গৃহকর্মীর বেতনের হিসাব দিতে হবে সরকারকে

গৃহস্থালির কাজে সহায়তার জন্য অনেকে বাসায় গৃহকর্মী রাখেন। মাস শেষে তাঁদের বেতন দেন। এখন সেই খরচের চিত্রও বার্ষিক আয়কর বিবরণীতে দেখাতে হবে। এ ছাড়া আপনার বাসায় যদি ডিশলাইনের সংযোগ থাকে এবং তার জন্য মাস শেষে যে বিল দেন, সেটাও দেখাতে হবে আয়কর বিবরণীতে। এমনকি আপনি মাস শেষে ময়লা অপসারণের জন্য যে বিল দেন, সেটাও আয়কর বিবরণীতে খরচ হিসেবে দেখাতে হবে। আবার বাড়িভাড়া, গাড়িচালকের বেতন, জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতের খরচও দেখাতে হবে। সার্বিকভাবে আপনার জীবনযাত্রা কেমন, এর চিত্র তুলে ধরতে হবে আয়কর বিবরণীতে। এর মাধ্যমে আপনি কতটা ধনী, কত আয় করেন আর কত অর্থ খরচ করেন, সেটা দেখতে চায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আপনার বৈধ আয়ের সঙ্গে আপনার জীবনযাত্রার মিল আছে কি না, তা মিলিয়ে দেখতে চান কর কর্মকর্তারা।

গত জুলাই থেকে বার্ষিক আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন দেওয়ার সময় শুরু হয়ে গেছে। চলবে আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। ২০১৭ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এক বছরে জীবনযাপনে কত টাকা খরচ করলেন, তা রিটার্নের সঙ্গে এনবিআরকে বিস্তারিত জানাতে হবে। আপনি যদি চাকরিজীবী হন, ব্যবসা করেন বা অন্য খাত থেকে আপনার আয় বছরে তিন লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে আপনাকে নতুন ফরম পূরণ করে জীবনযাত্রার চিত্র তুলে ধরতে হবে। সেখানে গৃহকর্মীর বেতন-ভাতা থেকে শুরু করে ডিশলাইনের বিলের কথাও উল্লেখ করতে হবে।

এবার আসি জীবনযাত্রার ফরমে কী কী দেখাতে হবে। সেখানে সঠিকভাবে খরচ দেখানোই ভালো। তাতে কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না আপনাকে। প্রথমেই আসি বাড়িভাড়ায়। ফরমের আবাসন ঘরে আপনি যদি ভাড়া বাসায় থাকেন, সেটা লিখতে হবে। বছরে কত টাকা ভাড়া দেন, তা জানাতে হবে। এমনকি নিজের বা পৈতৃক বাড়ি থাকলেও বলতে হবে। এরপর বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কত হয়েছে, তা লিখতে হবে। এখন শহুরে মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারেও গাড়ি আছে। এই গাড়ির চালক থাকলে কত বেতন দেওয়া হয়; জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কত, তা জানাতে হবে।

বাড়িওয়ালা-ভাড়াটেনির্বিশেষে সবাইকে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল দিতে হয়। আবার বাড়ির বর্জ্য অপসারণের জন্যও মাস শেষে বিল বাবদ টাকা দিতে হয়। এসবও জীবনযাত্রার ব্যয়ের খরচে দেখাতে হবে।

এ দেশে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেকেই নামীদামি স্কুলে পড়ান। আবার অনেকে বৈধভাবে যা আয় করেন, তা দিয়ে নামীদামি স্কুলে পড়ানোর খরচ মেটাতে পারেন না। কিন্তু ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অনেকেই অবৈধভাবে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। অথচ বার্ষিক আয়কর বিবরণীতে তা দেখাতে পারেন না। যাঁরা সন্তানদের দামি স্কুলে পড়াশোনা করান, তাঁদের জন্য দুঃসংবাদ। সন্তানদের পড়াশোনার খরচও জীবনযাত্রায় দেখাতে হবে।

এবার আসি বিনোদনে খাতের খরচে। আপনি সামাজিক বা পারিবারিক উৎসবের আয়োজন করেছেন। বিশাল আয়োজন, শত শত মানুষকে খাইয়েছেন। লাখ লাখ টাকা খরচ করেছেন। এই টাকার হিসাব কিন্তু এনবিআরকে জানাতে হবে। এমনকি কাউকে কোনো উপহার দিলেও খরচ দেখাতে হবে। অনেকেই প্রতিবছর স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে দেশে-বিদেশে ঘুরতে যান। অনেক টাকা খরচ করেন। এই টাকার হিসাবও জানতে চায় এনবিআর। কোনো মানবিক সহায়তা ও অনুদান দিলে সেটিও দেখাতে হবে। এমনকি কোথায় চিকিৎসা করেছেন, কত টাকা খরচ হয়েছে, সেটাও জীবনযাত্রার বিবরণীতে লিখতে হবে।

সম্পদের হিসাবও দিতে হবে
খরচ তো গেল, এবার আপনার সম্পদ কত আছে, সেটার পাই পাই হিসাব দিতে হবে। আপনার একটি গাড়ি আছে। সন্তানদের স্কুলে আনা-নেওয়া, নিজের অফিস আসা-যাওয়া এবং পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য গাড়ি কিনেছেন। আপনি কি জানেন এই গাড়ির থাকার কারণে কর অফিসে জমা দিতে প্রতিবছর আলাদা একটি সম্পদ বিবরণী ফরম পূরণ করতে হবে? রিটার্ন জমার সময় এই ফরম পূরণ করতে হবে। শুধু তা-ই নয়, ফ্ল্যাট বা বাড়ি থাকলেও আপনার সম্পদ বিবরণী জমা বাধ্যতামূলক। এতে বাড়ি-গাড়িওয়ালাদের সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের চিত্র পাওয়া যাবে।

এসব সম্পদ না থাকলেও আপনার মোট সম্পদের পরিমাণ যদি ২৫ লাখ টাকার বেশি হয়, তবু আপনাকে সম্পদ বিবরণী দিতে হবে। আপনার স্বামী বা স্ত্রী কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান ও নির্ভরশীল ব্যক্তি করদাতা না হলে তাঁদের সম্পদ ও দায় আপনার সম্পদ বিবরণীতে দেখাতে হবে। এর মানে হলো স্ত্রী, স্বামী, সন্তানের নামে বাড়ি-গাড়ি, গয়নাসহ বিভিন্ন সম্পদ দেখিয়ে নিজের সম্পদ লুকানোর সুযোগ নেই।

সম্পদ বিবরণীর মাধ্যমে করদাতা কতটা ধনসম্পদের মালিক, তা বোঝা যায়। তবে সব সম্পদেই যে আয় হবে, তা নয়। যেমন নিজের বাড়ি থাকলে ভাড়া না দিয়ে নিজে বাস করেন, এ ধরনের বাড়ি থেকে কোনো আয় আসে না। ব্যবসায় পুঁজি, কৃষি সম্পত্তি, আর্থিক সম্পদ, গাড়ি, গয়না, আসবাব, নগদ টাকা, ঋণ ইত্যাদির আর্থিক মূল্যের তথ্য সম্পদ বিবরণীতে দিতে হয়। এক বা একাধিক গাড়ি থাকলে ব্র্যান্ড, ইঞ্জিন (সিসি), রেজিস্ট্রেশন নম্বরসহ ক্রয়মূল্য উল্লেখ করতে হবে। গাড়ি পরিবারের সদস্যদের নামে থাকলেও তা সম্পদ বিবরণীতে দেখাতে হবে।

বাড়ির আসবাব-গয়নাও একধরনের সম্পদ। এগুলো প্রতিবছর বার্ষিক আয়কর বিবরণীর সম্পদে দেখাতে হয়। নতুন ফ্রিজ-টেলিভিশন কিনলে তা পরের বছর সম্পদ বিবরণীতে থাকতে হবে।

 

আলোকিত প্রতিদিন/২৩ সেপ্টেম্বর/আরএ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন