বাঁচাও আগামীর সম্ভাবনা । ফাহিয়ান হামিম

গুলিস্তান, গুলিস্তান, ভাই যাইবেন গুলিস্তান, জলদি উঠেন সিট খালি, এভাবেই মুখস্থ কিছু বুলি দিয়ে শুরু হয় রফিকের দিন। রফিকের বয়স ১৩ বছর, এ বয়সে খাতা-কলম নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিলো তার কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে আজ সে হিউম্যান হলার। প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়ে বাসাবো থেকে গুলিস্তান এই রাস্তায় ভাড়া সংগ্রহে তার দিন কাটে। এছাড়া যাত্রীদের বকাবকিসহ সারাদিন গাড়ি চালকের শাসানিতো আছেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খাটুনি শেষে তার আয় মাত্র ২০০ টাকা। শুধু বাস বা টেম্পু নয়, ট্যানারি শিল্প, গ্যাস ফ্যাক্টরি, লেদ মেশিন ও ওয়েল্ডিংয়ের কাজে এরকম হাজারো রফিকের দেখা মেলে প্রতিনিয়ত। অথচ শ্রম আইন, ২০০৬-এ নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে কাজে নেয়া যাবে না। ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত বয়সীদের কাজে নেয়া যাবে, তবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নেয়া যাবে না। কিন্তু আইনের তোয়াক্কা না করে এসব চলছে কর্তৃপক্ষের নাকের ডগা দিয়ে। তারা দেখেও না দেখার ভান করছে।

১৯৬৫ সালের কারখানা আইনের ২২ ধারা অনুযায়ী যে শিশুর বয়স ১৪ বছর পূর্ণ হয়নি, তাকে কারখানায় কাজ দেওয়া যাবে না। ৭০ ধারায় শিশুদের কাজের সময় সম্পর্কে বলা হয়েছে, ১৪ বছর পূর্ণ হয়েছে কিন্তু ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি এমন তরুণদের দৈনিক ৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে তাদের কাজ দিতে হবে। এর আগে বা পরে তরুণ শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো যাবে না। এদের দিয়ে একটি শিফটেই কাজ করানো যাবে। চিফ ইন্সপেক্টরের অনুমতি ছাড়া ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে একবারের বেশি শিফট বদল করা যাবে না। কোনো তরুণকে যন্ত্রের কোনো অংশ চালু থাকা অবস্থায় সেখানে পরিষ্কার করা, তেল লাগানো বা বিন্যস্ত করা বা সংযোজনের কাজ করতে দেওয়া যাবে না বা চলমান যন্ত্রের আশপাশে কাজ করতে দেওয়া যাবে না।

বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আইএলওর জরিপ অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ রয়েছে ৪৫ ধরনের। এর মধ্যে ৪১ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণ করছে শিশুরা। শিশু শ্রমিকদের মধ্যে ৭৩.৫ শতাংশ পুরুষ শিশু এবং ২৬.৫ শতাংশ নারী শিশু।

‘জাতীয় শিশু শ্রম জরিপ ২০১৩’ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কোনো না কোনোও শ্রমে নিয়োজিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত এ জরিপে দেখা যায়, এর মধ্যে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশুই বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত।

এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যে রয়েছে ব্যাটারিসহ বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক কারখানায় শিশুশ্রম, ট্যানারি শিল্প, যৌনকর্ম, বিড়ি ও তামাক ফ্যাক্টরি, পরিবহন খাত, ময়লা আবর্জনা সংগ্রহ করা, গ্যাস ফ্যাক্টরি, লেদ মেশিন ও ওয়েল্ডিংয়ের কাজ, অটোমোবাইল কারখানা, লবণ কারখানা, রিকশা ও ভ্যানচালনা, কাঠমিস্ত্রির কাজ।
শিশু শ্রম নিরসনে বাংলাদেশ সরকার ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নির্ধারণ করে ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম বন্ধের অঙ্গীকার করেছে।

জাতিসংঘের শিশু সনদে বলা হয়েছে, শিশুর বেঁচে থাকা তাদের জন্মগত অধিকার। সে অধিকারের মর্যাদা দিতে হবে, সে অধিকার রক্ষা করতে হবে। এছাড়াও স্নেহ, ভালোবাসা ও সমবেদনা পাওয়ার অধিকার, পরিবার বঞ্চিত শিশুর ক্ষেত্রে সঠিক যত্ন , পুষ্টিকর খাদ্য ও চিকিৎসা সুবিধা পাওয়ার অধিকার, অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ, খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদের পূর্ণ সুযোগ পাওয়ার অধিকার, জন্ম নিবন্ধন ও আইনসম্মত পরিচিতি, পঙ্গু শিশুদের বিশেষ যত্ন ও সেবা শু শুশ্রুষা পাওয়ার অধিকার, দুর্যোগের সময় সবার আগে ত্রাণ পাওয়ার অধিকার, গ্রেফতার ও দন্ড থেকে বিশেষ সুরক্ষা।

বাংলাদেশ শিশু আইন ২০১৩-তে বলা হয়েছে: কোনো ব্যক্তি যদি তার দায়িত্বে থাকা কোনো শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন বা অবহেলা করেন তাহলে ঐ ব্যক্তি অনধিক পাঁচ বছরের কারাদন্ড অথবা এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। মিছিলে, সমাবেশে শিশুদের ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ। শিশুকে ভিক্ষাবৃত্তি বা যৌনপল্লীতে ব্যবহার করা হলে অথবা শিশুদের দিয়ে কোনো প্রকার মাদক বা আগ্নেয়াস্ত্র বা অবৈধ কিছু বহন করানো হলে দায়ী ব্যক্তিকে সাজা দেয়া হবে।

সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, সব ধরনের জবরদস্তিমূলক শ্রম নিষিদ্ধ। সুতরাং শিশুদের যদি শ্রমে বাধ্য করা হয় তবে তাও আইনে দন্ডনীয়।

আজকের শিশুরাই আগামী দিনের সম্ভাবনা, ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মাধ্যমে নয়, এদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে গড়ে তুলতে পারলেই আগামীতে একটি আলোকিত জাতি পাওয়া যাবে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ এবং যথাযথ বাজেট বরাদ্দ করতে হবে, শিশু অধিকার সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে সবাই মিলে শিশুদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হলে বাঁচবে আগামীর সম্ভাবনা, তাদের হাত ধরেই সুন্দর ও সমৃদ্ধ দেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সফল হবে। দেশ ও জাতি উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারবে এবং শিশুশ্রমের অভিশাপ থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হবে।

 

আলোকিত প্রতিদিন/১৫মে/আরএইচ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন