‘কোনো ভুল হলি পারে মাফ চাচ্ছি, তাও জানে মাইরেন না’

ইলিশ মাছের পেটির মত চাকা চাকা করে কাটা হলো লোকটার হাত। ঘাড়ের পিছনে ধারালো অস্ত্রের উপর্যুপুরি আঘাতে কুচি কুচি হয়ে গেল শিড় দাড়ার উর্ধ্বাংশ। আলতার মত টকটকে গাঢ় লাল রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে ভিজিয়ে দিল পিচ ঢালা রাস্তা। কেউ শুনলো না তার আর্তনাদ। কেবল কয়েকটি ঝিঝি পোকা ডেকে গেলো নিশুতি রাতের স্তব্ধতা ভেঙ্গে।

নাহ! এত সহজে কাবু করা যায়নি সাঁথিয়া থানার ছোন্দাহ গ্রামের মিরাজকে।

প্রথম আঘাতটার পরই মিরাজ বুঝতে পারে তার সাথে কি হতে চলেছে। জড়িয়ে ধরে ঘাতকের পা। কাকুতি-মিনতি করে বলে ‍”আব্বা ভর্তা বানাইছে, আলু ভর্তা, আমার জন্যে বইস্যে আছে। ছাইড়ে দ্যান ভাই; আপনারা আমার নিজের লোক, কোনো ভুল হলি পারে মাফ চাচ্ছি, তাও জানে মাইরেন না।”

কোনো দোহাই কাজে লাগেনি। ধারালো অস্ত্রের প্রচণ্ড আঘাতে প্রথমে ডান বাহুর হাড় সমেত বিচ্ছিন্ন করা হল। যখন সদ্য কাটা কই মাছের মত লাফাচ্ছিল মিরাজের শরীর। তখন ‌ওপর করে ফেলে নিপুন কশাইয়ের মত ধড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল। ৭/৮ জন তাগড়া জোয়ানের সাথে আর পেরে উঠলো না সে। অতঃপর মুখ থুবড়ে পড়ে রইল ছোন্দাহ এলাকার এক সময়ের ত্রাস মিরাজ।

ভোর বেলা ঘটনাস্থল দিয়ে মাছের ঘের দেখতে যাচ্ছিল কোনো এক গ্রামবাসী। রাস্তার উপর এমন বীভৎস দৃশ্য দেখে চিৎকার দেয় সে। আধা ঘণ্টার মধ্যেই জড়ো হয় শত শত মানুষ। উপুর করা লাশ উল্টিয়ে দেখতে সাহস পায় না কেউ। পুলিশ এসে উল্টায় লাশ। সবাই দেখে পরিচিত মুখ মিরাজ।

হ্যাঁ! খুব সুবিধার লোক ছিল না মিরাজ নিজেও। ক দিন আগেও ৩৬ মাস অস্ত্র মামলায় জেল খেটে এসেছে সে। নির্দিষ্ট কোন পেশা ছিল না তার। রাতের বেলা এলাকার মাছের ঘের থেকে মাছ চুরিই ছিল তার বতর্মান পেশা। জেল থেকে আসার পর ভালইতো জীবন যাপন করছিলো। তবে তাকে কে মারলো। আর কেনই বা মারবে? নানা মানুষের নানা মত। কিন্তু কিছুই খোলসা হল না। রহস্য রহস্যই থেকে গেল ।

ঘটনার খবর পেয়েই মাননীয় পুলিশ সুপার জিহাদুল কবির পিপিএম মহোদয়ের নির্দেশ পেয়ে ছুটে আসেন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ফিরোজ কবির। ছিপছিপে চেহারা আর অন্তরভেদী দৃষ্টির তরুন অফিসার তিনি। খুটিয়ে খুটিয়ে দেখেন ঘটনাস্থলের প্রতিটি বস্তু। এরপর মনযোগ দেন ভিকটিমের ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাগত জীবনের প্রতি।একটু মাথা খাটাতেই ছোট্ট একটি ক্লু পেয়ে যান। জানতে পারেন নতুন প্রেমে পড়েছিল ফিরোজ। প্রচুর ফোনে কথা হত মেয়েটার সাথে। এই নিয়ে তার বন্ধু রাহেলের সাথে ছিলো তার দ্বন্দ। হয়তো সেই আক্রোশেই ঘটতে পারে এই মর্মান্তিক ঘটনা। শুরু হল রাহেলের খোজ। কিন্তু কোথায় সে। ঘটনার পর থেকেই সে লাপাত্তা। সন্দেহ আরও ঘনিভূত হচ্ছিল।

একজন জানালো মাছের ঘেরে উৎপাত করার জন্য নাকি ঘের মালিকেরা লোক ভাড়া করে ঘটিয়েছে এই কান্ড। বিশ্বস্ত একজন সোর্স জানালো ঘটনা আসলে কোনটাই নয়। আসল ঘটনা হল চেয়ারম্যানের ভাইকে মারতে চেয়েছিল ভিকটিম মিরাজ। তারাই প্রতিশোধ নিল। এতসব ইনফরমেশন পেয়ে এইবার একটু গোলক ধাধাতেই পড়লেন অফিসার ফিরোজ। আবারও সরনাপন্ন হলেন এসপি মহোদয়ের। এইবার সাথে যোগ দিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) গৌতম কুমার বিশ্বাস ও শামীমা আক্তার স্যার। অভিজ্ঞ মাথাগুলি সব যাচাই বাছাই করে ফিরোজকে ভিকটিমের ফোন কলের দিকে নজর দিতে বললেন। সাহায্যে বরাবরের মতই এগিয়ে এলো এল আই সি পুলিশ হেড কোয়াটার্স ও সিআইডি।

নিপুন বিশ্লেষনে টার্গেট করা হল বেশ ক’জনকে। মাছ ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে খবর নিতে মাছের ঘেরে পাঠানো হল এই মামলার তদন্তকারী এসআই ইউনুসকে। বেশ ক’দিন ঘুরে ইউনুস জানালো ঘটনার তারিখে ঘটনাস্থলের পাশে দিনভর ফোনে কথা বলেছে একজন করিমন চালক। একটু নজর দিতেই দেখা গেল ভিকটিমের সাথেও ঐদিন কথা হয়েছে তার। তবে মাত্র একবার। বাকিটা সময়ে পুরোটাই একটা অপরিচিত নম্বরে। এর আগে বা পরে কোন দিনই ওই নম্বরের সাথে কথা হয়নি করিমন চালকের।

ঘটনার গভিরে যেতেই দেখা গেল অপরিচিত নম্বরটি শুধুমাত্র ঘটনার দিন বাদে বাকি দীর্ঘ সময়ের কখনও অত্র এলাকায় আসেনি। আবার ঘটনার পরও আর নম্বরটি ব্যবহার হয়নি। সবকিছু রহস্যময় মনে হচ্ছিল। মাননীয় পুলিশ সুপার স্যারের নির্দেশনায় ছদ্মবেশে ধরা হল করিমন চালককে। প্রানচঞ্চল ২০/২২ বছরের টগবগে যুবক সে। কথা বার্তায় যথেষ্ট চটপটে। তাকে জিজ্ঞেস করা হল ঘটনার সময় সে কোথায় ছিল. কি করছিলো ? সে জানালো বাড়িতেই ঘুমাচ্ছিল। অথচ রেকর্ড বলে অন্য কথা। এছাড়া তার কাছে পাওয়া ফোনে কোন নম্বরও সেভ ছিল না।দেখা গেল একদম নতুন সিম।কোন এক অজ্ঞাত কারনে সে তার পূর্বের সিমের কথা গোপন করেছিলো। কিন্তু পালাবার পথ নেই, করিমন চালকের মহাজনের কাছে তার পূর্বের নম্বর সেভ করা ছিল। কাজেই সে তার পূর্বের নম্বরটা বলতে বাধ্যই হল। এরপরও বলে আগের সিম হারিয়ে গেছে। তাও আবার মিরাজ মারা যাবার পরের দিনই। এবার আর চুপ থাকা যায় না। তাকে বুঝানো হলো, যা হয়েছে খুলে বলো নইলে এবার ফেঁসে যাবে। দেড় বছরের ছোট্ট বাচ্চা বাবা হারাবে, বউটা বাচ্চা নিয়ে পথে পথে ঘুরবে। খানিকক্ষন চুপ থেকে মুখ খুললো সে। বেরিয়ে এলো ভয়ঙ্কর তথ্য।

ভিকটিম ছিল মাস্তান প্রকৃতির লোক। হেন অপরাধ নাই যে করে নাই। এলাকায় তার কিছু দোসরও ছিল। সমবয়সী বিধায়, আটক করিমন চালকের সাথেও ছিল তার সখ্যতা। একই গ্রুপে ভলকা শামিম নামেও একজন সিনিয়র আছে। সে দাগী আসামী। সবাই মিলেই মানুষের ঘেরের মাছ চুরিসহ নানা অপরাধ করতো। ভিকটিম ফিরোজ বেশী সাহসী ও দুরন্ত হওয়ায় এই টিমের নেতৃত্ব ভলকার হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছিল। এলাকার চেয়ারম্যানের ভাইকে মারার পরিকল্পনা করেছিল ভলকা ও ভিকটিম মিরাজ। অপারেশনে গিয়ে পালিয়ে আসে ভলকা। অস্ত্র সহ ধরা খায় ফিরোজ। তার ৩৬ মাসের জেল হয়। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সে প্রচার করে যে, ভলকাই ষড়যন্ত্র করে তাকে ধরিয়েছে। সে আজ হোক কাল হোক ভলকাকে শেষ করে ফেলবে। এ কথা ভলকার কানে গেলে সে মিরাজকে খতমের পরিকল্পনা নেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী মাছ চুরির কথা বলে গভীর রাতে ডাকা হয় ফিরোজকে। ফিরোজ জানতো না গোপনে ঐ দিনই ঢাকা থেকে ভলকা তার সহযোগীদের নিয়ে এলাকায় এসেছে। অতঃপর মাছের ঘেরের পাশের নির্জন রাস্তায় ঘটানো হয় হত্যাকাণ্ড। কাজ শেষে ব্যবহৃত দুটি ধারালো দা, ০১টি চাইনিজ কুড়াল ও ০৪টি তাজা গুলিসহ বিদেশী পিস্তল করিমন চালকের হাতে দেয় ভলকা। সে তখন নিজের বাড়ীর পুকুরে বস্তায় ভরে পুঁতে রাখে অস্ত্রপাতি। এছাড়াও ভবিষ্যতে ধরা পড়লে যাতে সে একা না ফেসে যায় তজ্জন্যে ঘটনা সংক্রান্ত বিষয়ের কথোপোকথন ফোনে রেকর্ড করে রাখে। এরপর ঐ সিম ও মেমোরী কার্ড তার ঘরের বৈদ্যুতিক ছকেটের বক্সের ভিতর লুকিয়ে রাখে।

অবশেষে স্থানীয় চেয়ারম্যান, সাংবাদিক ও শত শত মানুষের উপস্থিতিতে আলামতগুলি উদ্ধার করা হয়। ঘটনা এখানেই শেষ। তদন্ত চলমান। মামলার স্বার্থে প্রকৃত নামগুলি পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। সূত্র: কালের কন্ঠ

লেখক : আশীষ বিন হাসান , অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, বেড়া সার্কেল , পাবনা।

জিহাদুল কবির, এসপি, পাবনা-এর ফেসবুক থেকে

আলোকিত প্রতিদিন/২৩মে/আরএইচ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন