ওদের রোযা বারো মাস

ফাহিয়ান হামিম : সকাল থেকেই ইমতেহানের মন খারাপ। কেনো ওকে রোযা রাখতে দেয়া হলো না। এজন্য সে আজ করো সাথেই কথা বলবে না, ১৩ বছরের ছেলে সারাদিন না খেয়ে থাকলে শরীর খারাপ করবে এমনটাই মনে করেন ইমতেহানের মা। বলছিলাম শহরের অভিজাত পড়িবারের সন্তান ইমতেহানের কথা। ঠিক ইমতেহানের বয়সী মেয়ে বৃষ্টি। তাকে কেউ ভোর রাতে খাবার জন্য ডেকে তুলে না কিংবা বলতে হয় না আজ রোযা থেকো, তবুও তাকে সারাদিন না খেয়ে কাটাতে হয়। সন্ধ্যায় যখন সবাই ইফতার খেতে ব্যাস্ত তখন মলিন মুখ নিয়ে ঘরে ফেরে বৃষ্টি। কেননা এখনতো রমযান মাস, পার্কে এখন আর আগের মতো মানুষ ঘুরতে আসে না তাই তার   ফুলও বিক্রি হয় না। বলছিলাম চন্দ্রিমা উদ্যানে ফুল বিক্রেতা বৃষ্টির কথা। অভাব অনটনের সংসারে বাবা মার বিচ্ছেদের পর চার বছর বয়স হতে নানির কাছেই থাকে ও। ফুল বিক্রি করে সামান্য আয় দিয়েই চলে তাদের নানী-নাতনীর সংসার। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জিয়া উদ্যান ও এর পাশের রাস্তায় ফুল বিক্রি করে সে। দু’মুঠো ভাতের জন্য তার এই সংগ্রাম। রমযান মাস তাই সারাদিন তার আয় ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকার কাছাকাছি, বছরের অন্যান্য দিনগুলোতেও যেদিন বিক্রি কম হয় ওই দিন নানী-নাতনীর অনাহারেই কাটাতে হয়।

সোহাগের বয়স ১২, থাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায়। তার দিন রাত দুটোই  কাটে রাস্তায়। সারাদিন শহীদ মিনার ও এর পাশের এলাকায় বোতল কুড়াত সে। এখন শুধু রাতে বোতল কুড়ায়, তারপর সেই বোতল জমা দিয়ে যে টাকা পায় তা তুলে দেয় তার বোনের হাতে। বোনের দুই বছরের বাচ্চাকে নিয়ে মানুষে কাছে টাকার জন্য হাত পাতে। অনেকে শিশুর মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে খাবার বা টাকা দেন। দুলাভাই কী করে জানতে চাইলে সোহাগ জানায় অনেক আগেই তার দুলাভাই তাদের ছেড়ে চলে গেছে। সোহাগের আয়েই চলে ভাই-বোনের সংসার, সোহাগের বোন আগে ফুল বিক্রি করতো কিন্তু অসুস্থতার জন্য আর করতে পারে না। তাদের বাবা-মা গ্রামে থাকে। সারাদিন কত টাকা আয় করে এমন প্রশ্নের জবাবে সোহাগ বলে, “যেদিন বিস্টি না অয় অই দিন ভালোই পাই, বিস্টি অইলেই মাইনসে ঘুরতে আহে না, অই দিন না খাইয়া থাকতে অয়, এহন তো রোজা তাই মাইনশে দিনে কিছু খায় না হেল্লাইগা রাইতে বোতল কুড়াই, দিনে ঘুড়ি, মাইনেরস থিকা টেহা চাই”।

জিহাদ সাহাবাগের রাস্তায় সংবাদ পত্র বিক্রি করে, বয়স ১২ বছর। সকাল হলেই  শুরু হয় তার জীবন যুদ্ধ। ঘুম থেকে উঠেই চলে যায় সংবাদ পত্র আনতে। সারদিন এ বাসে ও বাসে ঘুরে সংবাদপত্র বিক্রি করে। মাদকাসক্ত বাবার ঋণের বোঝা এ বয়সের তার কাধে এসে পড়েছে। কখনো রোদ, কখনো বৃষ্টি সব কিছুকে উপেক্ষা করে জিহাদের কণ্ঠে ভেসে ওঠে সেই চিরোচেনা বুলি, পেপার লাগবে পেপার, ৫ টাকা, ৫ টাকা। সারাদিন এ বাস থেকে ও বাসে ঘুরে তার আয় ২০০ টাকা প্রায়। ফুটপাতে পলিথিনের কুঁড়েঘরে থাকে তারা। যেদিন টাকা কম হয় ওই দিন বাবা খেতে দেয় না। এভাবেই চলে জিহাদের দিন।

বৃষ্টি, সোহাগ ও জিহাদের মতো এরকম লাখো শিশু রয়েছে ইট পাথরে গড়া এ শহরে, সমাজ যাদের নাম দিয়েছে ‘টোকাই’, ‘পথকলি’, ‘ছিন্নমূল’ বা ‘পথশিশু’। সাম্প্রতিক কালে কোনো জরিপ না হলেও এ সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে তাতে সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট (বিআইডিএস) ও ইউনিসেফের ২০০৫ সালের গবেষণা অনুযায়ী দেশে ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৭২৮ জন পথশিশু রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা শহরে রয়েছে ৭ লাখ পথশিশু।

পথশিশুদের জীবনযাপন অত্যন্ত দুর্বিষহ। রাজধানীর বিভিন্ন বস্তি, রাস্তার ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল ইত্যাদিতে তাদের বসবাস। অবহেলা, অনাদর, অযত্নে ও  অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠে তারা। তাদের জীবনের মৌলিক অধিকারগুলো হতেও তারা বঞ্চিত। তারা ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ, বাদাম বিক্রি, কুলি, সিগারেট বিক্রি, হোটেলে পানি দেয়া, হোটেল বয়, গাড়ি ধোয়া-মোছা, ফুল বিক্রি ইত্যাদি কাজ করে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খাটুনি করে তাদের আয় ১০০ থেকে ২০০ টাকা।

এ টাকা দিয়ে তারা রাস্তার পাশের খাবারের দোকান থেকে খাবার কিনে খায়। আয় না হলে না খেয়েই দিন যাপন করে। এজন্য অধিকাংশ পথশিশু অপুষ্টিতে ভোগে। চর্মরোগ, ডায়রিয়া, ঠাণ্ডা জ্বর, জন্ডিসসহ নানা রোগে তারা আক্রান্ত হয়। অসুস্থ হলে চিকিৎসার সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত।

আলোকিত প্রতিদিন/১জুন/আরএইচ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন