‘আলোকিত প্রতিদিন’ এর ১ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং প্রাসঙ্গিক কথা

জাকারিয়া নূরী: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের আগে এই উপমহাদেশে সংবাদপত্র প্রকাশের কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলে না। তথাপি বাংলা সংবাদপত্রের বয়স নেহায়েৎ কমও না, সোয়া দু’শ বছরের অধিক। ১৭৮০ সালে জেমস অগাস্টাস হিকি এ উপমহাদেশের প্রথম সংবাদপত্র ‘বেঙ্গল গেজেট’ ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ করেন। তিনি তার প্রসপেকটাসে লিখেন This paper is set on foot with that design and being into one Focus, or immediate point of view, the numerous notices, advertisements etc. Now handed about by Harcarrahs in Manuscript.

এদেশে পত্রপত্রিকার প্রকাশ, বিকাশ এবং তা অব্যাহত রাখা কখনই মসৃণ ছিলো না। ১৭৮০ সালে হিকির ‘বেঙ্গল গেজেট’ থেকে শুরু করে অদ্যাবধি এদেশের পত্রিকাগুলির আইনি প্রক্রিয়ায় ডাক সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়া; সম্পাদক, মালিক ও সাংবাদিকের কারাবরণ; অর্থদন্ড ও জরিমানা, প্রেস বাজেয়াপ্ত হওয়া, নির্যাতন-হত্যার মুখোমুখি দাঁড়ানো ও শিকার হওয়া; পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়া এমনতর বহু ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে এদেশের পত্রিকা প্রকাশনাকে। ১৫ আইন বা ক্যানিং ল’ (১৮৫৭); প্রেস অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন অব বুকস অ্যাক্ট (১৮৬৭); ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট (১৮৭৮); সমুদ্র শুল্ক আইন (১৮৭৮); টেলিগ্রাফ আইন (১৮৮৫) ধারা ৫; ডাকঘর আইন (১৮৯৮) ধারা ২৭ ক থেকে ২৭ ঘ; ফৌজদারি কার্যবিধি (১৮৯৮); ভারতীয় দন্ড বিধি আইনের ১২৪ ক এবং ১৫৩ ক ধারা; নিউজপেপার (ইনসাইনমেন্ট টু ওফেন্স) অ্যাক্ট (১৯০৮); প্রেস অ্যাক্ট (১৯১০); রাষ্ট্র (অনুরাগের বিরুদ্ধে রক্ষা) আইন (১৯২২); সরকারি তথ্য গোপনীয়তা আইন (১৯২৩); সংবাদপত্র (জরুরি ক্ষমতা) আইন (১৯৩১); বৈদেশিক সম্পর্ক আইন (১৯৩২); রাষ্ট্র (নিরাপত্তা) আইন: ধারা-৩ (১৯৩৪); পাকিস্তান দন্ড বিধি আইন; পাকিস্তান নিরাপত্তা আইন (১১ ও ১২ ধারা); প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্স (১৯৬০); প্রাদেশিক জন নিরাপত্তা আইনসমূহ ছাড়াও সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণবিধি, ফৌজদারি আইন, জন শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ এবং বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক শাসন আমলে নিয়ন্ত্রণমূলক ফরমান; দ্যা প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স (ডিক্লারেশন অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট-১৯৭৩; স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট-১৯৪৭ প্রভৃতির মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী এদেশের সাংবাদিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে। ১৯৯০ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ কর্তৃক নিবর্তনমূলক কয়েকটি আইনের রদ এবং ২০০৯ সালের রাইট টু ইনফরমেশন অ্যাক্ট এর প্রবর্তন এদেশের সাংবাদিকতাকে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা ছিলো। তার মধ্যে ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, দৈনিক খবর, দৈনিক অব জারভার উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের মতো ঘন বসতিপূর্ন দেশে হাতে গোনা কয়েকটি সংবাদপত্র কখনোই যথেষ্ট ছিলো না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার ছিলো নির্ভরযোগ্য সংবাদ পরিবেশনের অভাব। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য আমাদেরকে বেশীরভাগ সময় বিদেশী মিডিয়ার উপর নির্ভর করতে হতো। তখন বিদেশী মিডিয়া বলতে বিবিসি, ভয়েজ অফ আমেরিকাকে বোঝানো হতো।

বর্তমানে বাংলাদেশে দৈনিক, অর্ধসাপ্তাহিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, দ্বিমাসিক, ত্রৈ-মাসিক, চতুর্মাসিক, ষান্মাসিক, বার্ষিক পত্রিকাগুলির মধ্যে সর্বমোট নিবন্ধিত ৩০৬১ টি পত্রিকা হলেও মিডিয়া তালিকাভুক্ত ৬৫৯ টি পত্রিকা প্রকাশ হচ্ছে। ইতোমধ্যে মিডিয়া তালিকাভুক্ত হয়ে দৈনিক ‘আলোকিত প্রতিদিন’ আজ দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পন করলো। ২০১৭ সালের ২৭ আগস্ট ‘আলোকিত প্রতিদিন’ এর ১ম সংখ্যা প্রকাশ পায়। সেই ধারাবাহিকতায় আজ প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে। দ্বিতীয় বছরে নতুন উদ্যোমে পথ চলা শুরু হলো। প্রকৃতপক্ষে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের ইচ্ছায় সম্পাদক এবং প্রকাশক হিসেবে জনাব সৈয়দ নুরুল হুদা রনো গত ১ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন নামের প্রস্তাবনায় ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে এসে দৈনিক ‘আলোকিত প্রতিদিন’ এর নামের ছাড়পত্র পান। পরে ২০১৭ সালের জুলাই মাসের ২ তারিখে এসে তিনি পত্রিকাটির ডিক্লিয়ারেশন প্রাপ্ত হন। এরপর বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও গণ যোগাযোগ মাধ্যমে ‘আলোকিত প্রতিদিন’ এর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। শুরু হয় নানান প্রস্তুতি। আকস্মিকভাবে ২৭ আগস্ট ২০১৭ তারিখেই প্রত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন সম্পাদক ও প্রকাশক জনাব সৈয়দ নুরুল হুদা রনো। যেই কথা সেই কাজ। বাংলাদেশে দৈনিক সংবাদপত্রের জগতে আরেক নাম যুক্ত হলো ‘আলোকিত প্রতিদিন’।

কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক ড. সৈয়দ রনো’র সম্পাদনায় নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অদ্যবধি পত্রিকাটি নিয়োমিত প্রকাশ হয়ে আসছে। এতে সম্পৃক্ত হয়েছেন বিভিন্ন লেখক, গবেষক, কলামিস্ট, প্রান্ধিক, কবি, ছড়াকার, সংবাদকর্মী এবং জেলা প্রতিনিধিসহ আরো অনেকে। এদের বাহিরেও সংবাদপত্রে আরো নানান লোক নানানভাবে সম্পৃক্ত থাকেন যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে জেগে থাকে সংবাদপত্র, জেগে ওঠে সংবাদ।

ভারতের প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিকি বেশ একটু মাথা পাগলা লোক ছিলেন, কিন্তু তিনি স্বাধীনচেতা ছিলেন এবং সাংবাদিকের সেটা আবশ্যক গুণ। হিকি তার ঘোষিত নীতিতে শেষ দিন পর্যন্ত অনড় অবিচল স্থির ছিলেন। তিনি কারো মতের দ্বারা প্রভাবিত হননি। কারো প্রলোভনে টলেনি তাঁর সাংবাদিকতার নীতি। কাউকে তোয়াক্কা করেননি। এমন কি ব্রিটিশ রাজ্যের স্বার্থে আঘাত করতেও তিনি কুণ্ঠাবোধ করেননি। ‘আলোকিত প্রতিদিন’ পত্রিকাটির একেবারেই শুরুর সময় থেকে সম্পৃক্ত থাকার কারণে সেই সময়ের হিকির বৈশিষ্ঠগুলো বর্তমানে দৈনিক ‘আলোকিত প্রতিদিন’ এর সম্পাদক ড. সৈয়দ রনো’র মাঝে লক্ষ্য করেছি।

সাহসীকতার সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জেগে থাক আলোকিত প্রতিদিন, জেগে উঠুক সংবাদপত্র। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগের এই জয় জয়কার সময়েও প্রিন্ট মিডিয়া হিসেবে কালের ইতিহাসে অবশ্যই পাকাপোক্ত আসন অলঙ্কৃত করবে ‘আলোকিত প্রতিদিন’ সেই প্রত্যাশা করছি।

( e-mail : zakarianuri26@gmail.com )

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন