লক্ষণীয় যে বর্ষের প্রথমার্ধের শেষ চার মাসে ও দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দুই মাসে এবং প্রথমার্ধের প্রথম দুই মাস ও দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম চার মাসে একই বিষয় সংঘটিত হলো। (নিকাতে উছমানী)।

‘জুমাদা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো স্থির, অবিচল, দৃঢ়, কঠিন; জমাটবদ্ধ, নিস্তব্ধ, নীরব, নিথর, শুষ্ক, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, বিশ্বস্ত; শীতল, শীতকাল, শীতবস্ত্র; কার্পণ্য, বদ্ধমুষ্টি; কিংকর্তব্যবিমূঢ়, অস্থির সময়, চিন্তাযুক্ত অবস্থা। যেহেতু আরব দেশে শীতকালে প্রচণ্ড শীতে তরল পানি জমে কঠিন বরফে পরিণত হতো; জড় পদার্থগুলো জমে শক্ত হয়ে যেত; উদ্ভিদ ও জীব নিথর হয়ে থাকত; প্রাণীরা নীরব হয়ে যেত; তাই এই মাসের এ নামকরণ করা হয়েছে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, ‘জুমাদা’ হলো আরবদের শীতকাল। এটি বসন্তের নিকটবর্তী; গ্রীষ্মের পূর্বে। কারণ দুই ভূমির সীমানা বা দুই বাড়ির সীমানাকে এবং নিকট প্রতিবেশীকেও ‘জুমাদা’ বলা হয়। একত্রে এ দুই মাসকে ‘জুমাদায়ান’ বা ‘জুমাদায়িন’ বলা হয়।

মূলত এই মাসের নামের মাঝে যেসব অর্থ বিদ্যমান, তা তিন ভাগে বিভাজনযোগ্য। যথা ইতিবাচক অর্থ, নেতিবাচক অর্থ ও মধ্যবর্তী বা ক্রান্তিকালীন অর্থ। সুতরাং আমাদের করণীয় হবে ইতিবাচক অর্থে উদ্বুদ্ধ হয়ে আরও বেশি বেশি নেক কাজ বা সৎকর্ম সম্পাদনে ব্রতী হওয়া। নেতিবাচক অর্থগুলো অনুধাবন করে নিজের মধ্যে থাকা সব নেতিবাচক অভ্যাস ও বৈশিষ্ট্য পরিত্যাগ করে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের প্রতি মনোনিবেশ করা। ক্রান্তিকাল বা অন্তর্র্বতীকালীন বিবেচনা করে সদা সতর্ক ও সজাগ থাকা এবং ইতিবাচক পরিবর্তন ও সাফল্য লাভের জন্য সব সময় সক্রিয় থাকা।

এ মাসের আমল হলো নফল নামাজ, নফল রোজা, দান-খয়রাত ইত্যাদি। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পাশাপাশি পাঁচ ওয়াক্ত নফল নামাজ, তথা তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত, জাওয়াল ও আউয়াবিন নামাজ আদায় করা। কাজা রোজা থাকলে পুরা করা; মান্নত রোজা থাকলে তা আদায় করা। মাসের ১ তারিখ, ১০ তারিখ, ২৯ ও ৩০ তারিখে রোজা রাখা এবং চাঁদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে ‘আইয়ামে বিজ’ বা শুভ্র সময়ের বাবা হজরত আদম (আ.)-এর সুন্নত রোজা করা। সপ্তাহে প্রতি সোমবার, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার নফল রোজা রাখা। বিশেষত ‘জমাদিউস সানি’ তথা ‘দ্বিতীয় জুমাদা’ মাসে ‘রজব’ মাসের প্রস্তুতি হিসেবে আরও বেশি নেক আমল এবং অধিক পরিমাণে নফল নামাজ ও নফল রোজা করার কথা রয়েছে।

এ মাসের ফজিলত সম্পর্কে বিভিন্ন কিতাবে নানা বিষয় বর্ণিত আছে। আসল কথা হলো, ‘হার কে কদরে শব দারাদ; হামা শব শবে কদর আস্ত’ অর্থাৎ ‘যেজন রাতের মূল্য দেন; প্রতি রাতকেই তিনি শবে কদর হিসেবে পান।’ মানে হলো, নেক আমল ও সৎকর্ম দ্বারা সাধারণ সময়ও অসাধারণ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে। আমরা জানি, নতুন বছরে নির্ধারিত দোয়া পড়া হয় এবং নতুন মাসে নির্দিষ্ট দোয়া পড়া হয়। আসলে জীবনের প্রতিটি দিনই নতুন দিন, প্রতিটি সময়ই নতুন; তাই এই দোয়াগুলোর গুরুত্বও সদা বিদ্যমান। যথা ‘ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুবি ওয়াল আবছার, ইয়া মুদাব্বিরাল্লাইলি ওয়ান্নাহার; ইয়া মুহাওয়িলাল হাওলি ওয়াল আহওয়াল, হাওয়িল হালানা ইলা আহ্ছানিল হাল।’ অর্থ, ‘হে অন্তরসমূহ ও দৃষ্টিসমূহ পরিবর্তনকারী! হে রাত ও দিনের আবর্তনকারী! হে সময় ও অবস্থা বিবর্তনকারী! আমাদের অবস্থা ভালোর দিকে উন্নীত করুন।’ (দিওয়ানে আলি, আন নাহজুল বালাগা)। ‘আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ইমান, ওয়াছ ছালামাতি ওয়াল ইসলাম; রাব্বি ওয়া রাব্বুকাল্লাহ; হিলালু রুশদিন ওয়া খায়র।’ অর্থ, ‘হে আল্লাহ! এই মাসকে আমাদের জন্য নিরাপত্তা, ইমান, প্রশান্তি ও ইসলামসহযোগে আনয়ন করুন; আমার ও তোমার প্রভু আল্লাহ। এই মাস সুপথ ও কল্যাণের।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৫১, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৪০০, রিয়াদুস সালেহীন: ১২৩৬)।

জিকির-আজকার, দোয়া-কালাম, দরুদ ও সালাম, তাসবিহ-তাহলিল, তাওবা-ইস্তিগফার, খতম তিলাওয়াত, সদকা-খয়রাত ইত্যাদি আমলের মাধ্যমে মাস অতিবাহিত করলে নিশ্চিত এর বরকত, ফজিলত ও কল্যাণ লাভ হবে। অন্যথায় সময়ের অপচয়ের জন্য অনুতাপ ও অনুশোচনা করতে হবে। হাদিস শরিফে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, পরকালে নেককার মুমিন জান্নাতিগণের কোনো আফসোস থাকবে না; বরং তাদের আফসোস থাকবে শুধু ওই সময়ের জন্য, যে সময়গুলো তারা নেক আমল ছাড়া অতিবাহিত করেছে বা বেহুদা কাটিয়েছে। (তিরমিজি)।

উল্লেখ্য, যেসব দিবসের ও যেসব মাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও ফজিলত কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, সেসব দিনে ও মাসে সবাই ইবাদত করবেন এবং করেও থাকেন- এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং যেসব দিন ও মাসের বিশেষ ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য কোরআন ও হাদিসে উল্লেখ করা হয়নি, সেসব দিন ও মাসে বেশি করে নেক আমল করলে আমলকারী অবশ্যই অন্যদের চেয়ে এগিয়ে যাবেন ও অগ্রগামী হবেন। ইনশা আল্লাহ।

 

 

আলোকিত প্রতিদিন/০৮ ডিসেম্বর/চৌ.সা.আ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন