বঙ্গবন্ধুুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ : প্রতিটি বাক্য যার অসামান্য

বঙ্গবন্ধুুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ : প্রতিটি বাক্য যার অসামান্য 

নাসির আহমেদ

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের অবস্মরণীয় ভাষণের উদ্ধৃত পঙক্তিটি বিশ্লেষণের আগে বোধকরি গণতন্ত্রের জন্য তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা প্রয়োজন। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নানা বিশ্লেষণে বিশ্লেষিত করা হয়। কিন্তু তাঁর জীবন ও কর্মের পর্যালোচনা করলে মনে হয়, কোনো বিশ্লেষণই তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র ধারণ করতে সক্ষম নয়। যে কোনো বিশ্লেষণেই অপূর্ণ থেকে যান তিনি। কারণ তিনি এক অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়তে পড়তে সচেতন পাঠক বিস্মিত হন। মা এবং মাতৃভূমিকে সর্বকালেই মানুষ ভালোবাসেন, তাই বলে এমন চরম আত্মত্যাগের মুখোমুখি হয়ে! হ্যাঁ বঙ্গবন্ধু চরমতম আত্মত্যাগের দৃষ্টান্তই রেখে গেছেন, তার মাত্র ৫৫ বছরের জীবনে।

১৯৩৭ সালে প্রথম কারাবরণ থেকে ১৯৭২ এর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত জীবনের প্রায় ৪০ শতাংশ সময় ছিলেন কারাগারে। দেশের জন্য তিনি যে আত্মত্যাগ করেছেন তার তুলনা এ উপমহাদেশে তো বিরল বটেই, সারা পৃথিবীতেও এত বড় ত্যাগের দৃষ্টান্ত খুব কম। সেই ত্যাগী মহান নেতা যখন দীর্ঘ ২৩ বছরের পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে অনন্য ঐক্যের দৃঢ় শক্তিতে শক্তিমান করে তুললেন, তখনই ঘটলো বিস্ফোরণ। সেই বিস্ফোরণ পিছিয়ে পড়া বাঙালির ন্যায্য অধিকারের যথার্থ নেতৃত্ব পেলে যে বাঙালিও বিশ্বের বিস্ময় হয়ে উঠতে পারে, তা বঙ্গবন্ধু প্রমাণ করেছিলেন ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই। আগস্ট ১৯৪৭ থেকে মার্চ ১৯৭১। দীর্ঘ প্রায় ২৩ বছর। এই দীর্ঘকাল পরিসরেও পাকিস্তানি শাসকচক্র একবারের জন্যও প্রত্যক্ষ নির্বাচন বা একমাথা এক ভোট ব্যবস্থা প্রচলন করতে সাহস পায়নি। কারণ, তা হলে দেশটির মোট জনসংখ্যার গরিষ্ঠ অংশ অর্থাৎ বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ট আসন পেয়ে যায়। যে কারণে পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং দ্বিতীয় গভর্নর জেনারেল লিয়াকত আলী খানের মৃত্যুর পর পাকিস্তানে ১৯৫০ সাল থেকে যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক শাসনের সূচনা, তা ১৯৭১ সালেও অব্যাহত ছিলো। এমন কি আমাদের স্বাধীনতার তিন দশক পরেও সেখানে সামরিক শাসন ছিল।

বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি শাসকদের নির্বাচন দিতে বাধ্য করেছেন। যখন তিনি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকারের অধীনেই ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে সম্মত হলেন, তখন অনেক বাঘাবাঘা নেতাও বিস্মিত হয়েছিলেন।

পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের অধীনে কি বঙ্গবন্ধুর আওয়ামীলীগ জিততে পারবে? এই সংশয় ছিলো মাওলানা ভাসানীরও। তিনিও সেই নির্বাচন বর্জন করেছিলেন। তাদের ধারণা ভুল ছিলো। বয়সে ছোট হয়েও বঙ্গবন্ধু যে বড় বড় নেতাদের চেয়ে দূরদৃষ্টিসম্পূর্ণ ছিলেন, তা ইতিহাস প্রমাণ করেছে। বঙ্গবন্ধু জীবনের দীর্ঘ সময় গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। কিন্তু জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। তাদের ওপর বিশ্বাস হারাননি। সে কারণেই সামরিক শাসনের মধ্যেও এই প্রথম (১৯৭০) পাকিস্তানে একমাথা এক ভোটের অধিকার আদায় করতে সম্মত হন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু জানতেন জনগণ বঙ্গবন্ধুর নৌকা প্রতীকেই ভোট দেবেন। কারণ তিনি তাদেরকে ভালোবাসেন। জনগণের প্রতি আস্থা ছিলো বলেই বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকদের মতো অবহেলিত বাংলার মানুষকে রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকবে বলেও শেষ পর্যন্ত অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন ডেকে জনগণকে প্রস্ত করেছিলেন। সেই পদক্ষেপের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে। মাত্র ১৯টি মিনিটের ভাষণে বঙ্গবন্ধু আসন্ন যুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে গেছে, তা তাঁর দেশবাসীকে অবগত করলেন, সার্বিক নির্দেশনা দিলেন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য। এমনকি তিনি যদি হুকুম দিতে না- ও পারেন, তা হলে জনগণকে কী করতে হবে, তার সব নির্দেশনা দিলেন ওই ভাষণে।

অনন্য ভাষণে বঙ্গবন্ধু কোনো নির্দেশনাই বাকি রাখেননি। এমন কি ভাষণের শুরুতে পাকিস্তানের ২৩ বছরের শোষণ বঞ্চনার ইতিহাস এবং বাঙালিদের ওপর জুলুম নির্যাতন, বঞ্চনার ইতিহাস বর্ণনা করতেও ভোলেননি। তিনি যে জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন তার নির্বাচনী মেনিফেস্টো ৬ দফার ভিত্তিতে একটি শোষণহীন সমাজ গড়ার গণতান্ত্রিক লক্ষ্যে পৌঁছতে, তা-ও জানালেন অত্যন্ত বেদনা ভারাক্রান্ত কণ্ঠে। বললেন, ‘নির্বাচন হলো। আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি, শুধু বাংলা নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসেবে তাকে অনুরোধ করলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, প্রথম সপ্তাহ মার্চ মাসে হবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে, আমরা অ্যাসেম্বলিতে বসবো।… এমনকি আমি এ পর্যন্তও বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজনও যদি সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব’।

বঙ্গবন্ধুর এই শেষোক্ত উক্তি বা সদিচ্ছার মধ্যে কী যে গভীর গণতান্ত্রিক উদার মূল্যবোধ ছিলো, তার সবটুকু ভাষায় ব্যক্ত করা অসম্ভব। এ কেবল উপলব্ধির বিষয়। দেশের জনগণের প্রতি অবিচল আস্থা আর ন্যায়ের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা না থাকলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া একজন জননেতার পক্ষে সংখ্যালঘু, তাও আবার যদি মাত্র একজনও ন্যায্য কথা বলে, তা মেনে নেবার অঙ্গীকার করা অসম্ভব। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের ওই উক্তির মধ্য দিয়ে এ সত্যও বাঙময় হয়ে উঠেছে যে, ন্যায্যতার প্রতি তিনি সব সময় ছিলেন অবিচল আস্থাশীল। ন্যায় এবং সত্যের প্রতি তার শ্রদ্ধা অতুলনীয়। তাঁর সারা জীবনের সংগ্রাম ছিলো অন্যায্যতা তথা অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এমন কি তিনি যখন জাতির পিতা, যখন সমগ্র জাতির অস্তিত্বের প্রতীক, তখনও এই ন্যায্যতা থেকে সরে দাঁড়াননি। ১৯৭৩ সালে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ভূষিত তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারের সমালোচনায় যখন মুখর এক তরুণ বিরোধী দলীয় সাংসদ (শ্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত), তখন সরকার দলীয় অনেকে বিরক্ত, বিরুপ হলেও সংসদ নেতা বঙ্গবন্ধু তরুণ বিরোধী সাংসদের বক্তব্য ধৈর্য্য সহকারে শুনেছেন। বিটিভি সংবাদে সে দৃশ্যও দেখানো হয়েছে।

এমন উদার আর ন্যায়বোধ, মানবিক ঔদার্য্য কেবল মানবতাবাদী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার মধ্যেই দৃশ্যমান ছিলো। একাত্তরে এতো হত্যাযজ্ঞের পরও পাকিস্তানি শাসকদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু দিনের পর দিন বৈঠক করেছেন। শান্তিপূর্ণ সমাধান হলে ৬ দফার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ফিরে পেত সায়ত্ত-শাসন আর অর্থনৈতিক মুক্তি। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিয়েও বঙ্গবন্ধু তাই বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হননি। হয়েছেন দেশের নিরঙ্কুশ মানুষের প্রতিনিধি। ন্যায্য মুক্তি সংগ্রামী। এই শক্তির উৎস তাঁর জনগণের প্রতি অবিচল আস্থা আর ন্যায়ের পক্ষে অনড় অবস্থান। এজন্যই ন্যায্য কথা বলা ব্যক্তি তিনি যত দুর্বলই হোন, তার প্রতি বঙ্গবন্ধুর আস্থা ছিলো অবিচল। বঙ্গবন্ধুর এই উদার গণতান্ত্রিক মনোভাব সক্রিয় ছিলো আমৃত্য। ১৯৭৫ সালে সকল দলমতের মানুষ নিয়ে জাতীয় ঐক্যের মঞ্চ ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামীলীগ’ প্রতিষ্ঠার সময়ও তিনি জনগণের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন। তাই সবার স্থান হয়েছে তার নতুন প্লাটফর্মে। ন্যায্যতা আর আত্মমর্যাদাবান বঙ্গবন্ধু মানুষের ওপর কখনো বিশ্বাস হারাননি। বিশ্ব ব্যাংকের নেতৃত্ব যখন যুদ্ধবিধস্ত দেশ পুনর্গঠনে দাতামহল সহায়তা দিতে চাইলেন এই শর্তে যে, পাকিস্তানের ঋণের কিছু দায় বাংলাদেশকেও শোধ করতে হবে। বঙ্গবন্ধু তখন পরিস্কার বলে দিলেন, ‘এই যদি হয় আপনাদের শর্ত, তবে কোনো সাহায্যেই আমরা নেব না’। শুধু তা-ই নয়, ১৯৭৫ সালে জীবনের শেষ জনসভায়ও (১৯৭৫ এর ২৬ মার্চ) বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন আমরা ভিক্ষুকের জাতি হিসেবে বাঁচতে চাই না। সাম্রাজ্যবাদীরা যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের সরকার প্রধানের এমন দৃঢ়তা কল্পনাও করেনি। ন্যায়ের প্রতি অবিচল ছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু এত সাহসী হতে পেরেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, দেশপ্রেম আর জনগণের প্রতি আস্থার কোনো তুলনা হয় না। অবচেতন মনে হয়ত ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে জীবনসায়াহ্নে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমনই এক পরিত্রাণকর্তার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। বলেছিলেন, তিনি পূর্ব দিগন্তে আবির্ভূত হবেন এবং বিচূর্ণ সভ্যতায় মানবিক মূল্যবোধে বাঙালিকে মহিমানিত্ব করে তুলবেন। ‘বাঙালির বাংলা’ প্রবন্ধে (১৯২৬) হয়ত এস ওয়াজেদ আলীর মতো লেখকের মনেও আশা জেগেছিলো বঙ্গবন্ধুর মতো বাঙালিকে মহিমানিত্ব করার মতো যোগ্য কোনো নেতার। তিনি ওই প্রবন্ধে লিখেছিলেন… বাঙালি এখন ভবিষ্যতের পূর্ণতার রাজনীতির জন্য প্রতীক্ষা করছে… বাঙালি এখন সেই মহামানবের প্রতীক্ষায় আছে, যিনি তাকে এই গৌরবময় জীবনের সন্ধান দেবেন… বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার এক প্রবন্ধের শেষে লিখেছিলেন জয় বাংলা, বাংলার বাঙালির হোক। বাঙালির জয় হোক। সেই পরিত্রাণকর্তা, সেই মহামানব, সেই বাঙালির বাংলা সুনিশ্চিত করা মানুষটিই অদূর ভবিষ্যতের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হবেন- সে কথা কি কেউ জানতেন। ইতিহাস এমন বিস্ময়কেই অমরতা দেয়।
 – বার্তা পরিচালক (বিটিভি)

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন