খুঁজে ফিরি তারে (পর্ব-০৫) । জিল্লুর রহমান – আলোকিত প্রতিদিন

খুঁজে ফিরি তারে (পর্ব-০৫) । জিল্লুর রহমান

উপন্যাস

খুঁজে ফিরি তারে

জিল্লুর রহমান

(পর্ব-০৫)

সেদিন ছিল শনিবার। রিমাকে তার স্কুল থেকে নিয়ে এসে বাসার কলিং বেল টিপতেই ফিরোজের কানে তার মায়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এসেছিল, মা আরশী দরজাটা খুলে দাও তো।

আরশী দরজা খুলে দিয়ে ভিতরে চলে গিয়েছিল।

হঠাৎ করেই ফিরোজের মনে একটা প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। আরশী তো অনেকদিন থেকে জয়পুরহাটেই আছে, একটানা এতদিন কলেজ বন্ধ থাকে নাকি? ফিরোজ মনে মনে হিসাব করছিল, এখন কি মাস? এখন কলেজে কোন পরীক্ষা চলছে নাকি বা কোন ছুটি বিশেষ করে গ্রীস্মকালীন বা শীতকালীন ছুটি? না কোন কিছুই তার মনে আসছে না। সে আরশীকে ডাক দিয়েছিল, আরশী।

আরশী সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।

দাঁড়িয়ে আছ কেন? বস।

আরশী ফিরোজের সামনের সোফায় সংকুচিত হয়ে বসেছিল।

ফিরোজ সাহেব জিজ্ঞেস করেছিল, আচ্ছা আরশী তোমাকে তো অনেকদিন থেকে বাসায় দেখছি, তোমার কলেজ বন্ধ নাকি?

না, কলেজ খোলা আছে।

তবে তুমি যাচ্ছ না যে?

না, এমনিতেই যাচ্ছি না।

কিন্তু ফিরোজ বিশ্বাস করতে পারেনি। তার মনে হচ্ছিল নিশ্চয়ই অন্য কোন কারণ আছে। সাধারণত এই অঞ্চলে মেয়েদের লেখাপড়ার হার কম। বেশিরভাগ অভিভাবক তাদের মেয়েদের লেখাপড়ার পাশাপাশি বিয়ের জন্য ঘর-বর খুঁজতে থাকে। তারপর ভাল ঘর-বর পেয়ে গেলে লেখাপড়ার সমাপ্তি ঘটে সে পর্যন্তই। আরশীর মুখের দিকে তাকিয়ে ফিরোজের মনে হচ্ছিল সে যেন কিছু লুকাচ্ছে। ফিরোজ প্রশ্ন করেছিল, এমনিতেই যাচ্ছ না, নাকি কোন সমস্যা?

আরশী কোন কথা বলেনি, মাথা নত করে বসেছিল।

আরশী আজকাল লেখাপড়া, চাকরি, সবক্ষেত্রেই যা প্রতিযোগিতা তাতে ভালোভাবে লেখাপড়া না করলে তো হবে না, কলেজ খোলা আছে অথচ তুমি কলেজে যাচ্ছ না, ক্লাস করছ না।

আরশী মাথা নত করেই মৃদু কণ্ঠে বলেছিল, আগামী মাসের তিন তারিখে যাবো।

আজ তো কেবল একুশ তারিখ, তিন তারিখ আসতে তো অনেক দেরি, তারমানে তুমি পনেরো দিন ক্লাস করবে না?

বাবা বলেছে এক কিংবা দুই তারিখে পেনশনের টাকা পাবে। আমার বই, হোস্টেলে খাওয়া-থাকার খরচের টাকা লাগবে তো, বাবা টাকা দিলেই চলে যাবো।

তো আপাততঃ ক’টাকা হলে তুমি বগুড়া যেতে পারছো?

দু’হাজার।

ফিরোজ মানি ব্যাগ থেকে দু’হাজার টাকা বের করে আরশীর হাতে টাকা দিতে চেয়েছিল, তুমি বগুড়া চলে যাও, যদি খালা বা খালু টাকার কথা জিজ্ঞেস করে তবে আমার কথা বলবে। খালু যখন পেনশনের টাকা পাবে তখন আমাকে দিলেও চলবে।

আরশী যেন লজ্জায় আরো জড়সড় হয়ে গিয়েছিল, না, লাগবে না।

ফিরোজ গম্ভীরস্বরেবলেছিল, নাও, বড়দের কথা না করতে হয় না। আমি তো বললাম খালা কিংবা খালুকে আমার কথা বলবে।

আরশী টাকা নিয়েছিল, তার দু’চোখ যেন পানিতে টলমল করছিল।

তুমি এখন যাও, ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে চলে যাও।

আচ্ছা।

আরশী পরদিনই বগুড়া চলে গিয়েছিল।

সেদিনের পর থেকে আরশী প্রায় দিনই তার বান্ধবীর মোবাইল ফোন থেকে ফিরোজের মোবাইলে মিস্‌ কল দিত। আর ফিরোজ কল ব্যাক করে কথা বলতো।

প্রায় মাস খানেক পর আরশী বাড়িতে এসেছিল।

এসেই বাসায় ব্যাগ রেখে ওপর তলায়।

তখন রাত আটটা বাজে ফিরোজ টি.ভি দেখছিল।

আরশী সালাম দিয়ে একটা মুচকি হেসে বলেছিল, কেমন আছেন?

হ্যাঁ ভাল, তুমি?

জি ভাল।

চলে আসলে কেন? কলেজ বন্ধ নাকি?

কাল পুলিশে লোক নিবে, আমি একবার লাইনে দাঁড়াবো মনে করছি, আমার জন্য দোয়া করবেন।

তুমি লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে চাকরি করবে?

তাছাড়া আর উপায় কি? আপনি তো আমাদের সংসারের অবস্থা কিছুটা হলেও জানেন, যদি চাকরিটা হয়ে যায় তবে বাবার বোঝা কিছুটা হাল্কা হবে।

তুমি কি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছো?

জি, আপনি দোয়া করবেন।

অবশ্যই দোয়া করব।

পরদিন আরশী পুলিশ লাইন ইণ্টারভিউদিয়ে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়েছিল। নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমে মোবাইলে ফিরোজকে খবরটা দিয়েছিল তারপর রাতে বাসায় ফিরে ফিরোজের পা ছুঁয়ে সালাম করেছিল।

তারপর এই ইনকোয়ারী, সেই ইনকোয়ারী সবকিছু শেষে আরশীকে পাঠানো হয়েছিল রংপুর পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে।

কয়েকদিন যেতে না যেতেই আরশী ফিরোজকে মোবাইল করে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করেছিল। ফিরোজ তো অবাক। যে মেয়ে অনেক উৎসাহ নিয়ে পুলিশে যোগ দিল সে মেয়ে ক’দিন পরেই ভেঙ্গে পড়বে কেন? আরশী কাঁদছ কেন?

আপনি আমাকে কি চাকরিতে পাঠালেন? এখানে চাকরি করলে তো আমি মরে যাবো।

আমি পাঠালাম কীভাবে? তুমি তো খুব আগ্রহী ছিলে, আমি কিন্তু তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি নাকি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছ তাই আমি আর তোমাকে বাধা দিলাম না।

আপনি সবকিছু জানতেন কিন্তু জেনে-শুনেও আমাকে নিষেধ করেননি, আপনার নিজের মেয়ে হলে আপনি কখনো এখানে চাকরি করতে পাঠাতেন না।

আরশী কাঁদছ কেন? কী হয়েছে?

এখানকার খাবার-দাবার খুব খারাপ আর সব সময় শুধু ট্রেনিং আর ট্রেনিং, এই ক’দিনে আমার স্বাস্থ্যটা একেবারে শেষ হয়ে গেছে, আপনার মেয়ে হলে আপনি আমাকে ফেরত নিয়ে যেতেন।

আরশী কষ্ট করে ট্রেনিংটা শেষ কর, ট্রেনিং শেষ হলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

ঠিক হয়ে যাবে না, ট্রেনিং শেষ হতে হতে আমি মরে যাবো।

তুমি তোমাদের বাড়িতে বলেছ?

হ্যাঁ।

কী বলেছে?

কেউ কিছু বলেনি।

আচ্ছা ঠিক আছে ওখানে সরকারিভাবে যে খাবার দেয় তার বাইরে কি অতিরিক্ত টাকা দিয়ে খাবার কিনে খাওয়ার সুযোগ আছে?

আছে কিন্তু কেন্টিনে টাকা দিয়ে কিনে খেতে হবে।

তাহলে আমি তোমার জন্য কিছু টাকা পাঠিয়ে দিই?

কেন? আপনি একবার দেখতে আসতে পারেন না?

আমি তোমাকে দেখতে আসবো?

হ্যাঁ, আসেন না একবার, আগামী শুক্রবার, শনিবার তো আপনার অফিস ছুটি আছে।

ফিরোজ চুপ করেছিল।

কি হলো? আসবেন না?

আসবো।

আরশীর মুখের দিকে তাকিয়ে ফিরোজের খুব মায়া হয়েছিল। আরশীর চোখ দু’টো কোটরে বসে গিয়েছিল, চেহারায় ক্লান্তির ছাপ।

ফিরোজকে দেখে আরশীর দু’চোখ ছল্‌ছল করে উঠেছিল।

ফিরোজ জিজ্ঞেস করেছিল, কেমন আছ আরশী?

আপনি দেখে বুঝতে পাচ্ছেন না, আমি কেমন আছি?

হ্যাঁ, তা বুঝতে পাচ্ছি। আসলে ট্রেনিং-এর সময় একটু কষ্ট হয়, ট্রেনিং শেষ হলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

ট্রেনিং শেষ হলে সব ঠিক হয়ে যাবে, ট্রেনিং তো কেবল শুরু হলো ট্রেনিং শেষ হওয়া পর্যন্ত আমি বেঁচে থাকলে তো?

আরশী এভাবে বলতে হয় না, আচ্ছা আমি দেখছি কী করা যায়?

আরশী আপন মনে বলতে শুরু করেছিল, এখানে যে খাবার দেয় এগুলো আমি খেতে পারি না, সব সময় ক্ষিদে লেগেই থাকে, তারওপর ট্রেনিং সেই ভোর বেলা থেকে।

আরশী তুমি তো সেদিন বললে তোমাদের কেন্টিনে আলাদাভাবে খাবার কিনতে পাওয়া যায়, আমি তোমাকে টাকা দিয়ে যাচ্ছি তুমি কিনে খাবে, বলে ফিরোজ আরশীর হাতে এক হাজার টাকা দিয়েছিল।

আরশী টাকাগুলো হাতে নিয়ে চোখ মুছেছিল।

ফিরোজ উঠে দাঁড়িয়েছিল, আরশী আমি তাহলে আসি।

একটু বসুন প্লিজ, আমি আপনার সঙ্গে বাইরে যাবো, আমি এখানে আসার পর একদিনও এই ট্রেনিং সেন্টার থেকে বের হইনি। আমি একবার আপনার সঙ্গে বের হবো, বাইরে হোটেলে বসে কিছু খাবো তারপর ভিতরে ঢুকব। আপনি একটু বসুন আমি,তৈরি হয়ে স্যারকে বলে আসছি।

এমনিভাবে আরশী ধীরে ধীরে ফিরোজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।

ফিরোজ পাশ ফিরে শুইলো।

চলবে…

 

আলোকিত প্রতিদিন/০৩ জুলাই’১৯/জেডএন

এই সংবাদ ১৩৫ বার পঠিত।
ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন