মুগ্ধরূপের নীরব বিদ্রোহী শামসুর রাহমান | আলোকিত প্রতিদিন

মুগ্ধরূপের নীরব বিদ্রোহী শামসুর রাহমান

Spread the love

সৌমিত্র শেখর: মুগ্ধরূপের নীরব বিদ্রোহী শামসুর রাহমান। সাধারণ্যে তিনি কবি হিসেবেই সমধিক পরিচিত বটে। কিন্তু শুধু কবিতায় বিচরণ ছিল না তার। তার চরণ পড়েছে কথাসাহিত্যাঙ্গনের বিস্তর করিডরেও। আর সাংবাদিকতা তো ছিল তার পেশাই। ঊষর সময়ের ঠাণ্ডা মেজাজের ধীমান হলেন শামসুর রাহমান। সময়টা বিগত শতকের ছয়ের দশকের সূচনা থেকে একেবারে এ শতকের প্রথম দশক অবধি! স্পষ্ট করে বলা যাক: ১৯৬০ সালে শামসুর রাহমান এলেন বাংলা কাব্যাঙ্গনে তার ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে এবং সময়টি ছিল আইয়ুবীয় সামরিক শাসনকাল।

ভারতবর্ষে এর আগে সামরিক শাসন কী, কেউ-ই জানত না। নবগঠিত পাকিস্তানে সেই যে শুরু হলো, এরপর নানা মাত্রা ও পর্যায়ে গণতন্ত্রবিরোধী সামরিক শাসন চলেছে। এমনকি স্বাধীনতার পর বাংলাদেশেও সামরিক শাসন এসেছে বারবার। তাঁর মৃত্যু বছরের (২০০৬) আগে-পরেও বাংলাদেশে ঘনীভ‚ত হয়েছিল নানামাত্রার সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট। এই দীর্ঘ ঊষর সময়েই কেটেছে শামসুর রাহমানের কর্মময় জীবন- খানিকটা উজান বেয়ে চলার মতো। অথচ তিনি দেখা দিয়েছিলেন তমসাঘেরা দিগন্তে বালার্কের মতো। স্বসমাজের জন্য, স্বদেশের জন্য ছিল তাঁর সার্বিক প্রস্তুতি। হুমায়ুন আজাদ শামসুর রাহমানকে নিয়ে একটি নাড়া দেওয়ার মতো মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেছেন, ‘১৯৬০ বাঙালি মুসলমানের আধুনিক হয়ে ওঠার বছর; তাঁদের কবিতার আধুনিকতা আয়ত্তের বছর।’ হুমায়ুন আজাদ এই মন্তব্যটি করেছিলেন শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের বছরকে ঘিরেই। এই বক্তব্যটি যদি আর একটু প্রলম্বিত করি, তবে বলতে হবে: কবিতার ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানের পশ্চাৎপদতার শিকলটি মুক্ত করেছিলেন শামসুর রাহমান নামের এই স্নিগ্ধ মানুষটি।

বাংলা কবিতাঙ্গনে কাজী নজরুল ইসলাম নিশ্চয়ই অনেক বেশি বিদ্রোহাত্মক- প্রকাশ ও প্রকরণে। কিন্তু বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে শামসুর রাহমান সর্বার্থেই রবীন্দ্রবলয়মুক্ত স্বচ্ছন্দবিহারী আধুনিক কবিপ্রাণদের অগ্রণী, যিনি রবীন্দ্রবলয়ে আবার ফিরে আসেননি, তৈরি করেছেন নিজের চলার কক্ষপথ। বিরূপ অতিক্রম করেই তিনি আধুনিকতার পথ পরিভ্রমণ করেছেন। এই ভ্রমণে তিনি পেয়েছিলেন অনেককে কিন্তু তাঁদের বহুজন আবার আবর্তনের শিকারে পরিণত হয়ে ফিরে যান পূর্বস্থানে। শামসুর রাহমানের জীবনে আবর্তন নেই, বিবর্তন আছে। আর এই বিবর্তনের পথেই তিনি এগিয়েছে এবং পথ দেখিয়েছেন পরবর্তী প্রজন্মকে। তবে নিভৃতচারী কবি হিসেবে নিজেকে  গণ্ডিভূত রাখেননি শামসুর রাহমান এখানেই অন্যান্যের থেকে তিনি অনন্য।

আমি তাকে ‘মুগ্ধরূপের নীরব বিদ্রোহী’ বলেছি এ কারণেই। শামসুর রাহমানের এই নীরব বিদ্রোহটি কেমন? একদা প্রভাববিস্তারী কোনো কবি, যিনি শস্যের সপক্ষ ত্যাগ করে বখতিয়ারের ঘোড়ায় চেপে অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না ভোজন করে রীতিমতো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর সভা বা ইসলামি ছাত্রশিবিরের সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে আবির্ভূত হন কিংবা আধুনিকতার নান্দীপাঠকারী কোনো কবি, দেশত্যাগ করে পরবাসী হয়ে সাহিত্য থেকে নেন প্রায় স্বেচ্ছাবসর তখন স্বদেশের বিরূপ অবস্থা তিনি উল্লেখ করেন ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ এমন কাব্যনামের মধ্যে।

১৯৮২ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি কি সে সময়ের এরশাদীয় সামরিক আইন বা সেই সামরিক শাসনপূর্ব মেকি গণতান্ত্রিক শাসন নিয়েই ব্যঙ্গ নয়? অথবা ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত তার কাব্যগ্রন্থ ‘নরকের ছায়া’ নামে কী জানান দেয়? এটাই নীরব বিদ্রোহ। শামসুর রাহমান রাজনীতিবিদদের মতো বা রাজনীতির কবিদের মতো প্রত্যক্ষ বিদ্রোহের ডাক দেননি কিংবা সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো উচ্চ স্বরে ঘোষণা করেননি শোষকের পরাজয়ের নিমিত্তে কোনো বার্তা। তিনি তার লেখার মাধ্যমে জানাতে ও জাগাতে চেয়েছেন পাঠককে। আর তাই ‘মেষতন্ত্র’র মতো কবিতা লিখে মেরুদণ্ডহীন মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে তিনি বলেছেন, এভাবে বেচেবর্তে থাকা আসলে ‘বাঁচা’ নয়! ডানে বললে ডানে, বামে বললে বামে যারা মুহূর্তে ঘুরে যেত এবং এভাবেই ঠিক মোক্ষধামে পৌঁছার ইঁদুরদৌড়ে যারা ছিল, শামসুর রাহমানের এমন কবিতা তাদের জন্য রীতিমতো লাঠ্যা-ঔষধির কাজ দিয়েছে। এমন অদৃশ্য আঘাত দিয়ে দুর্বলদের প্রতিবাদী করার ব্যাপারটি শামসুর রাহমানের মধ্যে ছিল।

সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’ এই একটিমাত্র বাক্যের জন্য অমর হয়ে থাকবেন। অমরত্বের জন্য খুব বেশি লিখতে হয় না; আবার অনেক লিখলেই অমর হওয়া যায় না। অমর রচনার স্রষ্টাকেই মহাকাল শুধু মনে রাখে। সেদিক থেকে শামসুর রাহমান ‘আসাদের শার্ট’, ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’, ‘রূপালি স্নান’ ইত্যাদির মতো অমর কবিতা রচনা করার পরই গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসাতে পারতেন এবং পরমানন্দে আহার-বিহার করে বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়াও অসম্ভব ছিল না তাঁর জন্য। তাঁর বন্ধুরা সে পথে অনেকেই গিয়েও ছিলেন।

শামসুর রাহমান এ পথের পথিক ছিলেন না। তিনি সামরিক স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকার উচ্চ বেতনের চাকরি ত্যাগ করেছেন, সরকারি আহ্বান ‘এশীয় কবিতা উৎসব’-এ যুক্ত হননি, রাজপথে থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’ গঠনের শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন শামসুর রাহমান। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নুর হোসেন যখন তাঁর বুকে-পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’ শ্লোগান লিখে মিছিলে নামে এবং পুলিশের লক্ষ্যভেদী বুলেটে নিহত হয়, তখন শামসুর রাহমান লেখেন: ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’। আর এভাবেই এক নুর হোসেন দ্রুত  হয়ে ওঠেন সারা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রতীক।

মুক্তিযুদ্ধের ঘাতক গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিল ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন এবং প্রায় প্রতিটি বড় ধরনের প্রতিবাদ সমাবেশে তিনি উপস্থিত ছিলেন। এরশাদের পতনের পর দেশে ধর্মীয় চরমবাদীরা যখন অঙ্কুরোদগম আরম্ভ করে, তখনো উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সচেতন কিন্তু অত্যন্ত নরমভাবে তিনি লিখে গেছেন। ধর্মবর্ণজাতপাত-নির্বিশেষে মানুষই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য, আর কিছু নয়। আর এ কারণে উগ্রবাদীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন তিনি।

১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে শামসুর রাহমানের ওপর নেমে আসে ইসলামি উগ্রবাদীদের অতর্কিত আক্রমণ। তবে তার জীবন রক্ষা পায়। এর পরও শামসুর রাহমান সত্য প্রকাশে পিছপা হননি, তিনি ভয় পেয়ে লেখনী গুটিয়ে রাখেননি। লিখে গেছেন আগের মতোই, লিখে গেছেন মুক্তিযুদ্ধ-গণতন্ত্র-সমবাদ-মানবতন্ত্র এই চেতনাধারী হয়ে। শামসুর রাহমান যে সময় লেখার জগতে সক্রিয় ছিলেন, অর্থাৎ ১৯৬০ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত দুর্ভাগ্যক্রমে এই সময়ের বেশির ভাগটাই দেশে এবং বহির্বিশ্বে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করেছে। এরইমধ্যে তিনি লিখে গেছেন। তার একদিকে দৃষ্টি ছিল শিল্পের প্রাণপ্রতিমা অক্ষত রাখা, অন্যদিকে সময়ের উত্তপ্ত বারুদ বক্ষে ধারণ করা। শামসুর রাহমান জীবনের শেষ দিন অবধি এভাবে শিল্পের প্রতিমা সমকালের উত্তপ্ত বারুদে রেখেই সমাজে মনুষ্যত্ব-জাগরণের ধ্যান করেছেন। এই নীরব বিদ্রোহীর কাছে এও ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ! তার তিরোধানের এক যুগ অতিক্রান্তির পর এ কথাই বোধ করি বলা চলে যে শামসুর রাহমান এই চ্যালেঞ্জে বিজয়ী, ধ্যানে সফল।

লেখক: নজরুল অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আলোকিত প্রতিদিন/২৪ অক্টোবর/আরএ

এই সংবাদ ২৯৪ বার পঠিত।
ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন