অনেক ফুলে গাঁথা যে জয়ের মালা

ক্রীড়া ডেস্ক: অনেকেই বলতে পারেন আফগানিস্তানের বিপক্ষে জয়, এ আর এমন কী! উল্টো ম্যাচটা কঠিন করে জেতার অভিযোগ আনতে পারেন ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে। কিন্তু কাল আবুধাবির জয়টি নিছক কেবল এক জয় নয়, এই জয়ে বাংলাদেশের অর্জন অনেক। অনেক প্রশ্নেরও জবাব এই জয়। যে জয়ের মালা গাঁথা অনেক ফুলেই। মাশরাফি, সাকিব, মাহমুদউল্লাহ, ইমরুল, মোস্তাফিজ—এঁরাই যেন একেকটি ফুল

সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদউল্লাহর কথা শুনে মনে হচ্ছিল, ড্রেসিংরুমে ফিরে ম্যান অব দ্য ম্যাচের ট্রফিটা না মোস্তাফিজুর রহমানকে দিয়ে দেন! জয়ের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে মোস্তাফিজ, ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট বলতে গিয়ে মোস্তাফিজের ওই শেষ ওভার…মাহমুদউল্লাহর কথায় বারবার ফিরে আসছেন বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার।

যেভাবে ম্যাচটা শেষ হয়েছে, তাতে এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে মাহমুদউল্লাহ যখন কথা বলছেন, তখন ম্যাচ শেষ হয়েছে মিনিট পনেরোও হয়নি। এই ম্যাচের বাকি সব ছাপিয়ে তখন চূড়ান্ত সত্যি হয়ে থাকছে মোস্তাফিজের ওই শেষ ওভার। হাতে ৪ উইকেট নিয়ে আফগানিস্তানের চাই মাত্র ৮ রান। মাত্রই তো! মাহমুদউল্লাহ যেমন বললেন, ‘এই যুগে ৬ বলে ৮ রান কোনো ব্যাপার না।’

সেটিকেই মোস্তাফিজ এমন গুরুতর ব্যাপার করে তুললেন যে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মাশরাফি বিন মুর্তজা তাঁর প্রিয় ‘মোস্তা’কে ‘ম্যাজিশিয়ান’-এর স্বীকৃতি দিয়ে ফেললেন। মোস্তাফিজুরের ওই একটি ওভারের তাৎপর্য শুধুই একটি ম্যাচ জয়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না। যদিও সেই জয়টাও কম মহার্ঘ নয়। টানা দুই ম্যাচে বিধ্বস্ত হওয়ার পর উদ্‌ভ্রান্ত মনে হওয়া বাংলাদেশ দলের জন্য রীতিমতো কোরামিন ইনজেকশন।

একই সঙ্গে এই জয় আরও তিনটি কাজ করল—
১. শেষ ওভারের ভয় জয়: এশিয়া কাপে শেষ ওভারের দুঃস্বপ্ন বললেই ২০১২-এর ফাইনালের কথা মনে পড়ে। সেটি তো প্রায় সাড়ে ছয় বছর আগের কথা। সাম্প্রতিক অতীতে বেশ কয়েকবারই বাংলাদেশের জন্য হতাশার প্রতিশব্দ হয়ে থেকেছে শেষ ওভার। কখনো–বা নিজেরা ব্যাটিং করার সময় সহজ মনে হওয়া কাজটা করতে পারেনি। কখনো–বা নিজেদের বোলিংয়ে প্রতিপক্ষের জন্য আপাত-অসম্ভব লক্ষ্যও অর্জিত হতে দেখেছে। হারতে হারতে মনস্তাত্ত্বিক বাধায় পরিণত শেষ ওভারের ভয়টা দূর করা গেল!

২. আফগানিস্তান ও রশিদ-জুজু: বাংলাদেশ ম্যাচটা খেলতে নেমেছিল মাত্র দুদিন আগে আফগানিস্তানের কাছে শোচনীয় হারের দগদগে ক্ষত নিয়ে। সেই ম্যাচের পর রশিদ খান এমন এক মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন যে মনে হচ্ছিল, এই লেগ স্পিনারকে খেলা বোধ হয় সম্ভবই নয়। আফগানিস্তান ও রশিদ খান দুটিই জয় করা গেল একসঙ্গে। নাকি এই দুটির মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে!

৩. এশিয়া কাপে টিকে থাকা: সর্বশেষ তিনটি এশিয়া কাপের দুটিরই ফাইনাল খেলেছে বাংলাদেশ। তিনটিই নিজেদের দেশে, আরও নির্দিষ্ট করে বললে ঘরের মাঠ মিরপুরে খেলতে পারাটা অবশ্যই ভূমিকা রেখেছে এই সাফল্যে। দেশের বাইরে প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপের ফাইনালে খেলার সম্ভাবনা-দুয়ার খুলে দিল এই জয়। পাকিস্তানকে হারালেই ফাইনাল। আগামী পরশুর ম্যাচটিকে অলিখিত সেমিফাইনাল বানিয়ে ফেলে টুর্নামেন্ট নিয়ে আগ্রহটাও বাঁচিয়ে রাখল বাংলাদেশ।

একটি জয়ে এত কিছু! সেটি তো আর কারও একার কৃতিত্বে আসেনি। এটা তো বলার অপেক্ষা রাখা না যে শেষ ওভারে মোস্তাফিজ ওই বোলিংটা না করলে আগে কে কী করেছেন, তাতে আর কিছু আসত–যেত না। আবার আগে ওসব না হলে মোস্তাফিজের কাজটা আরও কঠিন হয়ে যেত। কে জানে, হয়তো শেষ ওভারের ওই উত্তেজনার দেখাই পেত না এই ম্যাচ।

বাংলাদেশের ব্যাটিং থেকে শুরু করুন। ৮৭ রানে ৫ উইকেট পড়ে যাওয়ার পরই তো এই ম্যাচ হেলে পড়েছিল আফগানিস্তানের দিকে। ইমরুল আর মাহমুদউল্লাহর ওই জুটি না হলে কি আর জিতত বাংলাদেশ! বোলিংয়েও মোস্তাফিজ ছাড়া এমন আরও নায়কের দেখা মিলবে। মাশরাফির প্রথম সাড়ে ৬ ওভারে কোনো উইকেট নেই। রানও দিয়ে ফেলেছেন ৩৮। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তুলে নিলেন এদিন আফগানিস্তান ইনিংসের আসল দুটি উইকেট। আসগর আফগান ও হাসমতউল্লাহর জুটিটা জমে গিয়েছিল। হিসাবি, গোছানো, ঠান্ডা মাথার ব্যাটিং করে ম্যাচটাকে বের করে নিচ্ছিলেন দুজন। দুজনকেই ফিরিয়েছেন মাশরাফি।

সাকিবের কথাই–বা ভুলে যাবেন কীভাবে! ৪৯তম ওভারের দ্বিতীয় বলেই ছক্কা খেয়েছেন মোহাম্মদ নবীর ব্যাটে। রশিদ খানের আবির্ভাব অনেককে ভুলিয়ে দিয়েছে যে এই নবীই ছিলেন আফগান ক্রিকেটের পোস্টার বয়। এদিনও যেভাবে ব্যাটিং করছিলেন, তাতে আর কয়েকটা বল উইকেটে থাকলে মোস্তাফিজেরও বোধ হয় কিছু করার থাকত না। ছক্কা খাওয়ার পরের বলেই সাকিব তাঁকে শুধু ফিরিয়েই দিলেন না, পরের তিনটি বলে দিলেন মাত্র ৪ রান।

মোস্তাফিজ শেষ কাজটা করেছেন। তবে এর আগে আরও অনেকেই রেখেছেন অবদান। এভাবেই তো হয়। অনেক ফুল গেঁথেই তো মালা হয়। এখানে যেটি জয়ের মালা!

আলোকিত প্রতিদিন/২৪ সেপ্টেম্বর/আরএ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন