টাঙ্গাইলে চলতি মাসে পালকিশোরীসহ ৬ জনকে ধর্ষণ

সুমন ঘোষ, সিনিয়র রিপোর্টার : টাঙ্গাইলে সম্প্রতি পাঁচ উপজেলায় পাকিস্তানি কিশোরীসহ ৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। সেইসাথে ৩ উপজেলায় ৩ জন ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টা ও ২ জনকে শ্লীলতাহানীর অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে দায়েরকৃত মামলায় পুলিশ অধিকাংশ অভিযুক্তদের আটক করেছে। সম্প্রতি ধর্ষণের এই ঘটনাগুলো সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন সুশীল সমাজ। তবে ভূক্তভোগীরা বলছেন যথাযথ বিচার হলে এই ধরণের ঘটনা কমে যেত।

জানা যায়, জেলার গোপালপুরে নানার বাড়ি বেড়াতে আসা চাচাতো ভাই কর্তৃক এক পাকিস্তানি কিশোরী (১৭) অপহরণ ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ওই কিশোরীর মা গত ১৭ এপ্রিল বাদী হয়েছেন থানায় মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ ধর্ষকের মা আনোয়ারা বেগমকে গ্রেফতার ও অপহৃত পাকিস্তানী কিশোরীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। এ ঘটনার মূল আসামি উত্তর গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেনের বখাটে ছেলে ধর্ষক আলামিন পলাতক রয়েছে।

গোপালপুরে সিনেমায় নায়িকা বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে কলেজ ছাত্রীকে (১৯) আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ফারুক শিকদার ওরফে আকাশকে আটক করেছে পুলিশ। সে ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার মাইটকুমরা গ্রামের কাইয়ুম শিকদারের ছেলে। এ ঘটনায় ১৪ এপ্রিল রাতে গোপালপুরের ভোলারপাড়া গ্রাম থেকে ছাত্রীকে উদ্ধার করে ধর্ষককে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে দেয় এলাকাবাসী। পরদিন মেয়ের বাবা বাদি হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন।

সখীপুরে প্রেমিকের সামনে প্রেমিকাকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ধর্ষণের প্রধান আসামী সাদ্দাম (২৭) কে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব সদস্যরা। গত ৫ এপ্রিল ভোরে টাঙ্গাইল নতুন বাসস্ট্যান্ড থেকে তাকে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন টাঙ্গাইল র‌্যাব-১২ সিপিসি-৩ এর কোম্পানী কমান্ডার শফিকুর রহমান।

টাঙ্গাইল শহরে ১২ এপ্রিল নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকার ডিসি লেকসহ বিভিন্নস্থানে নিয়ে স্বামীকে আটকে রেখে পোশাক শ্রমিক স্ত্রীকে গণধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় রাতেই ধর্ষিতা স্বামী বাদী হয়ে টাঙ্গাইল মডেল থানা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ৮ জন আসামীর মধ্যে ৬ জনকে আটক করেছে। ৬ জনের মধ্যে ৩ জন স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দিয়েছে। অন্য ৩ জনকে রিমান্ড শেষে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।

নাগরপুরে ১৪ এপ্রিল প্রেমিকাকে বৈশাখী মেলায় বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে কৌশলে বন্ধুর বাড়িতে নিয়ে এক ছাত্রীকে (১৬) ধর্ষণ করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ধর্ষণকারী ও ধর্ষণে সহযোগিতাকারীকে স্থানীয়দের সহযোগিতায় আটক করে পুলিশ। অভিযুক্তরা হলো উপজেলার বেকড়া গ্রামের মৃত আব্দুর রউফের ছেলে মোবারক হোসেন (২০) ও তার সহযোগি একই উপজেলার চৌবাড়িয়া গ্রামের মৃত আব্দুল মিয়ার ছেলে রাজিব মিয়া কালু (২২)। পরে ধর্ষিতার বাবা বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন।

কালিহাতী পৌরসভার উত্তর বেতডোবায় ধর্ষণের শিকার হয়ে ৯ মাসের অন্ত:সত্বা সপ্তম শ্রেণির এক হিন্দু ছাত্রী। পরে গ্রাম্য সালিশে ওই ছাত্রীকে গ্রামছাড়া করা হয়। বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমে এলে ধর্ষিতার মা বাদী হয়ে চলতি মাসে কালিহাতী থানায় মামলা দায়ের করেন।

এদিকে কালিহাতীর এলেঙ্গাতে তৃতীয় শ্রেণির মাদ্রাসা ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। ২৩ এপ্রিল এ বিষয়ে কালিহাতী থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। হোটেল ব্যবসায়ী মাহবুব হোসেনের ছেলে অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এছাড়া কালিহাতীর নারান্দিয়ায় চতুর্থ শ্রেণির এক হিন্দু ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে থানায় মামলা হয়েছে। ঘটনার দেড় মাস অতিবাহিত হলেও ফরমান আলীর ছেলে আসামী বখাটে রাসেল মিয়াকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

দেলদুয়ারে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনায় থানায় মামলা করেছেন ওই ছাত্রীর মা। উপজেলার কোপাখি গ্রামের সেলিম মিয়ার ছেলে অভিযুক্ত কাইয়ুম পাখির বাসা দেখানোর কথা বলে ছাত্রীটিকে বাগানে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে। পুলিশ আসামীকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি।

ভূঞাপুরে গত ১ এপ্রিল দুপুরে উপজেলার গাবসারা ইউনিয়নে বাসুদেবকোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীকে কুপ্রস্তাব ও শরীরে আপত্তিকর স্থানে হাত দেয়ার অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় ৭ এপ্রিল দুপুরে ওই শিক্ষার্থী প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর অভিযোগ এবং শিক্ষার্থীর পরিবার থেকে ভূঞাপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

ভূঞাপুরে মেয়েদের উত্ত্যক্ত ও শরীরে বডি স্প্রে দেওয়ার অপরাধে পাঁচ ইভটিজারকে অর্থদণ্ড ও অনাদায়ে কারাদন্ড প্রদান করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্যাট ঝোটন চন্দ।

এসব বিষয়ে কথা হয়, বঙ্গের আলীগড় খ্যাত টাঙ্গাইলের সরকারি সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর শহীদুজ্জামান মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, সামাজিক মূলবোধ ও নৈতিকতার অবক্ষয়ের জন্যই ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। সেইসাথে মাদক ও ইন্টারনেটের কু-ব্যবহার বৃহৎভাবে দায়ী। এতে আমাদের প্রজন্ম ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এখন থেকেই যথাযথ পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশিক্ষার প্রয়োজন। বিচার ব্যবস্থায় পরিবর্তনও দরকার। এই ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে সমাজের সকলকে সচেতন ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ধর্ষণ বর্তমানে একটি ভয়াবহ ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। ঘটনা ঘটার অনেক পরে এ সংক্রান্ত মামলা রজু হয়। তাই অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও টাঙ্গাইলে সম্প্রতি যেসকল ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে আমরা অধিকাংশ মামলার আসামীদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। আসামীরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। অভিযুক্ত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

আলোকিত প্রতিদিন/২৪ এপ্রিল/আরএ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন