দৈনিক আলোকিত প্রতিদিন পত্রিকার ইতিবৃত্ত ঘিরে আত্মউপলব্ধি

সৈয়দ রনো: অনেক গুণীজন, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, রাজনীতিক, কবি, সাহিত্যিক, ছড়াকার, প্রাবন্ধিক, বন্ধু এবং সুহৃদয়ের পরামর্শে একটি দৈনিক পত্রিকার ডিক্লারেশনের উদ্যোগ গ্রহণ করি। আমার ব্যক্তিগতমত তেমন সায় দেয়নি, কারণ ২০০০ সাল হতে ‘সাপ্তাহিক অন্যধারা’ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অর্থকষ্ট কোনদিনই পেছন ছাড়েনি। যদিও বর্তমানে পত্রিকাটি মিডিয়াভুক্ত এবং আমি সম্পাদক হিসেবে এ্যাক্রিডিটেশন কার্ড হোল্ডার। সম্মান পেয়েছি অনেক কিন্তু অর্থনৈতিক দৈণ্য ছিলো নিত্যসাথী। ‘অন্যধারা পাবলিকেশন্স’ এর সত্ত্বাধিকারী হিসেবেও খুব একটা ভালো ছিলাম ব্যবসায়ী দৃষ্টিকোণ থেকে, তাও নয়। অনেকেই বোঝানোর চেষ্টা করলেন- ‘আপনি পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে একটি দৈনিক পত্রিকার ডিক্লারেশন নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে ভ‚মিকা রাখুন’। আমার যুক্তি ছিলো, বর্তমান সময়ে প্রিন্ট মিডিয়া অনেক, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার জয় জয়কার অবস্থা। সর্বোপরি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে অনেকাংশে প্রিন্ট মিডিয়ার কদর কমে এসেছে। কিন্তু অনেক গুণীজনের পরামর্শ ফেলতে পারলাম না। অবশ্য তারা বলেছিলেন, আপনি দৈনিক পত্রিকা করেন আমরা প্রয়োজনে ইনভেষ্ট করবো। আপনজনদের মতামত উপেক্ষা করা কোনোদিন, কোনো সময়েই সম্ভব হয়নি। পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রেও সম্ভব হলো না।

আমাদের নির্বাচনী এলাকার সাংসদ জনাব নাঈমুর রহমান দূর্জয় এর সুপারিশ নিয়ে সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দৈনিক আলোকিত প্রতিদিন পত্রিকা নামকরণ ঠিক করে গত ০১/১২/২০১৬ তারিখে জেলা প্রশাসক, ঢাকা বরাবর আবেদন করি। অনেক লবিং করার পর ডিসি অফিস হতে ডিএফপি’র নিকট নামের ক্লিয়ারেন্স এর জন্য পত্র প্রেরণ করেন। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপি) গত ১৪/০২/২০১৭ তারিখে ‘দৈনিক আলোকিত প্রতিদিন’ পত্রিকার নামের ছাড়পত্র প্রদান করেন। এরপর তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে নানা বিলম্ব হলেও এসবি রিপোর্ট রাস্তার বহু কানাগলি পার হয়ে ডিসি অফিসে পৌছায়। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকা গত ০২/০৭/২০১৭ তারিখে পত্রিকার ডিক্লারেশন প্রদান করেন। এরপর পত্রিকা প্রকাশনার কাজ শুরু।

দৈনিক নয়াদিগন্ত এবং দৈনিক প্রথম আলোতে বিজ্ঞাপণ প্রকাশ করলে অনেক মেধাবী সাংবাদিকরা এসে পত্রিকার সাথে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। অনেক জেলা প্রতিনিধি তাদের বায়োডাটা জমা দেন। সাংবাদিক জাকারিয়া নূরীকে মফস্বল সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়ে পত্রিকা প্রকাশের কাজ শুরু করি। গত ২৭ আগস্ট ২০১৭ তারিখে ‘দৈনিক আলোকিত প্রতিদিন’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন জেলায় পত্রিকা নিয়মিত পাঠাতে থাকি। এই লেখাটি শেষ করা পর্যন্ত পত্রিকা প্রকাশের ব্যত্যয় ঘটেনি। অনেকেই পত্রিকা নিয়ে অনেক সুপরামর্শ দিয়েছেন। অনেকেই গঠণমূলক আলোচনা করেছেন, অনেকেই করেছেন তির্যক সমালোচনা, কিন্তু আমি কোন কথায় কান না দিয়ে নিয়মিত পত্রিকা প্রকাশ করার চিন্তা করেছি। অনেক আশ্বাস, অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছেন অনেকেই, এতে যেমন আশাবাদীও হইনি তেমনি হতাশও হইনি। জেলা প্রতিনিধিরা শুধু পত্রিকা মিডিয়াভুক্তির কথা বলেছেন। জাত সাংবাদিকরা শুধু জানতে চেয়েছেন- মিডিয়াভুক্তি আছে কী না? প্রতিউত্তরে আমি নিরব থেকেছি।

মিডিয়াভুক্তির দৌড়ে নিজের নাম মনের আয়নায় লিখে ফেললাম, যেভাবেই হোক পত্রিকাটি মিডিয়াভুক্তি করাতেই হবে। ৯০ সংখ্যা পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ হবার পর একত্রে তিনিটি দপ্তরে এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ে ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করা হয়েছিলো।

গত ১৫/১১/২০১৭ তারিখে জেলা প্রশাসক ঢাকা কর্তৃক পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশনার ছাড়পত্র হাতে পাই। গত ১৪/১১/২০১৭ তারিখে এসবি, ঢাকা অনাপত্তি পত্র প্রদান করেন।

গত ০৪/১২/২০১৭ তারিখে চলচিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপি) নিয়মিত প্রকাশনার ছাড়পত্র প্রদান করেন।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের আবেদন পত্রটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পত্রাকারে পৌছালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এসবি এবং এন এস আই দিয়ে তদন্ত করান। দু’টি তদন্ত রিপোর্টই অনুকুলে থাকার পরেও অজ্ঞাত কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি পত্রটি পেতে বিলম্ব হয়। পরবর্তীতে আমাদের অফিস এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর জনাব ফরিদুর রহমান খান ইরান এর সুপারিশে গত ১০/০৪/২০১৮ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিডিয়াভুক্তির ক্ষেত্রে অনাপত্তি পত্রটি হাতে পাই। চারটি ছাড়পত্র হাতে পাবার পর বিধি মোতাবেক মিডিয়াভুক্তির জন্য ডি এফ পি’র মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করা হয়। ইতোমধ্যে সাপ্তাহিক অন্যধারা পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশকের এ্যাক্রিডিটেশন কার্ডটি তথ্য অধিদপ্তরে সারেন্ডার করে গত ২২/০৪/২০১৮ তারিখে ‘দৈনিক আলোকিত প্রতিদিন’ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশকের এ্যাক্রিডিটেশন কার্ড প্রাপ্ত হই। গত ২৫/০৪/২০১৮ তারিখে দৈনিকের অডিট রিপোর্ট ডি এফ পি কমপ্লিট করলে গত ১০/০৫/২০১৮ তারিখে ডি এফ পি’র পরিদর্শকগণ পত্রিকা অফিস ও প্রেস পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন এবং অডিট রিপোর্টটি পত্রিকার অনুকুলে সাবমিট হবার দরুণ গত ১৭/০৫/২০১৮ তারিখে ‘দৈনিক আলোকিত প্রতিদিন’ পত্রিকাটি মিডিয়াভুক্ত হয়।

মিডিয়াভুক্তির পত্রটি হাতে পাবার কিঞ্চিৎ আনন্দই এই লেখার প্রেরণার প্রধান নিয়ামক শক্তি। ইতোমধ্যে আজ ১৮ মে-২০১৮ নিয়মিত প্রকাশনার ২৫৫ তম সংখ্যা প্রকাশিত হল। যারা এ লেখাটি পাঠ করছেন তারা হয়তো মনে মনে বিরক্ত হচ্ছেন, লেখার মূল কারণ এবং আদ্যোপ্রান্ত কিছুই খুঁজে পাচ্ছেন না। উত্তরে বলবো, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন ‘‘দুঃখ, কষ্ট, বেদনা এবং হৃদয়ের ভাংচুর থেকেই একটি শৈল্পিক কর্মের সৃষ্টি’’। এ দৃষ্টিকোণ থেকে এ লেখাটি মোটেই উপেক্ষাযোগ্য নয়। পত্রিকার আবেদন থেকে শুরু করে মিডিয়াভুক্তি পর্যন্ত কম করে হলেও আনুমানিক ১০ হাজার মানুষের সাথে কাজ করতে হয়েছে। একেকটি মানুষের একেক রকম ভাব, ভাবনা, ভাষাশৈলী, রুচিবোধ এবং চিন্তাশক্তি। ইচ্ছায়, অনিচ্ছায় সবার সাথে খাপ খাইয়ে আমাকে চলতে হয়েছে। বদহজমের কুইনাইন বড়ি সেবন করে তবেই না কিছুটা রক্ষা।

অনেকেই স্বপ্রণোদিত হয়ে সাহায্য করেছেন, অনেকেই করেছেন বাহানা, অনেকেই অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছেন। অনেকেই মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে আমার মতো ক্ষদ্র মানুষের কাছ থেকে অনেক কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন অনায়াসে। তবে অফিসে কর্মরত কিংবা মফস্বল-এ কর্মরত অনেক সাংবাদিকের সহযোগিতা পেয়েছি।

অনেক শুভাকাঙ্খী মনে প্রাণে পত্রিকাটি দাড় করানোর চেষ্টা করেছেন। এদের মধ্যে উল্লেখ করার মতো হচ্ছেন ড. খোন্দকার আকবর হোসেন বাবলু, কবি মালেক জোমাদ্দার, কবি ক্যামেলিয়া আহমেদ, সাংবাদিক জি আর পারভেজ এবং কবি জামসেদ ওয়াজেদ। চারপাশে পাহাড়সম হাহাকারের মাঝেও ক্ষীণ আলোকছটা হচ্ছে, এখন ‘দৈনিক আলোকিত প্রতিদিন’ পত্রিকাটি ৪০টি জেলায় নিয়মিত পাঠকের হাতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্ধিকাংশ জেলায় রয়েছে জেলা প্রতিনিধি। আমার প্রায় এক বছরের দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকের বাস্তব অভিজ্ঞতা, ১৯ বছরের সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকের অভিজ্ঞতা এবং তিন যুগের সাংবাদিকতা পেশার সাথে জড়িত থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে চাই, যে সামান্য ত্রুটি কিংবা ভুল ভ্রান্তি ‘দৈনিক আলোকিত প্রতিদিন’ পত্রিকায় আছে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব ছিলো কিংবা এখনো সম্ভব, যদি শুধুমাত্র ১০জন মেধাবী, সৎ, সাহসী, যোগ্য, পরিশ্রমী এবং কমিটেড মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। আমার কথা হলো সামনে লম্বা সময় পড়ে আছে, মিডিয়াভ‚ক্তির ক্রাইটেরিয়া অনুযায়ী আমাদের পত্রিকাটি সি গ্রেডের পত্রিকা।

মিডিয়াভুক্তির মূল কাজ হলো- পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হয় কী না, প্রতিদিন কতোগুলো কপি প্রকাশিত হয়, পত্রিকাটি কতো পৃষ্ঠার প্রকাশিত হয়, অফিস আছে কি না, কয় কালারে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়, এসব বিষয়ে অডিট এবং ইন্সপেকশন করে দেখে সে অনুযায়ী সরকারি বিজ্ঞাপণের রেট নির্ধারণ পূর্বক কাগজ বরাদ্দসহ কোড়পত্র প্রদান করাই হচ্ছে ডি এফ পি-এর মূল কাজ।

মূল আলোচনায় ফিরে যাওয়াই শ্রেয়। আমার বক্তব্য স্পষ্ট, এ পর্যন্ত পত্রিকাটি প্রকাশের ক্ষেত্রে সম্পদকীয় নীতিতে কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুরবৃত্তি করিনি ভবিষ্যতেও করতে চাই না। যেহেতু কোনো ব্যক্তি বিশেষের আর্থিক সহযোগিতা সেভাবে এখনও পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি, সেহেতু আগামী দিনেও কোনো ব্যক্তি বিশেষের পারপাস সার্ভ করার তেমন কোনো ইচ্ছা নেই। যাদের আশ্বাসে দৈনিক পত্রিকা করতে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে নিঃশেষ হলাম, তাদেরও আজকের দিনে এ লেখার মাধ্যমে অভিনন্দন জানাই।

আগামীদিনের কর্ম পরিকল্পনা হিসেবে পত্রিকাটিকে এ গ্রেডের পত্রিকা হিসেবে সরকার এবং জনগণের নিকট আত্ম-প্রকাশের ব্রত নিয়ে আমরা কাজ করতে চাই। পত্রিকাটি সত্য, সুন্দর, সাবলীল, গঠনমূলক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জ্বীবিত, নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন, সমাজ বিনির্মাণে নিরপেক্ষ ভুমিকা রাখতে চায়। একটি টেকসই, বিশ্বের নিকট মাথা উঁচু করে দাড়ানোর মতো জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে ভুমিকা রাখার ক্ষেত্রে আমরা কিছু সম্মানিত পরিচালক নিতে চাই। পত্রিকাটি নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার স্বার্থে কিছু সম্মানিত ব্যক্তি দ্বারা পরিচালনা পর্ষদ তৈরি করতে চাই, যাদের সুপরামর্শে পত্রিকাটি আগামীদিনে জনগণের নিকট সত্য সংবাদের আস্থাশীল মাধ্যম হয়ে উঠবে।

কেউ যদি কোনোভাবে পত্রিকার সাথে সম্পৃক্ত হতে চান তাহলে সবার জন্যই আমাদের ‘দৈনিক আলোকিত প্রতিদিন’ পত্রিকার দ্বার উন্মুক্ত থাকলো। আপনার সুপরামর্শ, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রেরণ, পৃষ্ঠপোষকতা, বিজ্ঞাপণ প্রদান, ফিচার, কলাম, কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প ইত্যাদি ক্ষেত্রে সহযোগিতা আগামী দিনে পথ চলতে আমাদের একান্ত কাম্য।

আসুন, সবাই মিলে বাংলাদেশের শুদ্ধতার চর্চাকে আরো বেগবান করে সত্য সংবাদ পাঠক মহলে উপস্থাপন করি। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনই হোক আমাদের আগামীদিনের অঙ্গীকার।

 

আলোকিত প্রতিদিন/১৮মে/আরএইচ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন