খুঁজে ফিরি তারে (পর্ব-০২) । জিল্লুর রহমান

উপন্যাস

খুঁজে ফিরি তারে

জিল্লুর রহমান

(পর্ব-০২)

রাতের খাবারের পর ফিরোজকে কয়েকটা ঔষধ খেতে হয়, এমনিতেই ফিরোজের কোনদিন ঔষধ খেতে ভুল হয় না তারপরও প্রতিদিন সকাল এবং রাতের খাবারের পর তার বাবার প্রেসক্রিপশন আর ঔষধের ঝুড়িটা নিয়ে রিমা তার বাবার সামনে আসে, রাতের ঔষধ খাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করে, বাবা দুপুরে ঠিক মতো ঔষধ খেয়েছো তো?
ফিরোজ বলে, হ্যাঁ রে মা খেয়েছি, আচ্ছা তুই বলতো আমি কি কোনদিন কোন কাজ করতে ভুলে গেছি? আমার কি সবকিছু ভুলে যাবার মতো বয়স হয়েছে?
সরি বাবা তোমাকে আসলে এত বুড়ো ভাবা আমার ঠিক হয়নি।
রিমা ফিরোজকে প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সব ঔষধগুলো খাওয়ানোর পর তার বাবার পাশে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল, বাবা তুমি তো প্রতিদিন এতগুলো করে ঔষধ খাও, তোমার আসলে অসুখটা কী?
ফিরোজ একটা শুষ্ক হাসি হেসে বলল, অসুখের কথা কি ডাক্তাররা কখনো বলে রে মা, শুধু বলে ঔষধ খান ঠিক হয়ে যাবেন আর আমরা বেঁচে থাকার আশায়, সুস্থ থাকার আশায় ঔষধ খাই।
রিমা আর কোন কথা বলল না। কয়েকমুহূর্ত বসে রইল তারপর জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা বাবা আমি তো এখন বড় হয়েছি, তাই না?
ফিরোজ রিমার মুখের দিকে তাকালো, হঠাৎ করে বড় হয়েছিস বললি কেন বলো তো?
বাবা তুমি কিন্তু আমাকে কিছু নিয়ম শিখিয়েছো কারো প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন করতে হয় না, আগে উত্তর দিতে হয়।
ও তাই তো, বলে ফিরোজ আবার রিমার মুখের দিকে তাকালো, হ্যাঁ মা তুই তো বড় হয়ে গেছিস, আমি খেয়ালই করিনি। আমি তোর প্রশ্নের উত্তর দিলাম এখন আমাকে বল তো তুই হঠাৎ করে বড় হওয়ার কথা বললি কেন? তুই কোথাও প্রেম-ট্রেম করছিস্‌ নাকি?
বাবা আমি প্রেম করলে তুমি অবশ্যই জানবে, আমি তো সবার আগে তোমাকে বলবো, তুমি আমার ভাল বন্ধু না?
তবে?
বাবা আমার তো এইচ.এস.সি পরীক্ষা শেষ হলো।
হ্যাঁ।
আমি কোথায় ভর্তি হবো?
তোর যেখানে পছন্দ, যেখানে তুই ভর্তির সুযোগ পাবি সেখানেই ভর্তি হবি।
বাবা!
হ্যাঁ বল।
তোমাকে কে দেখবে বাবা? বলতে বলতে রিমার চোখ থেকে পানি ছিট্‌কে পড়ল।
ফিরোজ রিমার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল, তোর কী হয়েছে রে মা? হঠাৎ করে তোর মনটা খারাপ হয়ে গেল কেন?
রিমা চোখ মুছলো।
ফিরোজ বলল, পৃথিবীতে কাউকে কারো দেখতে হয় না মা, আর নিজের চলার পথে শুধু সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয় কখনো পিছু ফিরে তাকাতে হয় না।
বাবা তুমি কিন্তু স্ববিরোধীকথা বলছো।
যেমন?
বাবা মা মারা যাওয়ার পর তুমি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখলে কেন? তুমি আবার বিয়ে করে সামনের দিকে এগিয়ে গেলে না কেন?
ফিরোজ রিমার কথার কোন জবাব দিল না।
রিমা তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
ফিরোজ বলল, রিমা তুই আসলে খুব বড় হয়ে গেছিস মা।
বাবা তুমি আমাকে শৈশব থেকে স্বপ্নদেখিয়েছো অনেক বড় হওয়ার, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কিন্তু তুমি একটা কথা খেয়াল রাখো বাবা আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না, তোমাকে একা ফেলে গিয়ে লেখাপড়া শিখে অনেক বড় হওয়ার মতো স্বার্থপরআমি কোনদিন হবো না।
রিমা একটু আগেই বললাম তুই বড় হয়েছিস, এখন মনে হচ্ছে তুই আসলে ছোটই আছিস।
না আমি এখন বড় হয়েছি, অনেক বড় হয়েছি, আমি এখন সবকিছু বুঝি বাবা।
তুই আসলে কী বলতে চাচ্ছিস? বলতো?
বাবা তুমি আমার জন্য অনেক করেছো, আসলে আমি বুঝিনি কথাটা তোমাকে আমার আরো আগে বলা উচিত ছিল।
এত চিন্তা করছিস্‌ কেন? আমি তো তোর ভাল বন্ধু যা বল্‌বি কোন রকমের ভনিতা ছাড়াই সোজা বলে দিবি?
বাবা মা যখন আমাকে রেখে মারা গেল আসলে তখনই তোমার বিয়ে করা উচিত ছিল, তখন না হয় আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বিয়ে করলে না এখন তো আমি বড় হয়েছি, এখন তুমি একটা বিয়ে করো।
ফিরোজ হো হো করে হেসে উঠলো, তুই আমাকে হাসালি, আমার বয়স কত জানিস?
হ্যাঁ, পঁয়তাল্লিশ বছর।
পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে কেউ বিয়ে করে?
হ্যাঁ এটা তো স্বাভাবিক।
ফিরোজ রিমার দিকে রাগান্বিতি চোখে তাকালো।
রিমা বলল, বাবা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সঙ্গীর প্রয়োজন, মানুষ একা বাঁচতে পারে না। তাছাড়া তোমার বয়স বাড়ছে, তুমি এক সময় বার্ধক্যে ভুগবে তখন কে তোমার দেখাশুনা করবে? তুমিই বলো?
আচ্ছা তুই বলতো এখন মানুষের গড় আয়ু ক’বছর?
পঁয়ষট্টি বছর।
আমার বয়স এখন পঁয়তাল্লিশ বছর, মানুষের গড় আয়ু অনুযায়ী আমি আর চৌদ্দ বছর বাঁচবো আবার যে কোন সময় মরেও যেতে পারি। সঙ্গী বলতে তুই যা বলছিস সেই সঙ্গী ছাড়াই আমি কত বছর কাটালাম জানিস?
আগে কত বছর কাটানো আর বার্ধক্যে কয়েকদিন কাটানোর মধ্যে অনেক তফাৎ বাবা।
আচ্ছা যাক ওসব কথা, তুই এডমিশন টেস্টের জন্য পড়ছিস তো?
রিমা রেগে গেল, বাবা তুমি কিন্তু প্রসঙ্গ পাল্টাচ্ছো, এটা আমি একেবারে পছন্দ করি না। কীসের আমার লেখাপড়া? কীসের প্রতিষ্ঠিত হওয়া? যে বাবা প্রায় দেড় যুগ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের জীবনের সবকিছু উৎসর্গ করতে পারে তাকে ছেড়ে আমি যাবো লেখাপড়া করে প্রতিষ্ঠিত হতে, না? বাবা তোমার বিয়ের পর আমি এডমিশন টেস্টের ফরম তুলতে যাবো, তার আগে আমি এক পা নড়বো না। আমার জিদ সম্পর্কে তুমি খুব ভালো করেই জানো আমি কিন্তু অনঢ়।
ফিরোজ রিমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, যা মা রাত হয়েছে, ঘুমাতে যা।
আমি ঘুমাতে যাচ্ছি, কাল সকালে আবার আলাপ হবে। তুমি প্রসঙ্গ পাল্টাবে না, আমি কিন্তু কাল থেকেই মাঠে নামবো।
রিমা, বাবা মেয়েকে বিয়ে দেয়, কোন মেয়ে বাবাকে বিয়ে দেয় না।
সেটা আমি বুঝবো, থ্যাংক ইউ বাবা, গুড নাইট, বলে রিমা ফিরোজকে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বেরিয়ে গেল।
ফিরোজ একটা শুষ্ক হাসি হাসলো, পাগলি মা আমার।

সেদিনের মেয়ে রিমা, আজ বাবাকে শাসন করছে।
তখন ফিরোজের পোস্টিং ছিল নীলফামারী জেলায়। তার স্ত্রী প্রমী তখন সন্তান সম্ভবা। প্রমীর ডেলিভারির তারিখ অতিক্রম করার পরও ডেলিভারি না হওয়ায় ফিরোজ দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছিল। ফিরোজের বন্ধু-বান্ধবরা ঘন ঘন খবর নিচ্ছিল। একদিন গভীর রাতে প্রমীর প্রসব বেদনা শুরু হলো। বাসায় প্রমী, ফিরোজের মা আর ফিরোজ, এত রাতে কাকে ডাকবে? কী করবে? ফিরোজ নিচতলায় বাড়িওয়ালার বাসায় দরজায় নক করলো।বাড়িওয়ালা তো ফিরোজকে দেখে অবাক, ফিরোজ সাহেব এত রাতে? কোন সমস্যা?
আপনার টেলিফোনটা ঠিক আছে?
হ্যাঁ, কোথায় ফোন করবেন বলুন?
আমার স্ত্রী অসুস্থ, হাসপাতালে ফোন করতে হবে।
ভদ্র লোক খুব আন্তরিক ছিলেন। তিনি নিজে বাড়ির নাম ঠিকানা বলে হাসপাতাল থেকে এ্যাম্বুলেন্স আনিয়েছিলেন।
প্রমীর ডেলিভারির তারিখ-এর কয়েকদিন আগেই ফিরোজ তার মাকে এনেছিল। প্রমীর ভাল-মন্দগুলো তিনিই দেখতেন।
নীলফামারী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তার ভালভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন, সরি ফিরোজ সাহেব পেশেন্টের অবস্থা ভালো না, রিস্ক নেয়া ঠিক হবে না, আপনি রংপুরে নিয়ে যান।
ফিরোজ হাসপাতালের টেলিফোন থেকেই তার শ্বশুরবাড়ি দিনাজাপুরে টেলিফোন করেছিল।
রাতেই প্রমীকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল। গাড়ি যখন হাসপাতালে পৌঁছেছিল তখন ভোর পাঁচটা।
প্রচণ্ড ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে প্রমী একবার চোখ মেলে তাকিয়েছিল, তুমি একটু আমার পাশে বসো।
ফিরোজ প্রমীর পাশে বসেছিল।
আমি বোধ হয় আর বাঁচবো না। কয়েক বছরের সংসার জীবনে তুমি আমার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করেছো, আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। আসলে আমি খুব জেদি আর অহংকারী ছিলাম, অনেক সময় খুব ছোট-খাট কারণে  তোমার সঙ্গে খুব দুর্ব্যবহার করেছি, আমি যদি মরে যাই তবে আমাকে মাফ করে দিও।
ফিরোজ কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল, তুমি খুব জেদি আর অহংকারী বলেই আমি তোমাকে পেয়েছি। আমি তোমাকে মরতে দিবো না প্রমী। আমি তোমাদের বাড়িতে টেলিফোন করেছি, হয়তো সকাল হতে হতেই আব্বা-আম্মা, ভাবী সবাই চলে আসবে।
তুমি আমাদের বাড়িতে টেলিফোন করলে কেন?
ফিরোজ বলেছিল, প্রমী বিপদের সময় প্রিয়জনদের কাছে ডাকতে হয়, সবাই এলে তুমি মনোবল পাবে, সাহস পাবে।
তুমি দেখ কেউ আসবে না, আমার বাবাকে তো আমি চিনি, আমার চেয়ে তাঁর কাছে আভিজাত্যে আর অহংকারের দাম অনেক বেশি।
ফিরোজ প্রমীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিল, কথা বলো না প্রমী, আমার দায়িত্ব আমি পালন করেছি তাঁরা না এলে সেটা তাঁদের ব্যাপার।
প্রমীকে ও.টি’তে নিয়ে যাওয়ার পর ফিরোজ করিডোরে পায়চারি করছিল। তার মনের মধ্যে তখন অসংখ্য চিন্তা ভিড় করছিল। প্রমী ছাড়া তার জীবন অচল, এখন সে মধ্য বয়সী মানুষ, চলার পথ এখনো অনেকদূর বাকি। সত্যি সত্যি যদি প্রমীর কিছু হয় তবে সে কী নিয়ে বাঁচবেন?
কয়েক ঘণ্টা পর ডাক্তাররা ও.টি থেকে মলিনমুখে বেরিয়ে এসেছিলেন, ফিরোজ সাহেব আপনার মেয়ে হয়েছে।
প্রমী?
সরি ফিরোজ সাহেব, আপনার স্ত্রীকে বাঁচানো সম্ভব হলো না।
খবরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ফিরোজ কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল। সত্যি সত্যি সে আজ একা হয়ে গেল। প্রমী আজ তাকে ছেড়ে গেল। এখন জীবনের বাকি দিনগুলো একটি ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে তাকে কাটাতে হবে। সে এই ছোট্ট মেয়েকে কীভাবে মানুষ করবে, প্রমী তুমি চলে গেলে শুধু তোমার স্মৃতি হিসেবে মেয়েকে রেখে গেলে এখন আমি কী করব? একদিনের বাচ্চা রিমাকে কীভাবে লালন-পালন করবে একথা ভেবে ফিরোজের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল।
প্রমী বেঁচে থাকতে তার বাবা-মা কিংবা পরিবারের অন্য কেউ ফিরোজ কিংবা প্রমী কারো সঙ্গে যোগাযোগ করেনি কিন্তু সকালবেলা হাসপাতালে এসে প্রমী মারা যাওয়ার খবর শুনে তাঁরা ফিরোজকে দোষারোপ করেছিল। ফিরোজের শ্বশুর একবার মামলা করারও হুমকি দিয়েছিলেন কিন্তু তাঁর শাশুড়ি এবং অন্যান্যআত্মীয়-স্বজনরাতাঁকে  বুঝিয়ে শান্ত করেছিলেন।
প্রমী মারা যাওয়ার পর ফিরোজের মা তার বাসায় ছিলেন। তিনি প্রায় প্রায় ফিরোজকে বিয়ে করতে বলতেন ফিরোজ মলিন হেসে বলতো, মা আমার রিমাকে কি তোমার বোঝা মনে হচ্ছে?
না, নিজের নাতনিকে বোঝা মনে হবে কেন? আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন তো কোন অসুবিধা নেই কিন্তু তারপর? একদিন তো আমি চলে যাবো তখন রিমাকে কে দেখবে আর তোর নিজের কথা একবার ভেবে দেখ, তোর বয়সও তো কম, বাকি জীবনটা কি একাই কাটাবি?
আমার কথা তুমি বাদ দাও মা, আর রিমার কথা বলছো, তুমি যতদিন বেঁচে আছো ততদিন তুমি দেখ, তারপর আমি দেখব। তুমি দেখ হয়তো তারপর আর আমার মেয়েকে দেখতেই হবে না, ও নিজেই নিজেকে দেখবে, আমার মেয়ে না?
তার মা-ই রিমাকে লালন-পালন করেছে।
ফিরোজ, তাঁর মা আর রিমা এই তিন সদস্যের সংসার তাদের মন্দ চলছিল না। সুঃখ-দুঃখ সবকিছু তারা সমানভাবে ভাগ করে নিত।
ফিরোজের মা যখন মারা যায় তখন রিমার বয়স বারো বছর তারপর থেকে রিমা সত্যি সত্যি নিজেই নিজেকে দেখেছে।
সেদিনের সেই একদিনের বাচ্চাই আজকের রিমা। এই রিমা-ই ফিরোজের সব। বন্ধুর মতো সম্পর্ক তাদের দু’জনের মধ্যে। রিমার কলেজ, কোচিং এবং টুকটাক রান্নার কাজ শেষ করে দু’জনে একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে প্রায় দিনই বাপ-মেয়ে চুটিয়ে আড্ডা দেয়।

(চলবে…)

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন