খুঁজে ফিরি তারে (পর্ব-০৪) । জিল্লুর রহমান – আলোকিত প্রতিদিন

খুঁজে ফিরি তারে (পর্ব-০৪) । জিল্লুর রহমান

উপন্যাস

খুঁজে ফিরি তারে

জিল্লুর রহমান

(পর্ব-০৪)

 

ছাত্র জীবনে ফিরোজের বাবা যখন মারা যায় তখন থেকে পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত বিষয়-সম্পত্তি তার মা দেখাশুনা করতো। ফিরোজের চাকরির পর সে আর কোনদিন সেসব বিষয়-সম্পত্তির কোন খোঁজ-খবর নেয়নি। চাচাতো ভাইয়েরা তার জমি-জমা দেখাশুনা করে আয়-ব্যয়ের যা হিসাব দিত তাতেই সে সন্তুষ্ট থাকতো। জমিজমার কাগজ-পত্র চাচাতো ভাইয়েরাই দেখাশুনা করতো। তাছাড়া সে নিজেও কিছু জমিজমা কিনেছে, সেসব জমির খারিজ চাচাতো ভাইয়েরাই করেছে এবং কখন কোন জমির খাজনা দিতে হবে তাও তারাই করতো। সে মাঝে মাঝে তাদের কাছ থেকে খোঁজ খবর নিত। তবে তাদের সমস্ত জমি জমার কাগজ-পত্র দেখাশুনা করতো জলিল মহুরি।

সকালবেলা নাস্তার পর ফিরোজ জলিল মহুরিকে ডেকে পাঠালো।

জলিল মহুরি ফিরোজের প্রতিবেশী, মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখা হলে শুধু সালাম বিনিময় হতো কিন্তু আজ হঠাৎ করে তাকে ডেকে পাঠানোয় সে কিছুটা অবাক হলো, প্রায় ঘণ্টা খানেক পর জলিল মহুরি এলো, ভাইজান কী মনে করে হঠাৎ আমাকে ডেকেছেন?

জলিল তোমার সঙ্গে আমার অনেক কাজ আছে।

জি ভাইজান বলুন কী কাজ?

তুমি তো অনেকদিন থেকে আমাদের জমি-জমার কাগজ দেখাশুনা করো।

জি।

ফিরোজ একটা ফাইল জলিল মহুরির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, বাবার অংশ থেকে পাওয়া এবং আমার কেনা জমির কিছু কাগজ-পত্র মনে হয় এই ফাইলে আছে। যেসব জমির কাগজ-পত্র নেই সেগুলো হয়ত আমার চাচাতো ভাইদের কাছে কিংবা তোমার কাছে আছে।

জলিল মহুরি সব কাগজগুলো দেখে বলল, ভাইজান আপনার কেনা জমির কাগজ-পত্রগুলো তো ঠিক আছে, শরিকের জমির কাগজ-পত্রগুলো আমি খুঁজে বের করি, আপনি কোন চিন্তা করবেন না।

তুমি সবগুলো কাগজ-পত্র খুঁজে বের করো, জমি রেজিস্ট্রি করতে যেসব কাগজ লাগবে সব যোগাড় করো।

জমি রেজিস্ট্রি করার কথা শুনে জলিল মহুরি মুখ তুলে কিছুটা অবাক দৃষ্টিতে ফিরোজের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

আমার বিষয়-সম্পত্তি যা আছে সব আমার মেয়ে রিমার নামে দান করে দিব।

জি ভাইজান।

কত খরচ পড়বে?

হিসাব করে দেখতে হবে ভাইজান।

তুমি হিসাব করে আজ সন্ধ্যায় আমাকে জানাবে, আগামীকাল রেজিস্ট্রি হবে।

জি ভাইজান।

একটা কথা মনে রাখবে।

জলিল মহুরি মুখ তুলে তাকাল, কী কথা ভাইজান?

কথাটা যেন কেউ না জানে, এমন কি রিমাও যেন না জানে।

ঠিক আছে ভাইজান, কেউ জানবে না।

 

টেবিলে খাবার দিয়ে রিমা সব সময় তার বাবার দিকে খেয়াল করে, কতটুকু খাচ্ছে, কোনটা তার বাবা বেশি পছন্দ করে, কোনটা কম পছন্দ করে এসব।

ফিরোজ আগে শাক-সব্জি দিয়ে খাওয়া শুরু করতো তারপর মাছ কিংবা মাংস যেটা তার পছন্দ সেই তরকারি দিয়ে খেত। আজ তার ব্যতিক্রম ঘটল।

ফিরোজ বলল, মা মাংসের বাটিটা এদিকে দে তো।

বাবা সব্জি খাবে না?

খাবো পরে?

বাবা তুমি কি খাবার ধরণটাও পাল্টিয়েছ নাকি?

হ্যাঁ।

কেন?

আগে কম পছন্দের তরকারিগুলো দিয়ে খাওয়া শুরু করতাম, বেশি পছন্দের তরকারিগুলো দিয়ে পরে খেতাম কিন্তু আমার মনে হয়েছে নিয়মটা ঠিক ছিল না।

কেন?

এই ধর আমি কম পছন্দের তরকারিগুলো দিয়ে খাওয়া শুরু করলাম এবং বেশি পছন্দের তরকারিগুলো দিয়ে খাওয়া শুরু করার আগে মরে গেলাম, তখন তো আর আমার বেশি পছন্দের তরকারিগুলো খাওয়া হলো না। তাই নিয়মটা একটু পাল্টিয়েছি।

রিমা হেসে ফেলল।

হ্যাঁ শুধু তাই না আমার মনে হয় জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তাড়াতাড়ি সেরে ফেলা উচিত।

রিমা শাসনের সুরে বলল, বাবা তুমি এমন করে কথা বলছ কেন? বলতো?

না এমনি।

খাওয়া শেষ করে নিত্য দিনের মতো ফিরোজ ড্রয়িং রুমে বসল।

পিছনে পিছনে রিমাও তার বাবার পাশে বসল।

বাবা তুমি যা-ই বলো না কেন? আমি বুঝতে পাচ্ছি তুমি প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য এসব আধ্যাত্মিক কথা বলছ।

আমি প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বলব কেন? কোনটা সত্যি কথা না তুই বল?

আচ্ছা যাক এখন তোমার কথা বলো।

কী কথা?

বাবা তোমার কি কাউকে পছন্দ আছে?

ফিরোজ রেগে গেল, রিমা।

না বাবা, আমি বলছিলাম যদি থাকে তো ভালো, আর না হলে তো আবার আমাকে মা খুঁজতে হবে।

রিমা ফাজলামি করবি না।

বাবা!

ছোটবেলায় তোর মা মারা গেছে দেখে আমি তোকে বাবা-মা দু’জনের স্নেহ, মায়া-মমতা দিয়ে বড় করেছি, তোকে কোনদিন শাসন করিনি তাই তুই আমার মাথায় উঠেছিস, আমার সঙ্গে যাচ্ছেতাই কথা বলছিস।

রিমা কোন কথা বলল না, তার চোখ দিয়ে পানি ছিটকে পড়ল। সে আর কোন কথা না বলে তার রুমে গিয়ে বিছানায় শুয়ে গুমরে গুমরে কাঁদতে লাগল।

ফিরোজ কয়েক মিনিট বসে রইল। তারপর রিমার রুমে গিয়ে তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, আমার ভুল হয়ে গেছে মা, আসলে তোকে কী বলতে কী বলে ফেলেছি, আয় বসি দু’জনে কিছুক্ষণ গল্প করি।

রিমা মাথা থেকে তার বাবার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, আমি তোমার সঙ্গে গল্প করব না, আমি এখন ঘুমাবো।

তাহলে আমি কার সঙ্গে গল্প করব, তুই ছাড়া যে আমার আর কেউ নেই, বলতে বলতে ফিরোজের কণ্ঠস্বর ভারি হয়ে এলো।

রিমা বিছানায় শুয়ে থেকেই চোখ মুছে বলল, আমি তোমার সঙ্গে গল্প করতে পারি তবে তোমাকে একটা প্রমিজ করতে হবে?

কী প্রমিজ?

তুমি আর কোনদিন আমার ওপর রাগ করতে পারবে না।

এ রকম শর্ত দিয়ে কখনো প্রমিজ করতে হয় না, কারণ তুই যদি কোন অন্যায় করিস তবে আমি তোকে শাসন করতে পারব না?

আমি প্রমিজ করলাম, আমি কোন অন্যায় করব না। এখন তুমি প্রমিজ করো তুমিও আমাকে কোনদিন ধমক দিবে না।

প্রমিজ।

রিমা বিছানা থেকে উঠল।

ফিরোজ রিমার হাত ধরে বিছানা থেকে তাকে নিয়ে এসে আবার সোফায় বসল।

ফিরোজ রিমার চোখ মুছে দিতে দিতে বলল, বাবা আমার মাথায় একটা নতুন বুদ্ধি এসেছে।

কী বুদ্ধি?

তার আগে তোকে একটা গল্প শুনতে হবে।

বলো।

আমাদের সঙ্গে এক মেয়ে লেখাপড়া করতো তারপর সে যখন এস.এস.সি পাস করল তখন একদিন হঠাৎ করে তার বাবা-মা তাকে বিয়ে দিয়ে দিল।

তারপর।

আমাদের ধারণা ছিল মেয়েটার লেখাপড়া হয়ত এ পর্যন্তই শেষ হবে, কিন্তু শেষ হয়নি। সে সংসার করতে করতে মাস্টার্স পাস করার পর এখন সরকারি চাকরি করছে।

এটা আবার নতুন কী? এটা কোন নতুন ঘটনাও না, আকর্ষণীয় ঘটনাও না।

ফিরোজ রিমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, আমিও তোকে বিয়ে দিতে চাই মা।

বাবা!

হ্যাঁ মা তোর যদি কোন ছেলেকে পছন্দ থাকে তো বল?

আমার কোন পছন্দ নেই বাবা, থাকলে তোমাকে বলতাম আর আমি সবে মাত্র এইচ.এস.সি পরীক্ষা দিয়েছি, আমি এখনি বিয়ে করব কেন?

বিয়ের পর লেখাপড়া করবি, আচ্ছা তোর এক বন্ধু যে একদিন বাসায় এসেছিল ইমন না কী নাম?

ইমন, বন্ধু না কাজিন।

ইমনকে রিমা ভালবাসে, সুযোগ পেলেই দু’জনে একসঙ্গে ঘুরে বেড়ায় কিন্তু রিমা ইমনকে বিয়ে করবে এবং রিমার বাবা সেটা এত সহজে মেনে নিবে এটা দু’জনের কেউ কোনদিন ভাবেনি আজ যখন ফিরোজ নিজে থেকেই ইমনের নাম বলল তখন রিমা মনে মনে অনেকটা খুশি হলো।

ওকে তোর পছন্দ না?

বাবা আমার এখনো বিয়ের বয়স হয়নি।

তা হয়নি আগামী মাসের পনেরো তারিখে তোর বয়স আঠারো বছর হবে তখন তোর বিয়ের বয়স হবে এখন থেকে বিয়ের আলাপ শুরু করলে বিয়ে হতে হতে তোর বয়সও পূর্ণ হবে।

বাবা।

হ্যাঁ তোর জন্ম তারিখ আমার মনে থাকবে না?

বাবা তুমি না বলতে আমি আগে লেখাপড়া করে প্রতিষ্ঠিত হবো, নিজের পায়ে দাঁড়াবো তারপর তুমি আমার বিয়ে দিবে, এখন হঠাৎ করে মত পাল্টাচ্ছ কেন?

ঐ যে বললাম ভাল তরকারি দিয়ে ভাত খাওয়া শুরু করতে, এখন আমার মনে হচ্ছে আমার সব কাজের মধ্যে তোর বিয়েটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাই আগে বিয়ের কথা বলছি। তুই আমার মেয়ে, বিয়ের পরও তুই ঠিকই নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারবি।

না বাবা, না।

মা তুই যখন যা বলেছিস আমি তাই করেছি। আমার আদর স্নেহে তু্‌ই একটু বেশি জেদি হয়েছিস্‌, আমিও তোর সব কথা শুনেছি তুই আমাকে আমার এই ইচ্ছাটা পূরণ করতে দে।

বাবা তুমি এভাবে কথা বলছ কেন? তুমি কোথাও চলে যাচ্ছ নাকি?

ফিরোজ একটা শুষ্ক হাসি হেসে বলল, কীভাবে বলছি একেবারে স্বাভাবকিভাবে বলছি, তুই আমার কথা ভাবিস না মা, যা তুই এখন ঘুমিয়ে পড়।

রিমা তার রুমে গেল।

ফিরোজ একবার মোবাইলের ঘড়িতে দেখল।

রাত দশটা বাজে।

সে কামালকে মোবাইল করল, হ্যালো কামাল।

জি ভাইজান।

তুমি কি বাসায়?

জি ভাইজান।

তুমি একবার আমার বাসায় আসতে পারবে?

ভাইজান জরুরী কিছু? কোন সমস্যা?

না কোন সমস্যা না, তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।

ভাইজান আসছি।

কিছুক্ষণের মধ্যে কামাল চলে এলো।

রিমা দরজা খুলে দিল, আঙ্কেল আস্‌সালামুয়ালায়কুম।

ওয়ালেকুম আসলাম, কামাল ড্রয়িং রুমে বসল।

ফিরোজ বলল, তুই তোর রুমে যা মা।

ভাইজান হঠাৎ আমাকে কী মনে করে ডেকেছেন?

কামাল রিমা আমার একমাত্র মেয়ে, ওর মা যদি বেঁচে থাকতো তবে হয়ত বিষয়টা আমাকে ভাবতে হতো না, আমি কোথাও গেলে মেয়েটা সারাদিন বাসায় একা থাকে, একা কোথাও বেরও হয়না, বলতে গেলে ও একেবারে নিঃসঙ্গ। আমারও অনেক বয়স হয়েছে আল্লাহ না করুন হঠাৎ করে যদি মরে যাই তবে মেয়েটার আর পৃথিবীতে কেউ থাকবে না।

একথা মুখে আনবেন না ভাইজান।

না, হায়াত মউতের কথা তো আর বলা যায় না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার মা রিমাকে আমি বিয়ে দিব।

ভাইজান হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্ত নিলেন?

কামাল তোমার ছেলে আছে না, ইমন।

জি।

রিমা আর ইমন পরষ্পরকে ভালোবাসে, তুমি সম্মতি দিলে আমি ওদের বিয়ে দিতে চাই।

ভাইজান আপনি আমার চাচাতো ভাই এবং বংশের সবার বড় ছেলে, আপনাকে আমরা সবাই মুরুব্বী মানি, তাই আপনি যখন চাচ্ছেন তো আমার আর আপত্তি কি, তা না হলে তো আমার ছেলে আপনার মেয়ের জামাই হওয়ার যোগ্য না। আপনি আরো ভেবে দেখেন ভাইজান।

আমি যোগ্যতা দেখে মেয়ে বিয়ে দিচ্ছি না, আমি মনে করি ছেলে-মেয়ে দু’টাই আমার এবং আমার মেয়ে ইমনকে পছন্দ করে। আমি ওর ইচ্ছা পূরণ করে মরতে চাই।

ভাইজান আপনি কিন্তু বার বার করে মরে যাবার কথা বলছেন, এটা আর একবারও বলবেন না।

আমি ভেবে দেখেছি কামাল, আমার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, তুমি সবকিছুর আয়োজন কর, মনে কর বর-কনে দু’জনেরই গার্জিয়ান তুমি।

ভাইজান, আপনার কী কোন অসুখ করেছে?

ফিরোজ কিছু বলল না।

ভাইজান হঠাৎ করে আপনার এরকম সিদ্ধান্ত? আপনি আমাদের সবাইকে মেয়েদের শিক্ষিত,স্বাবলম্বীরে গড়ার কথা বলে নিজের একমাত্র আদরের মেয়েকে বিয়ে দিতে চাচ্ছেন?

ফিরোজ কামালের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই তার রাগান্বিত চোখ দেখে কামাল চোখ নামাল।

রিমা চায়ের ট্রে নিয়ে ভিতরে ঢুকল।

 

(চলবে…)

 

আলোকিত প্রতিদিন/২১ জুন’১৯/জেডএন

এই সংবাদ ১৪০ বার পঠিত।
ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন