খুঁজে ফিরি তারে (পর্ব-০৩) । জিল্লুর রহমান – আলোকিত প্রতিদিন

খুঁজে ফিরি তারে (পর্ব-০৩) । জিল্লুর রহমান

উপন্যাস

খুঁজে ফিরি তারে

জিল্লুর রহমান

(পর্ব-০৩)

রিমার বয়স যখন আট বছর, তখন ফিরোজ বদলি হয়েছিল জয়পুরহাট। বদলির অর্ডারটা হয়েছিল ডিসেম্বরমাসে, রিমার পরীক্ষা শেষ হয়েছে এমন সময়।
ফিরোজ জয়পুরহাট জয়েন করে অফিসের কাছেই একটা বাসা ভাড়া নিয়েছিল। নিচতলায় বাড়িওয়ালা নিজে থাকতেন, সে বাসারই দ্বিতীয় তলার তিন রুম বিশিষ্ট একটা ফ্ল্যাট বাসায় ছিল ফিরোজ।
নীলফামারী থেকে জয়পুরহাট মালামাল শিফ্‌ট করার পর রিমা আর তার দাদি মিলে প্রতিদিন একটু একটু করে বাসা গুছাতো।
একদিন ফিরোজ অফিস থেকে ফিরে দেখল তার মা আর রিমার সঙ্গে একটি মেয়ে বাসার জিনিসপত্র গুছাচ্ছে।
ফিরোজকে বাসায় ঢুকতে দেখে মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিয়েছিল।
কী নাম তোমার?
আরশী।
বসো।
আরশী সোফায় বসেছিল।
রিমা বলেছিল, বাবা তুমি তো জানো না, আমরা যেদিন এসেছি সেদিন থেকেই আরশী আণ্টি কাজ করছে তাই তো তাড়াতাড়ি সবকিছু গুছানো হয়েছে।
তাই নাকি?
আরশী মাথা নত করে বসেছিল।
রিমা বলেছিল, তুমি নাহলে দাদিকে জিজ্ঞেস করো?
ছিঃ মা এভাবে বলতে হয় না। আমি কি তোকে অবিশ্বাস করছি যে তোর দাদিকে জিজ্ঞেস করতে হবে?
আরশী উঠে দাঁড়িয়েছিল, খালা আম্মা আমি আসি।
আসি কেন মা বস? তোমরা গল্প কর আমি তোমাদের জন্য চা করছি।
আরশী আবার বসেছিল।
ফিরোজ জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি কোন ক্লাসে পড়?
অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে।
কোথায়?
বগুড়া সরকারী আযিযুল হক কলেজে।
তোমরা ক’ভাই বোন?
আমরা তিন বোন এক ভাই, বোনদের মধ্যে আমি মেজো।
এই দেখো আমরা তোমাদের বাসায় ভাড়া থাকি অথচ তোমাদের সঙ্গে আমাদের ভালোভাবে পরিচয়ই হয়নি, আসলে বাসা ভাড়া নেওয়ার সময় আমি নিজে থাকলে হয়ত তোমাদের সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত হওয়া যেত, তোমার বাবা কী করেন?
বাবা সরকারি চাকরি করতো।
এখন।
রিটায়ার্ড করেছে। আগে আমাদের শুধু নিচতলাটা ছিল, বাবা রিটায়ার্ড করার পর পেনশনের টাকা দিয়ে উপরতলাটা করেছে, বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। এক ভাই আমার চেয়ে বড়, সবার ছোটভাই এ বছর একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে।
ফিরোজ আরশীর দিকে তাকিয়েছিল। সে আসলে এতকিছু জানতে চায়নি কিন্তু আরশী নিজে থেকেই বলছিল। আরশীর চোখে-মুখে একটা সরলতা ছিল যা কিনা তার কথার মধ্যে ফুটে উঠছিল। ফিরোজ আপন মনে হেসেছিল।
রিমা আরশীকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি কি আমাদের গ্রামের বাড়ি জানেন?
না তো।
দিনাজপুর, এখান থেকে অনেক দুর, আমি আমাদের গ্রামের বাড়িতে অনেকদিন আগে একবার গেছিলাম।
ফিরোজ রিমাকে কোলে নিয়ে চুমু দিয়েছিল, কথা শোনো আমার মায়ের, একেবারে খাঁটি বাংলা ভাষায়।
আচ্ছা তোমরা গল্প করো আমি দাদিকে চা নিয়ে আসতে বলছি, বলে রিমা চলে গিয়েছিল।

তারপর থেকে ফিরোজ বাসায় না থাকলে আরশী প্রায় উপরে উঠে আসতো। কোন কোন দিন ফিরোজের সঙ্গে সিঁড়িতে দেখা হতো কোনদিন আরশী জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতো আবার কোনদিন দরজায় এসে দাঁড়িয়ে থাকতো।
সেদিন ফিরোজ অফিস থেকে বাসায় ফেরার সময় দেখে আরশী বাসার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, ফিরোজকে দেখে সামনে এগিয়ে আসে, কেমন আছেন?
হ্যাঁ ভালো, তুমি?
ভালো।
আমাদের বাসায় আসুন।
না।
এসো না বাবা, ভিতরে এসো। আরশীর মায়ের কণ্ঠস্বর।
ফিরোজ একবার এদিক-সেদিক তাকিয়ে আরশীর সঙ্গে গিয়েছিল।
ফিরোজ ড্রয়িং রুমে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিল। নিচতলার কাজ অনেক আগে করা হয়েছে তারপর আর কোনদিন হয়ত চুনকাম করা হয়নি। উপর তলার কাজ শেষ করার পর ফিরোজই প্রথম ভাড়াটে, দ্বিতীয় তলার কাজ শুরু করার আগে হয়ত ছাদ দিয়ে পানি চুয়াতো সে কারণে ছাদের তলার প্লাস্টার খসে পড়তে শুরু করেছে। ঘরের আসবাবপত্রগুলো অনেক পুরাতন, সোফার কাঠ হয়ত অনেক আগে বার্ণিশ করা হয়েছে, রং উঠে যাওয়ায় সোফাগুলো সৌন্দর্য হারিয়েছে, সোফার কভারগুলো পরিস্কার কিন্তু একটু একটু করে ছিঁড়তে শুরু করেছে বাসার সবকিছুতে যেন একটা দারিদ্রের ছাপ ফুটে উঠেছে।

আরশী পরিচয় করে দিয়েছিল, আমার মা।
হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি।
আমাদের বড় সংসার, সব সময় কোন না কোন টানাটানি লেগেই থাকে, আগে তোমার খালুর চাকরি ছিল। সে সময় বাসার ফার্নিচারগুলো করা হয়েছে, এখন পেনশনের সামান্য টাকায় ফার্নিচারগুলো রং করতেই পারছি না।
ফিরোজ লক্ষ্য করেছে, আরশীর মতো তার মাও নিজে থেকেই কথা বলতে শুরু করেছে, তাদের মধ্যে দারিদ্র লুকানোর কোন চেষ্টা বা ইচ্ছা নেই। তাদের নিজে থেকে এই দারিদ্র প্রকাশের কারণ বুঝতে ফিরোজের অনেকদিন সময় লেগেছিল। ফিরোজ বলেছিল, এভাবে বলবেন না খালা আম্মা, আল্লাহ্‌ যখন যেভাবে রাখে সেভাবেই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হয়।
আরশী ডাক দিয়েছিল, মা।
হ্যাঁ মা আসছি।
কয়েকমিনিট পর আরশী ট্রেতে করে নাস্তা নিয়ে এসেছিল।
ফিরোজ জিজ্ঞেস করেছিল, আরশী তোমার লেখাপড়া কেমন চলছে?
কোন মতে?
কোন মতে মানে?
এই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
কেন? পড়ালেখা আবার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলবে কেন? ভালভাবে পড়ালেখা করো।
করতে তো চাই।
সমস্যা কী?
আপনি সুখী মানুষ, আমাদের সমস্যার কথা বুঝবেন না, আপনি বসুন আমি চা নিয়ে আসছি।
আরশী চা নিয়ে এসেছিল।
ফিরোজ চা শেষ করে বলেছিল, খালা আম্মা ওপরে রিমা আছে, মা আছে আপনি একটু খেয়াল রাখবেন, মাঝে মাঝে ওপরে গিয়ে মা’র সঙ্গে গল্প করবেন, আরশী তুমিও এসো।
আরশী বলেছিল, সেকথা আর আপনাকে বলতে হবে না, আমি তোকাজ না থাকলেই আপনার বাসায় যাই।
হ্যাঁ, রিমাও তোমাকে খুব পছন্দ করে।

সেদিন রিমা স্কুল থেকে ফিরে অনেকটা অভিমানের সুরে বলেছিল, বাবা আমার এক বন্ধু আছে ওর বাবা ওকে প্রায় আনতে যায়, চকলেট কিনে দেয়, তুমি তো আমাকে একদিনও আনতে যাও না, আমার খুব খারাপ লাগে।
মন খারাপ করো না মা, আমি যে চাকরি করি, তোমার স্কুল আর আমার অফিস যে একই সময়ে।
বাবা আজ তো শনিবার তোমার অফিস বন্ধ ছিল তুমি গেলে না কেন?
ফিরোজের দু’চোখ দিয়ে কয়েকফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়েছিল। সে রিমাকে কোলে নিয়ে অনেক আদর করেছিল।
তারপর থেকে প্রতি শনিবার ফিরোজ স্কুল থেকে রিমাকে আনতে যেতে।
ফিরোজ একবার মোবাইলের ঘড়িতে সময় দেখল, রাত এগারোটা বাজে।
সে ডাঃ হায়দারকে মোবাইল করল, হ্যালো, হায়দার।
ফিরোজ কেমন আছিস্‌ এখন?
দোস্ত ভালো থাকলে তো তোকে ডিসটার্ব করি না।
ডিসটার্বের কথা বলছিস্‌ কেন? আমি কি তোর সঙ্গে কমার্শিয়াল আচরণ করি?
না দোস্ত, মন ভালো নেই তো তাই তোকে কী বলতে কী বলে ফেললাম? হায়দার আমরা প্রাইমারীতে যারা একসঙ্গে লেখাপড়া করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি তাদের মধ্যে বোধ হয় আমাকে আগে যেতে হচ্ছে?
ফিরোজ এভাবে ভাবছিস্‌ কেন? তোকে তাহলে একটা গল্প বলি, শোন।
বাঃ দেশের শীর্ষস্থানীয় অন্তত দশজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মধ্যে তুই একজন আর তোর কি না সময় আছে একজন রোগীকে গল্প শোনাবার, ঠিক আছে বল।

আমি যে ক্লিনিকে প্র্যাকটিস্‌ করি সেই ক্লিনিকে একবার এক পেশেণ্ট এসেছিলেন কিডনি ডায়োলাইসিস্‌ করতে। কয়েকদিন ঢাকায় থাকার পর একদিন ডাক্তারকে ডায়োলাইসিস্‌ করার মেশিনের দাম জিজ্ঞেস করলেন।
ডাক্তার মেশিনের দাম বলার পর তিনি একটা মেশিন কিনে তাঁর শহরের বাসার নিচতলায় স্থাপন করলেন এবং ডাক্তার তাঁর বাসায় গিয়ে সময়মতো ডায়োলাইসিস্‌ করে আসতেন। বেশ ভালোই যাচ্ছিল তাঁর শারীরিক অবস্থা। তারপর তিনি একদিন মাইক্রোবাস নিয়ে তাঁর গ্রামের বাড়িতে চাষ-আবাদ দেখতে গেলেন, ফেরার পথে তিনি সড়ক দূর্ঘটনায় মারা গেলেন।
হায়দার তুই আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিস? আমার যে অসুখ হয়েছে সে অসুখে না মরে আমি অন্য অসুখেও মরে যেতে পারি?
এক্সাক্টলি।
আচ্ছা হায়দার আমি কি আর বেশিদিন বাঁচবো না, না মানে আমি বলছিলাম আমাকে কত তাড়াতাড়ি সবকিছু গুছাতে হবে?
ফিরোজ এভাবে জানতে চাচ্ছিস কেন? জীবনের সব ভালো কাজই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গুছাতে হয়।
হায়দার ডাক্তারদের সবচেয়ে আগে হতে হয় একজন ভালো মনোবিজ্ঞানী, তারপর ডাক্তার। ভলো মনোবিজ্ঞানী না হলে কেউ বড় ডাক্তার হতে পারে না। আসলে আমি এখন বুঝতে পাচ্ছি কেন তুই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাম করেছিস।
থ্যাংক ইউ দোস্ত, এখন ঘুমানোর চেষ্টা কর।


চলবে….

আলোকিত প্রতিদিন/৩১ মে’১৯/জেডএন

এই সংবাদ ২৩৭ বার পঠিত।
ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন