লিজকৃত জমি বেদখল দেয়ার চেষ্টা করছে আশুলিয়া মডেল টাউন

হাইকোর্ট থেকে দেয়া আদেশের সাইনবোর্ড ভাংচুর

তুষার আহসান ও জাকারিয়া নূরী: আবাসন প্রকল্পের নামে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের জবর-দখল থেমে নেই। হাইকোর্টের নিদের্শকেও মানছে না তারা। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে রাজধানী সংলগ্ন বিভিন্ন স্থানে এই গ্রুপ ভূমি দস্যুতায় মেতে উঠেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। শুধু ভূমি দস্যুতাই নয়, সাভারের বিরুলিয়ার খাগান, হেমায়েতপুরসহ বেশ কিছু অঞ্চল জুড়ে রয়েছে গ্রাহক প্রতারণারও অভিযোগ। এমনকি আশুলিয়া মডেল টাউনের নামে এসব অঞ্চলে লিজকৃত সরকারি খাস জমির মালিককে হটিয়ে সেই জমির উপরেই বসিয়ে দেয়া হয়েছে অবৈধ সাইনবোর্ড। দখলে থাকা লিজকৃত জমি বেদখল দেয়ার চেষ্টাও করছে তারা। এসবের বিরুদ্ধে ‘আঙুল তুললেই দেয়া হচ্ছে প্রাণনাশের হুমকি’।

রাজধানী সংলগ্ন বিরুলিয়া ও আশুলিয়ার নবাব এস্টেট, জলাধার ও পানি নিষ্কাশন পথ দখল নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ‘আশুলিয়া মডেল টাউন’ প্রকল্প। বাস্তবে এ প্রকল্পের কোনো অনুমোদন না থাকলেও চলছে বেচাবিক্রি। প্রকল্পের লে-আউট নকশায় বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে প্রকল্পের সীমানা দেখালেও তার অধিকাংশই দখলকৃত। যার মধ্যে সরকারি জমি ছাড়াও ব্যক্তি মালিকানার বিপুল পরিমাণ জমি। ফলে জমি কিনেও দখল বুঝে পাচ্ছেন না প্রতারণার ফাঁদে পা দেয়া ক্রেতারা। টাকা ফেরৎ চাইতে গেলে নানাভাবে হুমকি ধামকি দেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ভাড়াটে ও পোষা সন্ত্রাসী ক্যাডার বাহিনীর ভয়ে অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে বলেও জানা যায়। সম্প্রতি আলোকিত প্রতিদিনের তথ্যানুসন্ধানে প্রতারণার এসব তথ্য সামনে আসে।

সরকারি খাসজমির লিজপ্রাপ্ত ভুক্তভোগীদের অনেকে নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ‘বহুবার অভিযোগ করেও প্রশাসনের কোনো সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ আশুলিয়া মডেল টাউনের মধ্যে সরকারি খাস জমিও এই গ্রুপটি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে এবং পোষা সন্ত্রাসীদের দিয়ে সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

এক সূত্র থেকে জানা যায়, আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির নিকট ৪ একর সরকারি জমি জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি করেছে।

আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের কাছ থেকে প্রায় আট বছর আগে জমি কিনেছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মালেক জোমাদ্দার। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আশুলিয়া মডেল টাউনের জমি কিনে যারপর নাই প্রতারণার শিকার হয়েছি। এখন তারা আমার জমির দখল এবং দলিল বুঝিয়ে দেবে বলে ২০১০ সাল থেকে বিভিন্ন তালবাহানা করে কালক্ষেপন করছেন।’

মুক্তিযোদ্ধা গোলাম রসুল জানান, ২০১৩ সালে সরকারের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ৬ একর খাস জমির লিজ গ্রহণ করি কিন্তু আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ ওই জমিতে কাউকেই প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। প্রভাবশালী মন্ত্রীদের নিকট সহযোগিতার জন্য গিয়েও এর কুলকিনারা করতে পারছি না।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৃত বিচারে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ টাকার জোরে দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলছে। আসলে তাদের খুঁটির জোর কোথায়?’

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, পৃথক পৃথক আবেদনের প্রেক্ষিতে ভ‚মি মন্ত্রণালয়ের ভূমি সংস্কার বোর্ড কর্তৃক মোট পৌনে চার (৩.৭৫) একর জমি লিজ গ্রহণ করে সৈয়দ নুরুল হুদা গং। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লি. মতিঝিল কর্পোরেট শাখার পে-অর্ডারের মাধ্যমে টাকা জমা দিয়ে ভূমি সংস্কার বোর্ডের কাছ থেকে এই লিজ পান তারা। কিন্তু পালিত ক্যাডার দিয়ে এই গং এর সদস্যদের জমিতে প্রবেশে বারবার বাঁধা প্রদানসহ জীবন নাশের হুমকি দেয় আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ। পরে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ এবং বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী দ্বারা বিভিন্ন প্রকার হয়রানীর স্বীকার হয়ে ওই জমি নিয়ে সৈয়দ নুরুল হুদা মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনে রিট পিটিশন দায়ের করেন। এই গং-এর সদস্যদের কয়েকজন জানান, মহামান্য হাইকোর্ট ‘প্রকৃত লিজধারী ব্যতীত অন্য কারো প্রবেশাধিকার নিষেধ’ মর্মে নির্দেশ দেন। নিদের্শনা পেয়ে আইনজীবীরা ওই জমিতে মহামান্য হাইকোর্টের সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তির সাইন বোর্ড উত্তোলনের জন্য যান। এসময় সেখানে আলোকিত প্রতিদিনের চার সাংবাদিক সংবাদ উপস্থিত হলে সরকারি ভূমির অবৈধ দখলদার আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের ক্যাডার বাহিনীরা অস্ত্রশস্ত্রসহ ওই সাংবাদিকদের ধাওয়া করে। এবিষয়ে দৈনিক আলোকিত প্রতিদিনের মফস্বল সম্পাদক জাকারিয়া নূরী সাভার মডেল থানায় জিডি করেন। আগস্টেও ২১ তারিখে করা এই ডিডির নম্বর ১১৬২।

জিডিতে বলা হয়, ‘এমএম এনামুল হক, মার্কেটিং ম্যানেজার তেলাওয়াত হোসেন এবং আশুলিয়া মডেল টাউনের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার আব্দুল হালিমের প্রত্যক্ষ নির্দেশে সিকিউরিটি ইনচার্জ মতিউর, ম্যানেজার জামানসহ ৫০/৫৫ জন সিকিউরিটি দেশিয় অস্ত্রশস্ত্রসহ সাংবাদিকদের ঘেরাও করে। এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের কাছ থেকে ক্যামেরা এবং মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় তারা। আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের সিকিউরিটিদের হাত থেকে সাংবাদিকরা প্রাণে বেঁচে দৌড়ে স্থানীয় জনগণের সহায়তায় ডেফোডিল ইউনিভার্সিটি রোডে শহীদুল্লাহ সরকারের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। বাড়ির ভেতরে প্রবেশের পরেও সিকিউরিটিরা সাংবাদিকদের মারার জন্য লোহার গেট ধরে ধাক্কা-ধাক্কি, তালা ভেঙ্গে হামলা চালাবার প্রচেষ্টা চালায়। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। পরে সাংবাদিকরা সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সহায়তায় প্রাণে বেঁচে ফিরে আসেন।’ জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা সুজায়েত হোসেন এবিষয়ে জানান, ঘটনাটি বিরুলিয়া অঞ্চলের। ওই অঞ্চলের তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন এসআই তরিকুল। তিনি বিষয়টা বলতে পারবেন।

এই ঘটনার বেশ কয়েক মাস আগে একই এলাকায় সরেজমিন গেলে প্রতিষ্ঠিত একটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিকদেরকেও বাঁধা প্রদান ও হুমকি দেয়া হয়। এমনকি এলাকার কারও সাথে কথা বলতে গেলে চড়াও হয় সন্ত্রসী বাহিনী।

এদিকে খাগান মৌজায় শহিদুল্লাহ সরকার গং এর জমি জবর দখলের চেষ্টা চলছে বলে এক জিডিতে উল্লেখ করেন শহিদুল্লাহ সরকার। এ বছর ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখে সাভার থানায় করা এই জিডির নম্বর ১০৩৪। শহিদুল্লাহ সরকার জানান, আশুলিয়া মডেল টাউনের মালিক আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের সিকিউরিটি বাহিনী বিভিন্ন সময়ে তাদেরকে হুমকি ধামকি দিচ্ছে।’ এবিষয়ে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তিনি। জিডির অগ্রগতি সম্বন্ধে বিরুলিয়ায় দায়িত্বরত তখনকার কর্মকর্তা এসআই তরিকুল ইসলাম জানান, যেহেতু আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের কাগজপত্র আমি দেখিনি। তাই জমি দখলের বিষয়টি আমার কাছে সুস্পষ্ট নয়। তবে এই বিষয়টি কোর্টের। কোর্টের মাধ্যমে তদন্তের নির্দেশ পেলে তদন্ত শুরু হতে পারে।

আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ মিজান গং নামে আরও ৮০ শতাংশ জমিও কেড়ে নিতে পায়তারা করছে বলে জানিয়েছেন লিজ সূত্রে পাওয়া এই জমির মালিকেরা। অনেকের মতে, বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের উত্থান। গ্রুপের চেয়ারম্যান এনামুল হক মৃধা এখনও এই দু’টি রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতা করছে বলেও বিশেষ সূত্র থেকে জানা যায়। এমনকি তিনি বর্তমান সরকার পতনের জন্য গোপনে অত্যান্ত সু-কৌশলে জামায়াতকে অর্থনৈতিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতাও করে থাকেন বলে জানিয়েছেন অনেকে। সূত্র মতে, মদদ পাওয়ায় এই দলগুলোর পেশাদার ক্যাডারবাহিনী সিকিউরিটি সেজে আমিন গ্রুপকেও মদদ দিয়ে আসছে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের সহকারী পরিচালক (ভূমি) বলেন, ‘ওই অঞ্চলের জমির বিষয়ে তথ্য আমাদের কর্মকর্তা গাজী আহম্মদ উল্লাহ দিতে পারবেন।’

গাজী আহম্মদ উল্লাহ জমি জবর দখলের বিষয়টি বানোয়াট উল্লেখ করে বলেন, ‘দীর্ঘকাল ধরে আমাদের গ্রুপটি সুনামের সাথে কাজ করে আসছে। আমাদের সাথে শত্রুতা করে কেউ এমন অভিযোগ করে থাকবে।’

এসব বিষয়ে সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল আওয়াল বলেন, ‘আমি চার-পাঁচদিন হয় এই থানায় যোগদান করেছি। তাই বিষয়গুলো জেনে ব্যবস্থা নেবো।’

 

 

আলোকিত প্রতিদিন/১১সেপ্টেম্বর/আরএইচ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন