অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে  সুফল মিলেছে প্রবাসীদের আয়ে

বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম খাত প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স টানা দুই অর্থবছর পর আবারও বেড়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এক হাজার ৪৯৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতে এসেছে ১৩১ কোটি ৭০ লাখ ডলার। গত বছরের একই মাসের তুলনায় যা ১৮ শতাংশ বেশি। সংশ্নিষ্টরা মনে করছেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হুন্ডি ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে রেমিট্যান্স বাড়ছে। ডলার এবং জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিও রেমিট্যান্স বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, হুন্ডি প্রতিরোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মান বেড়েছে। ব্যাংকগুলোও ডলার সংগ্রহে তৎপরতা বাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে রেমিট্যান্স বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে সব পক্ষকে তৎপর থাকতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধির ধারা দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকার পর ছন্দপতন ঘটে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে। আগের অর্থবছরের তুলনায় রেমিট্যান্স তখন ২৪ কোটি ডলার বা এক দশমিক ৬৫ শতাংশ কমে এক হাজার ৪২৩ কোটি ডলারে নেমে আসে। অবশ্য পরের অর্থবছরে তা আবার বাড়ে। সেবার এক হাজার ৫৩১ কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসে। দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে যা ছিল সর্বোচ্চ। তবে পরের দুই অর্থবছর রেমিট্যান্স ব্যাপক কমে যায়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ৩৮ কোটি ৫৭ লাখ ডলার বা দুই দশমিক ৫২ শতাংশ কমে এক হাজার ৪৯৩ কোটি ডলারে নেমে আসে। পরের বছর আরও ১৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে দাঁড়ায় এক হাজার ২৭৭ কোটি ডলারে।

এ অবস্থায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উদ্যোগী হয়। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হুন্ডির ফলে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো কমছে। দীর্ঘদিন ধরে ডলারও স্থিতিশীল থাকছে। এ অবস্থায় হুন্ডি ঠেকাতে তৎপরতা বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশে ও দেশের বাইরে পরিদর্শন করে পাওয়া অনিয়মের আলোকে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে হুন্ডি ঠেকাতে মানি লন্ডারিং আইনের শক্ত প্রয়োগ করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। দেশের বাইরে কেউ যেন বাংলাদেশি মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের নামে সাইনবোর্ড টানিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতে না পারে, সে জন্য বিভিন্ন দূতাবাসে চিঠি দেওয়া হয়। একই সময়ে দেশের সর্ববৃহৎ মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশের বেশ কিছু এজেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়। অন্য মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে এরকম কোনো লেনদেন হচ্ছে কি-না, তা-ও কঠোরভাবে তদারকি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দৈনিক লেনদেন সীমা কমানোসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স বাড়লেও আমদানি যে হারে বাড়ছে, রফতানি বাড়ছে সে তুলনায় কম। এতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে এক ধরনের বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বাজার সামলাতে গত অর্থবছর বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ২৩১ কোটি ডলার বিক্রি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাজারের টানাটানির ফলে এক দিকে ডলারের দাম বাড়ছে। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বরং কমে আসছে। এ অবস্থায় রেমিট্যান্স না বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আমদানিতে ২৫ দশমিক ৫২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও রফতানি বেড়েছে ছয় শতাংশের কম। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ৩২ দশমিক শূন্য পাঁচ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। গত ৩০ জুনও যা ৩৩ বিলিয়ন ডলারের ওপরে ছিল। গত বছরের ২২ জুন দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে বর্তমানে প্রতি ডলার ৮৩ টাকা ৭৫ পয়সা দরে বিক্রি হচ্ছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রতি ডলারে তিন টাকা পাঁচ পয়সা বা তিন দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়েছে। একজন প্রবাসী ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠিয়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রতি ডলারে চার থেকে পাঁচ টাকা বেশি পাচ্ছেন। বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে রেমিট্যান্স বাড়াতে না পারলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতো বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা।

আলোকিত প্রতিদিন/১৭ সেপ্টেম্বর/আরএ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন