প্রতারণায় বিশেষ মাত্রা যোগ করতে আশুলিয়া মডেল টাউনে অবৈধ গ্যাস সংযোগ লিজকৃত জমি বেদখল দিতে চলছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড

  • হাইকোর্ট থেকে দেয়া আদেশের সাইনবোর্ড ভাংচুর
  • সিকিউরিটির নামে ক্যাডারবাহিনী দিয়ে চলছে ভূমিদস্যুতা
  • প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চান ভুক্তভোগীরা


ঢাকার সাভারে একদিকে চলছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণের অভিযান অন্যদিকে অবৈধভাবে সংযোগ টেনে নতুন সংযোগ টেনে প্রতারণার ফাঁদ পাততে ব্যস্ত আশুলিয়া মডেল টাউন। অনুমতি ছাড়াই তিতাসের নাকের ডগা দিয়ে দিনে-দুপুরে এই অবৈধ সংযোগ টানা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ‘গ্যাস সংযোগ নিতে পারলে আবাসন প্রকল্পের নামে পরিচালিত আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের যাদুকরি প্রতারণায় বিশেষ মাত্রা যোগ হবে’ বলে মনে করছেন প্রতারিতরা। তাদের মতে ‘হাইকোর্টের নিদের্শ অমান্যকারী’ ও ‘জামায়াত-শিবিরের পৃষ্ঠপোষক’ খ্যাত এই গ্রুপটিতে এখনই থামানো না হলে তাদের ভূমিদস্যুতা দিনকে দিন বেড়েই চলবে। এদিকে, গ্রুপটির বিরুদ্ধে আঙুল তুলে ভিটে মাটি ছেড়তে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। অন্যদিকে একটি জাতীয় দৈনিকের পোনে চার একর জমি জবর দখলের জন্য সাংবাদিকদের উপর চড়াও, ভাংচুর ও হুমকি-ধামকির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সাভার বিরুলিয়ায় অবস্থিত আশুলিয়া মডেল টাউনে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেয়ার কাজ চলছে। রাস্তার পাশ খুড়ে পাইপ টানা হচ্ছে। খাগান বাজারের গ্যাসের মেইন লাইন থেকে এই অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে আশুলিয়া মডেল টাউনের দিকে নেয়া হচ্ছে। কাজ চলাকালীন আশেপাশে ঘুরতে দেখা গেছে বেশ কিছু দালালচক্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, ‘টাকা ও খুঁটির জোরে আমিন মোহম্মাদ গ্রুপ এসব কাজ করছে। আর দালালরা লুটে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে লোক ঠকানোর ফন্দি আরকি।

এলাকাবাসী জানান, ‘গ্যাস সংযোগ পেলে আশুলিয়া মডেল টাউন তাদের যাদুকরি প্রতারণা আরও ভালোভাবে করতে পারবে। এর আগে সংবাদপত্রে তাদের অবৈধ কার্যকলাপ ফুটে উঠলে গ্রাহকদের আনাগোনা কমে গিয়েছিলো। গ্যাস সংযোগ পেলে তারা গ্রাহকদের সামনে অনেকটাই বৈধতা দেখাতে পারবে তারা। ফলে প্রতারণা, দস্যুতায় নতুন মাত্রা যোগ হবে।

তারা বলেন, ‘এমনিতেই দিনে গ্যাসের গতি থাকে না। তারপর আবার অবৈধ সংযোগ। বুঝতেই পারছেন আমাদের অবস্থা।’ এবিষয়ে সাভার তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী সিদ্দিকুর রহমান জানান, বৈধ গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও অবৈধ সংযোগের সংখ্যা কমাতে তাদের এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আশুলিয়ার সব অবৈধ গ্যাসলাইন পর্যায়ক্রমে বিচ্ছিন্ন করা হবে। বিরুলিয়া অঞ্চল আমাদের আওতাধীন হলে আগামীকাল বা পোরশু আমরা ওই অঞ্চলে অভিযান চালাবো।’ ‘শক্তিধর অবৈধ গ্রাহক’ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অবৈধতা থাকলে তার কোনো শক্তিই শক্তিশালী হতে পারে না। কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।

এদিকে সাভারের বিরুলিয়ার খাগান, হেমায়েতপুরসহ বেশ কিছু অঞ্চল জুড়ে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের বিরুদ্ধে গ্রাহক প্রতারণারও অভিযোগ পাওয়া যায়। এমনকি আশুলিয়া মডেল টাউনের নামে এসব অঞ্চলে লিজকৃত সরকারি খাস জমির মালিককে হটিয়ে সেই জমির উপরেই বসিয়ে দেয়া হয়েছে অবৈধ সাইনবোর্ড। দখলে থাকা লিজকৃত জমি বেদখল দেয়ার চেষ্টাও করছে তারা। এসবের বিরুদ্ধে ‘আঙুল তুললেই দেয়া হচ্ছে প্রাণনাশের হুমকি’।

শুধু জবর-দখলই না, হাইকোর্টের নিদের্শকেও মানছেন না তারা। রয়েছে সাভারের বিরুলিয়ার খাগান, হেমায়েতপুরসহ বেশ কিছু অঞ্চল জুড়ে রয়েছে গ্রাহক প্রতারণারও অভিযোগ। এমনকি আশুলিয়া মডেল টাউনের নামে এসব অঞ্চলে লিজকৃত সরকারি খাস জমির মালিককে হটিয়ে সেই জমির উপরেই বসিয়ে দেয়া হয়েছে অবৈধ সাইনবোর্ড। দখলে থাকা লিজকৃত জমি বেদখল দেয়ার চেষ্টাও করছে তারা। জমির বৈধতা না থাকায় তাদের কাছ থেকে কেনা জমি ক্রেতাকে বুঝিয়ে দিতে পারছেন না। দিনের পর দিন ঘুরে জমির কাগজপত্র না পেয়ে টাকা ফেরৎ চাইতে গেলে নানাভাবে হুমকি ধামকি দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভূক্তভোগীরা। এরই মধ্যে ভাড়াটে ও পোষা সন্ত্রাসী ক্যাডার বাহিনীর ভয়ে অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে বলেও জানা যায়।

সরকারি খাসজমির লিজপ্রাপ্ত ভুক্তভোগীদের অনেকে নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ‘বহুবার অভিযোগ করেও প্রশাসনের কোনো সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ আশুলিয়া মডেল টাউনের মধ্যে সরকারি খাস জমিও এই গ্রুপটি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে এবং পোষা সন্ত্রাসীদের দিয়ে সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ এক সূত্র থেকে জানা যায়, আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির নিকট ৪ একর সরকারি জমি জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি করেছে।

আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের কাছ থেকে প্রায় আট বছর আগে জমি কিনেছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মালেক জোমাদ্দার। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আশুলিয়া মডেল টাউনের জমি কিনে যারপর নাই প্রতারণার শিকার হয়েছি। এখন তারা আমার জমির দখল এবং দলিল বুঝিয়ে দেবে বলে ২০১০ সাল থেকে বিভিন্ন তালবাহানা করে কালক্ষেপন করছেন।’

মুক্তিযোদ্ধা গোলাম রসুল জানান, ২০১৩ সালে সরকারের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ৬ একর খাস জমির লিজ গ্রহণ করি কিন্তু আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ ওই জমিতে কাউকেই প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। প্রভাবশালী মন্ত্রীদের নিকট সহযোগিতার জন্য গিয়েও এর কুলকিনারা করতে পারছি না। তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৃত বিচারে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ টাকার জোরে দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলছে। আসলে তাদের খুঁটির জোর কোথায়?’

দৈনিক আলোকিত প্রতিদিনের স্টাফ রিপোর্টার শহিদুল্লাহ সরকার বলেন, ‘গতকালও নূরুল হুদা গং এর জমিতে খুঁটি গাড়তে গেলে আমিসহ এপত্রিকার সাভার প্রতিনিধি আলী হোসেন ও সিকিউরিটিদের উপর আশুলিয়া মডেল টাউনের সিকিউরিটির পোশাকধারী সন্ত্রাসীরা চড়াও হয়। এর আগে তো সাংবাদিকদের প্রাণে মেরে ফেলতে গিয়েছিলো তারা। এবিষয়ে পত্রিকার পক্ষ থেকে জিডি করা হয়।’

এদিকে, ‘জিডি তুলে নিতে আশুলিয়া মডেল টাউনের পোষা সন্ত্রাসীরা হুমকি ধামকি দিতে থাকলে’ রোববার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবর জিডি করে দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি করেছেন দৈনিক আলোকিত প্রতিদিনের সম্পাদক ও প্রকাশক সৈয়দ নুরুল হুদা রনো। জিডিতে বলা হয়েছে, ‘সাভার থানার খাগান মৌজার সি,এস খতিয়ান নং-১, চুড়ান্ত প্রকাশিত বি.এস খতিয়ান নং-৩, সি.এস দাগ নং-১৪৪, চুড়ান্ত প্রকাশিত বি.এস দাগ নং-৯১১, ৯১২, ৯৩২, ৯৩৩, ৯৩৪, ৯৩৫, ৯৩৬, ৯৩৭, ৯৩৯, ৯৪০, সি.এস দাগ নং-১৪৮, বি.এস দাগ নং-৯৪০, ৯৪১, ৯৪২, ৯৪৩, ৯৪৪, ৯৪৫, সি.এস দাগ নং-১৪২, চুড়ান্ত প্রকাশিত বি.এস দাগ নং-৮৯০, ৮৯১, ৮৯২, ৮৯৩, ৮৯৪, ৮৯৫, ৮৯৬, ৮৯৭, ৮৯৮, ৮৯৯, ৯০০, ৯০১, ৯০২, ৯০৩, ৯০৪, ৯০৫, ৯০৬, ১১১১, ১১১২, ১১১৪, ১১১৫, ১১১৬, ১১১৭, ১১১৮, ১১১৯, ১১২০, ১১২১, ১১২২, ১১২৩ দাগের কাতে ৩.৭৫ একর সম্পত্তির বৈধ মালিক গণপ্রজান্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ভূমি মন্ত্রণালয়, ভূমি সংষ্কার বোর্ড, কোর্ড অব ওয়ার্ডস ঢাকা নওয়াব স্টেটের উল্লেখিত দাগের সব সম্পত্তি, সি.এস, এস.এস, আর.এস ও বি.এস রেকর্ড অনুযায়ী সরকার মালিক। প্রকৃত মালিক সরকারের কাছ থেকে তিনিসহ পত্রিকার সাংবাদিক ও আনুসঙ্গিক লোকজন উল্লেখিত দাগের ০৩.৭৫ একর জমি দখলের ভিত্তিতে লীজ গ্রহণ করেন। লীজ প্রাপ্তির পর থেকে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের পক্ষে আশুলিয়া মডেল টাউনে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বন বিভাগের অসাধু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী দ্বারা বিভিন্ন প্রকার হয়রানীর স্বীকার হয়ে এবছর অগস্টের ৬ তারিখে হাইকোর্টে ডিভিশনে রিট পিটিশন করি। যার নম্বও ১১০৮২ অফ ২০১৮। এতে হাইকোর্ট আমরা লীজ গ্রহিতাগণের পক্ষে ডিরেকশন প্রদান করেন। মহামান্য হাইকোর্টের আদেশ প্রাপ্ত হইয়া বিজ্ঞ আইনজীবীগণ উক্ত জমিতে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড উত্তোলন করেন। এসময় সংবাদের কাজে দায়িত্ব পালন করতে গেলে আমাদের পত্রিকার মফস্বল সম্পাদক জাকারিয়া নূরী, ক্রাইম রিপোর্টার আলমগীর হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি আজাদ হোসেন, ক্রীড়া সম্পাদক সাব্বির আলম এবং স্টাফ রিপোর্টার শহিদুল্লাহ সরকারের উপরে আশুলিয়া মডেল টাউনের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসীবাহিনী লেলিয়ে দেয়া হয়। সরকারি ভূমির অবৈধ দখলদার আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের এমডি এমএম এনামুল হক, মার্কেটিং ম্যানেজার তেলোয়াত হোসেন, আশুলিয়া মডেল টাউনের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল হালিম, সিকিউরিটি ইনচার্জ মতিউর রহমান, সিকিউরিটি ম্যানেজার ৫০-৫৫ জন সিকিউরিটির পোশাকধারী সন্ত্রাসীবাহিনী দেশীয় অস্ত্র-সস্ত্রসহ আমাদের পত্রিকার সাংবাদিকদের ঘেরাও করে ফেলে। একপর্যায়ে সাব্বির আলমের হাত থেকে ক্যামেরা এবং আলমগীর হোসেনের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। আমাদের সাংবাদিকদের ছবি ধারণকৃত ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়। এসময় সাংবাদিকগণ প্রাণে বাঁচতে দৌড়ে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি রোডে দৈনিক আলোকিত প্রতিদিনের খাগানে অবস্থিত শাখা অফিসে (সরকার বাড়ি) আশ্রয় নেন। ওই সময় এলাকার অনেক লোকজন জড়ো হয়ে আমাদের পত্রিকার সাংবাদিকদের প্রাণে রক্ষা করার ব্যবস্থা করেন। আমাদের সাংবাদিকদের মারার জন্য দৈনিক আলোকিত প্রতিদিনের লোহার গেইট ধরে ধাক্কাধাক্কি করে তালা ভেঙ্গে হামলা চালাবার প্রচেষ্টা চালায়। এসময় তারা সাংবাদিকদেরকে বলে, ‘আবার আসিস তাহলে তোদেরকে প্রাণে মেরে ফেলবো।’

পরে সাংবাদিকরা পুলিশ হেডকোয়ার্টার, র‌্যাব হেডকোয়ার্টার, ওসি-সাভার এর নিকট ফোন দিলে সাভার-ওসি সাংবাদিকদের প্রাণে রক্ষা করেন। ওসি সাভার এর সহযোগিতায় সাংবাদিকগণ প্রাণে রক্ষা পেলেও গায়ের জোরে মহামান্য হাইকোর্টের আদেশ সম্বলিত সাইনবোর্ড অবৈধভাবে তুলে নিয়ে ভাংচুর করে। ফেরার পথে তারা বলে, ‘তোদের যদি এই এলাকায় আবার দেখি তাহলে মেরে লাশ গুম করে ফেলবো।’ এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে দৈনিক আলোকিত প্রতিদিনের খাগানের শাখা অফিসের কর্মরত সাংবাদিকদেরকে বিভিন্নভাবে উত্তক্ত করে। এতে সাংবাদিক ও অফিস সিকিউরিটিগণ নিরাপত্তাহীনতায় এবং আতংকের মধ্যে আছেন।’

আলোকিত প্রতিদিন/১৭ সেপ্টেম্বর/আরএ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন