উড়াল কাব্য থেকে লোক লোকান্তরে কবি আল মাহমুদ : বকুল আশরাফ – আলোকিত প্রতিদিন

উড়াল কাব্য থেকে লোক লোকান্তরে কবি আল মাহমুদ : বকুল আশরাফ

‘উড়াল কাব্যে’র মতো উড়তে উড়তেই পৃথিবীতে এসেছিলেন এক কবি। বাংলাভাষার অন্যতম কবি আল মাহমুদ। গন্ধ বিলিয়ে দিয়েছেন বাংলা কাব্যে। তৈরি করেছেন নিজস্ব কাব্য ভূগোল। কবির শব্দস্পর্শে সৃষ্টি হয়েছে মায়ার পাহাড়। আর কবি দাঁড়িয়ে আছেন সেই পাহাড়ের চূড়ায়। পাহাড়ের চূড়ায় ওঠতে কবিকে পাড় হয়ে আসতে হয়েছে রাজনৈতিক পটভূমির বিস্তৃত উঠান। জন্মেই দেখেছেন বৃটিশ রাজ, দেশভাগ (১৯৩৬-১৯৪৭)। বাংলা ভাষার বড়াই নিয়ে পাড় করতে হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানি জল্লাদি আমল। যুদ্ধ করতে হয়েছে, অনিশ্চয়তার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে (১৯৪৭-১৯৭১)। লিখতে হয়েছে ‘আমার মায়ের নোলক ছাড়া ঘরকে যাবো না’। ঊনসত্তরে মতিউরকে ডাকতে হয়েছে, আসাদের মিছিল নিয়ে আসার অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। আগুন জ্বালার ডাক দিতে হয়েছে, গণমানুষের কথা ভাবতে হয়েছে। ‘ফেব্রয়ারির একুশ তারিখ/ দুপুর বেলার অক্ত/ বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?/ বরকতের রক্ত।…./ প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী? আমায় নেবে সঙ্গে/ বাংলা আমার বচন, আমি/ জন্মেছি এই বঙ্গে। [একুশের কবিতা, পাখির কাছে ফুলের কাছে]’। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তি যুদ্ধের চেতনায় সিদ্ধ কবি সব চিন্তা চেতনার উর্ধে উঠেগেছেন তাঁর ছড়া কবিতা দিয়ে। প্রভাতফেরী যে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এক রীতি ছিল তা এপ্রজন্ম খুঁজে পাবে কবির ছড়ায়। এখন চলছে শহীদবেদি দখলের মৌসুম। কবি তারপর দেখছেন স্বাধীনতা উত্তর সময় (১৯৭১- ২০১৯) দীর্ঘ আটচল্লিশ বছর। কত চড়াইউৎরাই। দেখেছেন স্বাধীনতা এই তিন স্বাদের রাজনৈতিক চেতনা ও চড়াই উৎরাইয়ে কবি অবিচল ছিলেন তাঁর কাব্যে এবং মৌমাছিদের মতো নিষ্ঠা ও প্রতিভা দিয়ে বুনে গেছেন সরস কাব্য-গাঁথা, যা বাংলা ভাষার শিকেতে তোলা থাকবে মহাকালের গহ্বরে।

‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ দিক্ষা নিয়ে নিজের রাজ্য গড়তে চেয়েছিলেন পরিতৃপ্ত আবেগে। দুঃখের সা¤্রাজ্যকে ধূলিস্যাৎ করে নৈসর্গময়, প্রাণময় জীবধারণের পথ খুঁজতে গিয়েছিলেন। খুঁজেছেন বুনো হাঁসের গন্ধ, কি বসন্তে কি বোশেখে। অভিশাপ দিয়েছেন যারা মানুষ ঠকিয়ে বাহাদুরীর দালান গড়েছেন, যারা মানুষে-মানুষে-কবিতে বিভেদ সৃষ্টিতে সচেষ্ট থেকেছেন, সে সব পরগাছাদের গুঁড়িয়ে ফেলতে চেয়েছেন, চেয়েছেন অহমিকার অট্টালিকে গুঁড়িয়ে দিতে মহাপ্রতাপশালী তুফানে। ‘ধ্বংস যদি করবে তবে শোন তুফান/ ধ্বংস কর বিভেদকারী পরগাছাদের/ পরের শ্রমে গড়ছে যারা মস্ত দালান/ বাড়তি তাদের বাহাদুরী গুঁড়িয়ে ফেল। [বোশেখ, পাখির কাছে ফুলের কাছে]’। এভাবে কবি শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে পাখির কাছে ফুলের কাছে মনের আঁকুতি তুলে ধরেছেন, বলেছেন অত্যাচারিতদের কথা, শোষিতের কথা, শোষণের বিরাদ্ধাচারণ করেছেন। পথে যেতে যেতে দেখেছেন তার চিরচেনা, শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতি বিজরিত তিতাসের বেহাল হাল। যে নদীর জলের প্রহারে সারাদিন তীর ভেঙেছে, ঘোলা স্রোতটানে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অসংখ্য নৌকা; গতির প্রবাহে, সে নদীর অবহেলা দেখে কেঁদে ওঠেছে কবির মন। স্বাধীনতা উত্তর যে পরিবর্তনের ধারা সেখানে নদীরা কেন যেন অবহেলায়, অপরিচর্যায় হারিয়ে যেতে বসেছে। দেখতে হয়েছে তার প্রিয় নদীর উপর ড্রেজারের ছোঁবল। কবি তাই যন্ত্রণা কাতরায়ে উচ্চারণ করেছেন- ‘শুকনো নদীর তলপেটে ঐ / ড্রেজার যখন হাতরায়,/ ধানের ক্ষেতে পাওয়ার টিলার/ ক্লান্ত হয়ে কাৎরায়-[মনপবনের নাও, পাখির ৬কাছে ফুলের কাছে]’।
নদী ও প্রকৃতির সাথে দেখেছেন মানুষের পতন, এ যেন নিজেরই পতন অবলোকন করা, এ লজ্জা যেন নিজেদেও গড়া, অস্তের মহিমা যেন চারপাশ ঘিরে ধরেছে, একটু প্রশান্তির জন্য কবি ভাব করেছেন ‘দোয়েল ও দয়িতা’র সাথে। কেমন যেন বদলে যায় মানুষেরা, যেন এক কালো গহ্বরের মুখ, অস্তাচলে কাত হয়ে আছে মানুষের উদগ্র আশার ভাষা। ক্ষুধার্ত কাকের ঝাক রৌদ্রদগ্ধ শালবন জুরে, হারিয়ে যাচ্ছে যেন পিপাসার জল। শুকিয়ে উন্মত্ত পদ্মা অজগরী মন্ত্রবলে হয়ে গেছে দড়িরআকৃতি। কবির কলম সেখানে থেমে থাকেনি, প্রতিবাদী উচ্চারণে গেয়ে ওঠেছেন- ‘মা-গঙ্গার শাড়ি খুলে ফারাক্কায় গঙ্গা পুজারীরা/ বেঁধেছে প্রবাহমান সঞ্জীবনী নদীর উজান,/…./পুরাণের ঐরাবত বেঁধে রেখে জীবনের প্রাণপূর্ণ ধারা/ শুয়ে আছে গতিপথে অহঙ্কাওে উচ্চে তুলে শুঁড়,/ কোথা সেই জহ্নুমুনি ছিঁড়ে ফেলে অন্যায় পাহারা/ ফেরাও তোমার কন্যা জাহ্নবীর তরঙ্গ নূপুর।[খরা সনেটগুচ্ছ, দোয়েল ও দয়িতা]’।

কবিদের দূরদৃষ্টি থাকে কবিরা আগাম টের পান, ভবিতব্যের আনেক ঘটনাকাল কবিরা অর্ন্তযামীর মতো সনাক্ত করেন। কবিরও স্বগোতোক্তি ‘আমি, দূরগামী’ বলেছেন, ‘আমি সাক্ষ দিচ্ছি, আমি কৌতুহলহীন পরম দ্রষ্টাদের একজন। আমি কবি। কিন্তু কেবল সুন্দরের উপাসনায় কাটেনি আমার কাল।/ কুশ্রীতা, রক্তপাত মহামারী, ক্ষুধা ও জাতিহত্যার পাণ্ডুলিপি/ আমি আজকের অস্তগমনের সাথে দরিয়ায় ডুবিয়ে দিতে/ উপকূলের সবচেয়ে ঊঁচু পাথরে দণ্ডায়মান। [শতাব্দীর সাক্ষী:১৪০০ বাংলা]। কবিদের মৃত্যুচিন্তা থাকে কবি আল মাহমুদেরও ছিল। তিনি ঈদের আনন্দের মতো মৃত্যু চেয়েছলেন এবং তা যেন হয় শুক্রবারে রাত্রিশেষে। প্রকৃতির কাছে এটাই ছিল কবির প্রার্থনা। প্রকৃতি তাঁর ডাক শুনেছে ভাষার মাসে ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখ রাতে শুক্রবারে দিনশেষে বিদায় নিলেন কবি। তাই বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের শোকের ভাষায় গ্রথিত হয়ে থাকলেন কবি আল মাহমুদ। বাংলা হারালো তার গ্রাম্যস্বভাবতুল্য সন্তানকে। কাবিনবিহীন হাতে কবি যেন তার প্রেয়সিকে (মৃত্যুকে) আলিঙ্গন করলেন। কেননা কবি মৃত্যুকে জানতে চেয়েছিলেন, বলেছিলেন, মৃত্যু বলো কি তোমার স্বাদ! তুমি, চৈতন্যের কোর স্তরে থাকো। এভাবেই কবি জেনে গিয়েছিলেন যে কোন এক শুক্রবাওে তিনি মৃত্যুর আস্বাদ গ্রহণ করবেন। ‘কোন এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে/ মৃত্যুও ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাগিদ;/ অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে/ ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।/.. ..আমার যাওয়ার কালে খোলা থাক জানালা দুয়ার/ যদি হয় ভোরবেলা স্বপ্নচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার। [স্মৃতির মেঘলাভোর, আমি, দূরগামী]’।

দ্বিধাহীন ছিলেন কবি, পেছনে ফেলে এসেছেন উপত্যকা, পরিত্যক্ত প্রেমের আঙ্গিনায় পা রেখেছেন, পরিত্যাগ করেছে সন্তানদের কোলাহল, চলে এসেছেন এমন পারিপার্শ্বিক অবস্থানে যেখানে কেউ অপত্য স্নেহের উত্তাপে আর রাত্রি যাপন করে না। এসব পাওয়া যাবে কবির ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’-এ। কবি বলেছেন, ‘আজ ভাবি ছেলাটার কি তবে আগাম মৃত্যুর গন্ধ টের পাওয়ার কোন অস্বভাবিক ইন্দ্রিয় ছিলো ? যার দুর্গন্ধে শত তিরষ্কার উপেক্ষা করে সে চিৎকার করে উঠতো বাঘ বাঘ বলে, ঠিক কবির মতো?’ এখানেও কবি অকপটে স্বীকার করছেন যে কবিরা আগাম টের পায়। বিস্ময়ের স্ফুলিঙ্গে গ্রামভাবনাকে পরিহার করেননি কবি। তবে জেল থেকে এমন কি খুঁজে পেয়েছেন বই পড়ে ! আস্তিত্ব? প্রহসন? নাকি প্রবিত্র কোরআন পাঠে তাঁর মনোজগতে নব চেতনার উন্মেষ ঘটেছে? কে জানে, কবি দেখা পেয়েছেন এক চক্ষু বিশিষ্ট হরিণের। কবির চিন্তা আর মননের স্বরভঙ্গ হয়নি। তার যে নিজস্ব কাব্যভাবভঙ্গি তা যেন আরো শানিত হয়েছে, যুক্ত হয়েছে ধর্মীয়চেতনার কাছে সমর্পণের চিহ্নগুলি। বরংচ তাঁর সৃৃষ্টি আরো দোর্দণ্ড দাপটে ছুটেছে। জয় করেছে পাঠককূলের অবিচ্ছেদ্দ অনুভূতিকে। বলা যায়, এ যেন কবির ‘প্রহরান্তের পাশফেরা’। কবি আরব্য সাহিত্যের সুমশ্রিন প্রলেপ দিয়ে বাংলা কবিতার উজ্জ্বল্য বড়িয়েছেন। কাব্য রসিকদের উপলব্ধিতে দিয়েছেন নতুন সংয়োজন, ছিটিয়েছেন ভিন্ন স্বাদের তোকমা। কারার আড়াল থেকে কবি হয়তো পেয়েছিলেন এক সম্মতির সঙ্কেত কম্পন, যা কবি পরবর্তিতে অর্জন করেছিলেন সাতটি কাব্যের অমূল্য দামে। সত্যের আঙ্গুল তুলে শিখেছিলেন আনন্তের গান। সে গান গেয়ে সরল প্রতিশ্রতিতে স্বপ্রকাশ করেছেন কবিত্বশক্তিকে। কাব্যেভরে রেখেগেছেন শ্বেতশুভ্র ডানার নিক্কন। সবুজে বিছানো প্রহসনের জাল ছিন্নভিন্ন করে গেয়ে ওঠেছেন আফ্রিকার কালো মানুষদের জয়গান। বাণিজ্য বাতাসের আনাগোনায় যখন পরিশুদ্ধ মানুষগুলো খাবিখাচ্ছে তখন কবি রেধেছেন ‘আরব্য রজনীর রাজহাস’। দাপটে ছুটিয়েছেন ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’। জোড়গলায় উচ্চারণ করেছেন, ‘হত্যাকারীদের কোনো মানচিত্র থাকে না, নেই’। অকস্মাৎ কেঁপে উঠি, অকস্মাৎ মনে হয়/ বাতি নেই। শহরের সব পথ নিভে গেছে/ বন্দরের সমস্ত বিজুলি/ মূহ্যমান।/ দিশাহীন ইতস্থত বিক্ষিপ্ত জাহাজ/ না পেয়ে জেটির দেখা মধ্য সমুদ্রে ফেলে স্থিতির নোঙর। [লেখার সময়, বখতিয়ারের ঘোড়া]’। বাতি নেভানো জেটি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে সমুদ্র গভীরে। এ কোন অভিমান নয়, এ যেন আরো ¯ষ্ট উচ্চারণে ভেসে থাকা, বেঁচে থাকা। আল্লাহর কালাম পড়া ঠোঁটেই শুনতে চেয়েছেন ‘ভালোবাসি’ শব্দ, আর ক্ষমাসুন্দর মনোভাবে রোদনে রোদনে আহ্বান করেছেন শান্তিময় পৃথিবীকে।

এক ধরণের অবিবেচক সমালোচক আছেন, কি আধুনিক, কি উত্তর আধুনিক যুগ, তারা সবকালের ইবলিশের মতো, তাদের বিচরণ ক্ষমতাও অবাধ। হাড়িতে হাত প্রবেশ করাতে দক্ষ। তাদেরই উত্তরসুরীরা নজরুলকে মৌলবাদী কবি, হিন্দুয়ানী কবি, আখ্যা দিতে কোনো দ্বিধা করেনি। তাদের কেউ কেউ জীবনানন্দ দাশকে বলেছে, ‘অকবি’। বর্তমানেও তারা দৃঢ় পণ করে আছেন যেন আল মাহমুদ হারিয়ে দিয়ে এগিয়ে যাবেন। তারা জানেন না যে কোথায় থাকে এই গ্রাম্য কবির প্রাণ ভোমরা, তারা জানেন না যে, আল মাহমুদ একা নেই, তার সাথে রয়েছে অগণিত পাঠক ও বাংলা সাহিত্যানুরাগীরা। রিলে রেস বা কাঠি দৌড়ের মতো। দলবদ্ধ দৌড় বলা যায়। আসলে শিল্পিকে বিচার করতে হয় শিল্পের দড়িপাল্লায় মেপে। এই দাড়িপাল্লায় শুধু ‘সোনালি কবিন’ রেখে দিলেও অনন্তকাল ঝুকে থাকবে। বাংলা সাহিত্যমাতার ছায়ায় বেড়ে ওঠেছেন বলেই মাতৃছায়া লিখেছেন- ‘পোকায় ধরেছে আজ এ দেশের ললিত বিবেকে/ মগজ বিকিয়ে দিয়ে পরিতৃপ্ত পন্ডিত সমাজ। [মাতৃছায়া]

হয়তো ভেঙ্গেছেন কবি ‘দ্বিতীয় ভাঙ্গনে’। সাম্যবাদি সমাজের প্রান্তিক মানুষদের কথা ভাবা কবি কারাকালীন সময়ে ভেঙ্গেছেন নিজের স্বপ্নাদর্শকে! কারাগার কি ভাঙ্গনের জায়গা কবি এমন কি দিক্ষা নিলেন যে, মায়াবী পর্দার আলপনাতে তাঁর মননশীল গভীরতা, উপমা, বাকপ্রতিমার কোন পরিবর্তন হয়নি, তিনি ঠিকই তাঁর মৌলিকত্ব অটুট রেখেছেন। তাই ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতিক চেতনায় কবির সমালোচনা করা সহজ, কিন্তু তাঁর কাব্য শক্তিতে আতিক্রম করা সহজ নয়। ধর্মীয় চালুনি দিয়ে ছেঁকেও যে শব্দ-নূড়ি পাওয়া যাবে, সেগুলোই স্ফটিকের মতো জ্বলজ্বল করে দ্যুতি ছড়াচ্ছে। কবি নিজেই বলে গেছেন- ‘তবু আমার মনে হলো ধ্বসস্তুপের মধ্যে কাত হয়ে পড়া/ গম্বুজটিই বুঝিবা খানিকটা উঁচু হয়ে আছে। এই যে প্রতীকি ব্যখ্যা তা কি করে সাহিত্যবোদ্ধারা এড়িয়ে যাবে। কেননা তিনি সত্যিকারের অস্থিমজ্জায় এক অনন্য কবি, বিশুদ্ধ কবি

‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’ শেষে মায়াবী পর্দা দোলাতে দোলাতে কবি তার নিজস্ব যাদুঘরে সাজানো সরাঞ্জামের এক দীর্ঘ তালিকা দিয়ে গেছেন শব্দচোরদের উদ্দেশ্যে। কবি তাঁর ঝুলিতে রেখেছেন- সবুজ পুঁতির মালা, সুরভী ঘাসের বীজ, কিশোরীর ভাঙ্গা চুড়ি, নীল নাকফুল, কালো পাহাড়ের মৃন্ময় বাসনকোশন, চোখের জলের টোপা কারার আড়াল থেকে আনা, পাখির ঠোঁট, তক্ষকের চোখ, নদীর গভীর থেকে তোলা ছিনায়ের রুপোর চামচ, বেতসের কাঁটা, খাকোশ মাছের পাকা লেজ, ছুঁৎরার পাতা আর বাদরহুলোর কিছু ফল। এসবই কবির সম্বল। অবশেষে কবি তাঁর সমগ্র সম্বল ‘সোনালি কবিনে’ মুড়িয়ে দিয়ে গেছেন সনেটের আদলে। আমরা পেয়েছি বাংলা সাহিত্যেও শ্রেষ্টতম কবিতাদের। মানুষের মুক্তি ও গণতন্ত্রের- এ দুই অভিষ্ট লক্ষ্য কবিকে শিনায় টানটান করে থাকতে সাহায্য করেছে। কবি সে পথেই চলে কবিতার এক সরল ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন, যা পাঠককে অন্য রকম ভাবনা টেনে নিয়ে যায়। ‘কবিতাতো কৈশোরের স্মৃতি.. ..আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি-রাবেয়া রাবেয়া-.. .. গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর/ কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুল খোলা আয়েশা আক্তার।[ কবিতা এমন]’। এই কবতিার রস আস্বাদনে যে পঞ্চাশোর্ধ কোন পাঠকেরই মনে পড়ে যায় কৈশোরের স্মৃতি। কি চমৎকারিত্বে সাইকেলের ঘণ্টা ধ্বনি কবিতা হয়ে উঠেছে। কবি তাঁর প্রতিজ্ঞা রেখেছেন, কথা দিয়েছিলেন কথার বরখেলাপ করবেন না। বলেছেন, ‘কথার খেলাপ করে আমি যদি জবান নাপাক/ কোনদিন করি তবে হয়ো তুমি বিদ্যূতের ফলা,/ এ-বক্ষ বিদির্ণ করে নামে যেন তোমার তালাক/ নাদানের রোজগারে না উঠিও আমিষের নলা। [সোনালি কাবিন]। কি করে বলি কবিতাগুলো তাঁর হৃদয় নিংড়ে বেরিয়ে এসেছিল, না কি অলৌকিক ক্ষমতাবলে তা ধরা দিয়েছিল কবিতার পঙ্ক্তিমালায়! গ্রাম্য শব্দাবলিতে ঠাসা এই অমরকাব্য, গ্রামীণ পটভ’মি ও সংস্তৃতির এক অবিনশ্বর দলিল। আর এই সব দলিলদস্তাবেজ কবি রেখে দিয়ে গেছেন সোনালি কবিনে মুড়ে মহা-‘কালের কলসে’। এ কাল কতদিন থাকবে জানি না। তবে কাল, মহাকালের গহŸরে নিয়ে যাবে কবি আল মাহমুদের অজেয় অক্ষরগুলোকে। কলস ভেসে থাকেবে ধ্বনি তুলে। সহজে দাঁড়াবে এসে সরল মস্তকে আর কম্পিত মোমের মতো জ্বলতে থাকবে শব্দের আগুন।

একদিন ক্লান্ত হয়ে আসেন কবি, তবুও মেলে রাখেন তৃষ্ণার লোচন। দেখতে পান সমস্ত ভূগোল, বিপন্নশব্দে ভরে থাকে, ভরে যায়, পূর্ণ হতে থাকে। ধৈর্যধরা বহুকাল খ্যাতির ধাপে পা রাখে কবির সমস্ত গন্তব্য। কবির দেহ হারিয়ে যায় লোক লোকান্তরে, এক অদৃষ্টে প্রবেশ করেন কবি।

এই সংবাদ ৪৪২ বার পঠিত।
ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন