ব্যাংকে ১২ শতাংশ নারী কর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। শিক্ষার হারেও নারী-পুরুষ প্রায় সমান সমান। সরকারি চাকরিতে নারীর অংশগ্রহণও ছাড়িয়েছে ২৫ শতাংশ। পিছিয়ে নেই ব্যাংক খাতও। এ খাতে নারীর অংশগ্রহণ কম থাকলেও ধীরে ধীরে ব্যাংকে নারী কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। দেশে বর্তমানে ২২ হাজারেরও বেশি নারী ব্যাংক খাতে চাকরি করছেন। যদিও এ খাতে উচ্চপদে অর্থাৎ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে নারী এখনো হাতে গোনা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব বলছে, ব্যাংক খাতে যত লোক কাজ করে, তার প্রায় ১২ শতাংশ নারী। ২০১৭ সাল শেষে ব্যাংক খাতে কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার ২৭ জন। এর মধ্যে ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ অর্থাৎ ২২ হাজার ৫৩ জন নারী। তবে ২০১৮ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে নারী কর্মীর হার কিছুটা কমে ১২ দশমিক ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনায় নিলে এ খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা আরও বাড়বে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে কর্মরত ৫১ হাজার ৪৮৩ জনের মধ্যে উচ্চপর্যায়ে রয়েছে ৯ শতাংশ নারী। এ ছাড়া মধ্যম পর্যায়ে রয়েছে ১৫ শতাংশ এবং প্রারম্ভিক পর্যায়ে রয়েছে ১৩ শতাংশ নারী। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এবং তার ওপরের পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে নারী মাত্র ৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ২৫৫ জন। এর মধ্যে উচ্চপর্যায়ে নারী রয়েছেন ৬ শতাংশ, মধ্যম পর্যায়ে ১৪ শতাংশ ও প্রারম্ভিক পর্যায়ে ১৮ শতাংশ। শতাংশের হিসাবে ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি নারী কাজ করেন অবশ্য বিদেশি ব্যাংকগুলোতে। এসব ব্যাংকে প্রারম্ভিক পর্যায়ে নারী রয়েছেন ২৫ দশমিক ২৪ শতাংশ, মধ্যবর্তী পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং উচ্চপর্যায়ে ১৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।

২০ বছর ধরে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে প্রচুর নারী কর্মী যোগ দিচ্ছেন। অনেকে দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা নিয়েও যোগ দিচ্ছেন ব্যাংকে। এ কারণে বেসরকারি ব্যাংকে মধ্যম ও উচ্চপর্যায়ে উল্লেখযোগ্য নারী কর্মী রয়েছেন। যদিও বেশির ভাগ নারী কর্মীদেরই নারী উদ্যোক্তা, মানবসম্পদ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোক্তা (এসএমই)—এসব বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এদিকে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদেও নারীর অংশগ্রহণ কর্মীদের মতোই। তবে এ ক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে নারী পরিচালকের হার একটু বেশি—১৮ শতাংশ। আর বেসরকারি ব্যাংকে পরিচালকদের মধ্যে ১৩ শতাংশ নারী। সরকারি ব্যাংকে সরকারই পরিচালক নিয়োগ দিয়ে থাকে। নারী উদ্যোক্তা, সাবেক নারী ব্যাংকার এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মচারীদের সরকারি ব্যাংকে পরিচালক পদে নিয়োগ দেয় সরকার। আর বেসরকারি ব্যাংকে মূলত পরিচালকদের স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রবধূরা ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে আছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, রাষ্ট্র খাতের ব্যাংকগুলোর নারী কর্মীদের মধ্যে বছরে ১ শতাংশ কর্মসংস্থান বদল করে। আর বেসরকারি ব্যাংকে এ হার ৭ শতাংশ। অবশ্য দেশের প্রতিটি ব্যাংকেই ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর করেছে। নারী ব্যাংককর্মীদের জন্য ২৬টি ব্যাংকের নিজস্ব পরিবহনব্যবস্থা রয়েছে বলে জানা গেছে। ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, পড়ালেখা শেষ করে ব্যাংকগুলোতে প্রচুর নারী কর্মী যোগদান করলেও পরে তাঁদের অনেকে চাকরি ছাড়ছেন। মূলত কাজের চাপ, সন্তান লালন-পালন ও পরিবারের সদস্যদের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে এসব নারী ব্যাংকার মধ্যপর্যায়ে এসে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন।

খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের ৫৯টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১টি ব্যাংকের এমডি পদে আছেন একজন নারী। তা–ও সরকারি খাতের ব্যাংকে। কৃষি ব্যাংকের ডিএমডি থেকে পদোন্নতি পেয়ে এক বছর ধরে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের এমডির দায়িত্বে রয়েছেন মাহ্তাব জাবিন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উচ্চ পদে অংশগ্রহণ কম হলেও ব্যাংক খাতে নারীর সংখ্যা বাড়ছে।

তবে উচ্চ পদে পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে নারীর যোগ্যতাকে হেয় করে দেখা না হলেও পুরুষদেরই বেশি যোগ্য মনে করা হয়। এই সামাজিক পরিস্থিতির কারণে ব্যাংক খাতে উচ্চ পদে পুরুষ কর্মীরা এগিয়ে আছেন।’ তাই উচ্চ পদে যেতে নারীদের নিজেদের লড়াইয়ের পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক সমর্থনও দরকার বলে মনে করেন মাহ্তাব জাবিন।

ব্যাংক খাতে বর্তমানে পাঁচটি ব্যাংকে এএমডি (অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক) ও ডিএমডি (উপব্যবস্থাপনা পরিচালক) পদে নারী রয়েছেন। এর মধ্যে বেসরকারি এবি ব্যাংকের ডিএমডি হিসেবে কাজ করছেন শামসিয়া আই মুতাসিম, মেঘনা ব্যাংকে এএমডি পদে রয়েছেন জোহরা বিবি, ওয়ান ব্যাংকের অতিরিক্ত ডিএমডি পদে আছেন রোজিনা আলিয়া আহমেদ, সিটি ব্যাংকের ডিএমডি পদে আছেন মাহিয়া জুনায়েদ প্রমুখ।

জানতে চাইলে এবি ব্যাংকের ডিএমডি শামসিয়া আই মুতাসিম বলেন, ‘আমি মনে করি না যে ব্যাংকে নারী-পুরুষ বলে আলাদা কিছু থাকা উচিত। মূল কথা হচ্ছে দায়িত্ব এবং দায়িত্ব পালনে নারীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গাটা তুলনামূলক বেশি থাকে।’

সরাসরি ব্যাংকের এমডি না হলেও গৃহঋণের একমাত্র সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনে (বিএইচবিএফসি) এযাবৎ তিনজন নারী এমডির দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের ডিএমডি থেকে পদোন্নতি পেয়ে বিএইচবিএফসির এমডি হয়েছিলেন রায়হানা আনিসা য়ুসুফ আলী। আফরোজা গুল নাহার এই সংস্থার এমডি হয়েছিলেন জনতা ব্যাংকের ডিএমডি থেকে পদোন্নতি পেয়ে। দুজনই এখন বেসিক ব্যাংকের পরিচালক। এ ছাড়া বিএইচবিএফসির ডিএমডি দৌলতুন্নাহার খানম চারবার সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব পালন করেন।

আলোকিত প্রতিদিন/১০ মার্চ/আরএ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন