প্রকৃত শিক্ষা ও মানবিকতাবোধের অভাব

নিজেকে মানুষ দাবি করার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। এ লজ্জা কোনো ব্যক্তি বিশেষের নয়। সমগ্র জাতির, সমগ্র দেশের। মানুষকে মানুষ ভাবার মানসিকতা লোপ পাচ্ছে আমাদের ভেতর। গৃহকর্মীদের  ‍উপর  এমন অমানবিক নিযার্তন দেখে মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে গৃহকর্মীরা কি ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা ?

সম্প্রতি আমাদের দেশে যে সমস্যাগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তার মধ্যে গৃহকর্মী নারী বা শিশু নিযার্তন অন্যতম। বিষয়টি যে কোনো সচেতন ব্যক্তিরই নজর কাড়বে। আধুনিক পৃথিবীতে এমন নির্যাতন কর্মকান্ড রীতিমতো ভাবিয়ে তুলছে আমাদের।
গা শিউরে উঠছে যখন তখন। কোথায় আছি আমরা ? এ লজ্জা কোনো ব্যক্তি বিশেষের নয়। সমগ্র জাতির, সমগ্র দেশের। মানুষকে মানুষ ভাবার মানসিকতা লোপ পাচ্ছে আমাদের ভেতর।

গৃহকর্মীদের নিয়ে কর্মরত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিস বিলসের পরিসংখ্যা মতে, ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পযর্ন্ত সারাদেশে কর্মস্থলে শারীরিক নিযার্তনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৫৪১ গৃহকর্মী। হাসপাতালে যেতে হয়েছে ৪১৩ জনকে। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ১৮৭ জন। আর ১৪ মাসে নির্যাতিত  ১৫৬ জনের ৯০ ভাগই কিশোরী ও শিশু। দিন দিন নিযার্তনের মাত্রা আর নির্যাতিত দের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। চলতি বছরে তা যেন অতীতের সব রেকডের্ক ছাপিয়ে গেছে।

২০১০ সালে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের করা জরিপের তথ্যানুযায়ী, ওই সময় শুধু রাজধানীতেই গৃহকর্মীর সংখ্যা ছিল ২০ লাখ। এরপর কোনো পরিসংখ্যান করা না হলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বর্তমানে সারা দেশে অন্তত ৪০ লাখ দরিদ্র মানুষ গৃহকর্মী হিসেবে কমর্রত। উদ্বেগজনক হলেও সত্যি, তাদের মধ্যে অন্তত ৫ লাখ শিশুও রয়েছে। যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গৃহকমীর্র কাজে নিয়োজিত।

দিন দিন শিক্ষিত লোকের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু কমে যাচ্ছে শিক্ষার মান । শিক্ষিত আর সুশিক্ষিত শব্দ দুটির পাথর্ক্য অনুধাবন করতে পারছে না বেশিরভাগ মানুষ। মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত হচ্ছে না। গৃহকর্মীদের মানুষের চোখে না দেখে মূলত পশুর চোখে দেখা হচ্ছে। নানান অজুহাতে তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নিযার্তন করা হচ্ছে। এসব নিযার্তনের বেশিরভাগই রয়ে যায় অগোচরে।

মাঝে মাঝে থলের বিড়াল বেরিয়ে এলে প্রশাসন কিছুটা নড়েচড়ে বসে। যদিও নিযাির্ততদের সবাই সঠিক বিচার পায় না। আজকাল গৃহকর্তা ও গৃহকর্তী তাদের নিজেদের সন্তানকে শৈশব থেকে এমনভাবে বেড়ে তোলেন, তাতে তারা দরিদ্র মানুষগুলোকে অনেকটা ঘৃণার চোখে দেখে। মানুষ হিসেবে মর্যাদাটুকুও দিতে চায় না।

আমরা বরাবরই ভুল পথে হেঁটেছি। এখনো হাঁটছি। আমাদের অধঃপতনগুলো এসব কারণেই ঘটে চলেছে । শিক্ষা মানে শুধু একটা সার্টিফিকেট অজর্ন নয় । নিজেকে আর্দশ্য ‍ও প্রকৃত মানুষ করে গড়ে তোলা। পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে এক দৃষ্টিতে দেখার মানসিকতা গড়ে তোলা। সমাজের দরিদ্র, অসহায় মানুষগুলোকে বুকে টেনে নেয়ার মনোবৃত্তি তৈরি করা। অথচ সমাজের বাস্তব চিত্র সর্ম্পূণ উল্টো । এই উল্টো পথ থেকে আমাদের দ্রুত সরে আসতে হবে। নইলে ধ্বংস অনিবার্য। সেই ধ্বংসলীলার কবল থেকে আমরা কেউ-ই রেহাই পাব না।

মূলত গৃহকর্মীরা আমার আপনার মতোই স্বাভাবিক রক্ত মাংসের মানুষ। নেহাৎ পেটের দায়ে তারা অন্যের বাড়িতে ফাইফরমাশ ঘাটে। তারাও হতে পারতো আমাদের মা, বোন, সন্তান। ভাগ্যের অসহায়ত্ব আজ তাদের এমন পরিস্থিতির শিকার করেছে। একবার নিজেকে তাদের জায়গায় দাঁড় করিয়ে যদি ভেবে দেখি আমরা তাহলে সমস্যা অনেকাংশই লাঘব হবে।

দেশে অমানবিক কাজের সংখ্যা কমে যাবে। সুশিক্ষিত লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। নির্যাতন শব্দটি লজ্জায় নিজেই মুখ লুকাবে। সুন্দর একটি আগামীর মুখ দেখবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ থাকবে না। বিশ্বের বুকে আমরা মাথা তুলে দাঁড়াব একদিন।

আলোকিত প্রতিদিন/০১ আগস্ট/আরএ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন