সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবনা- সানাউল হক নীরু

একটি গান এখনো ভাবায় ‘‘তুমি কি সেই আগের মতোই আছো, নাকি অনেক খানি বদলে গেছো .. বড় জানতে ইচ্ছে করে’’। গানটি শুনে তন্ময় ও মন্ময় হয়ে ভাবছি, বর্তমান বিএনপি কী শহীদ জিয়াউর রহমান এর নীতি আদর্শ আর দেশপ্রেমের ঈমানী কাফেলার সেই বিএনপি? নাকি বেঈমান, মীর জাফর, দেশী-বিদেশী বিভিন্ন এজেন্সীর পেইড দালালদের দ্বারা পরিচালিত বিএনপি। জনগণের চাহিদার তুলনায় আন্দোলনে ব্যর্থ বিএনপির রাজনীতি দেখে জানতে ইচ্ছে করে বিএনপির পরিচালক কে? হাওয়া ভবনের কতিপয় কুলাঙ্গার দূর্নীতিবাজ কিংবা নব্য বিএনপি নাকি জামাত শিবির? অথবা মোসাদ্দেক আলী ফালু, লালু, বরকত উল্লাহ ভ‚লু, লুৎফর রহমান বাবর, হারিস চৌধুরী, আমান উল্লাহ আমান, চৌধুরী আলম, খায়রুল কবির খোকন, শিরিন আক্তার, কিংবা শিমূল বিশ্বাস গং অথবা গুলশান অফিসের কর্মচারী দ্বারা পরিচালিত বিএনপি?

বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ফেয়ার নির্বাচনের যারা গ্যারান্টি দিচ্ছে, তারা কি বিএনপির হাতে বাংলাদেশকে তুলে দেবে? যদি দেয় তাহলে কেনো দিবে? দেশটাকে নিলামে উঠাতে কিংবা লুটেপুটে খাওয়ার জন্যে নাকি জামাত শিবিরকে রাষ্ট্র ক্ষমতার মালিক বানিয়ে ক্ষমতার সিংহাসনে বসিয়ে দেয়ার জন্য। বর্তমান যে সকল স্টেক হোল্ডাররা বাংলাদেশ নিয়ে খেলছেন, তারা ভালোভাবেই জানেন, এই খেলার অন্যতম সুবিধাভোগী কারা হবেন।

সুতরাং মনে রাখতে হবে বিএনপির সাইন বোর্ড ব্যবহার করে জামাত কিংবা স্বাধীনতা বিরোধী কোনো প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে বাংলাদেশে ফেয়ার নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতার মালিক বানিয়ে দিবে এরূপ ভাবনা যারা ভাবছেন, তারা বোধ করি দিবা স্বপ্ন দেখছেন কিংবা বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত সবচেয়ে বেশী ও একপেশে অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করতে পেরেছে। আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের নগ্ন হস্তক্ষেপ ও একচ্ছত্র দাদাগিরি বিশেষকরে রাষ্ট্র পরিচালনায় ভারত। তাদের পছন্দের নেতা কিংবা দলকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে দেখতে চায়, এটি সংগত ও স্বাভাবিক।

ভারত বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু! গত ৪৭ বছরের অভিজ্ঞতা কিন্তু তা বলে না – যেমনটি হয়েছে নেপাল, ভূটান, সিকিম, কিংবা শ্রীলংকার ক্ষেত্রে। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল, তথা জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক, এমনকি একটি স্থিতিশীল সরকার চায় কি না? নাকি ১/১১ এবং তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে মহাজোট সরকারের তথাকথিত নির্বাচনী প্রহসনের মধ্যে দিয়ে একটি অসম্পূর্ণ, অগণতান্ত্রিক, অনির্বাচিত ও বিনাভোটের অবৈধ ক্ষমতার গ্যারান্টি কি আবারও একই ভারত দিতে চায়? ভারত মূলত বাংলাদেশে সবসময়ই একটি দুর্বল ও নতজানু সরকারকে ক্ষমতার মসনদে দেখতে চায়, হোক সেটি অগণতান্ত্রিক, অসাংবিধানিক কিংবা বিনাভোটের সরকার।

সুতরাং যাদের সাথে তাদের সুসম্পর্ক রয়েছে, অথবা ভারত কি তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত দল কিংবা নেতাদের বাদ দিয়ে বিশেষ করে – হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ কিংবা হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, ঘাদানিক, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল, প্রজন্ম ৭১, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, সেক্টরস কমান্ডার ফোরাম, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদ, রাম ও বামপন্থী, বুদ্ধিজীবীদের যতগুলো ভারতপন্থী দল আছে, তাদের সবাইকে বাদ দিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসাবে? কিন্তু কেনো? উত্তরটা আমরা সবাই জানি!

তারপর চীন, যাদের সাথে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত নেতা এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাথে সবচেয়ে বেশি সখ্যতা ছিলো, বিএনপি জামাত সরকারের ২০০১-২০০৬ এর ক্ষমতার মেয়াদে তারা দেশটির সাথে অনেকাংশে সম্পর্ক ছিন্ন করে, সামান্য কিছু টাকা ও মোটা আকারের আদম পাচারের চুক্তিতে তৎকালীন হাওয়া ভবনের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সিন্ডিকেটটি বাংলাদেশে তাইওয়ানের নতুন কনস্যুলেট খোলার অনুমতি দিয়ে সারা দুনিয়াকে তারা তাক লাগিয়ে দেয়ার ফলাফল সবারই জানা আছে। অথচ বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে সবচেয়ে বড় ইনভেস্টমেন্ট অর্থাৎ ৩৮ বিলিয়ন ডলারের মেঘা প্রকল্পের অন্যতম সহযোগী হচ্ছে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশ চীন। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা না হয় বাদই দিলাম।

১/১১-র অন্যতম খেলোয়ারও কিন্তু এই ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের সাথে যুক্ত ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নও যুক্তরাজ্য। সুতরাং বাংলাদেশে বিএনপিকে ফেয়ার নির্বাচনের গ্যারান্টি কিংবা জনগণকে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোটদানের নিশ্চয়তা বিদেশীরা দিবেন এরূপ ভাবনা কল্পনা বিলাস মাত্র।

তাছাড়াও দেশের আভ্যন্তরীণ শক্তি বিশেষ করে – নির্বাচন কমিশন, পুলিশ প্রশাসন, জেলা পর্যায়ের ডিসি, মূলতএসপি, আমলা অথবা নির্বাচন পরিচালনার সাথে যারা সরসরি সম্পৃক্ত উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের রিটার্ণিং অফিসাররা কি বিএনপিকে জিতিয়ে আনার মতো রিস্ক কেউ নিবেন? আর যেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন ১০০% বৃদ্ধি করা হলো, তাছাড়াও পুলিশ এবং সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্র সর্বোচ্চ সুবিধা প্রদান করছে, সেখানে ফেয়ার নির্বাচনের গ্যারান্টি কে কাকে দিবে, তাই ভাবছি।

সারা দুনিয়া জানে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা বুলেটের জোরে ক্ষমতায় টিকে আছে, এরা বিনাভোটের সরকার তারপরও তারা বহাল তবিয়তেই আছে এবং ভবিষ্যতেও ক্ষমতাসীনরা একই ধরণের একদলীয় ভোটারবিহীন নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। ফলাফল সবারই জানা, ওয়ান সাইটেড গোল। আমি আবারও বলছি, এটি শহীদ জিয়ার আদর্শ, দেশপ্রেমের বিএনপি নয়, বেঈমান ও বিশ্বাসঘাতকদের বিএনপি। তাই তারা রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করতে ব্যর্থ হয়েছে। সজাগ দৃষ্টিতে প্রতিক্ষায় আছি, দেখি অবৈধ সরকারের বিনাভোটের নির্বাচন ঠেকায় কে? ‘‘বারবার ঘু ঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এইবার ঘুঘু তোমার কে বধিবে পরাণ’’।

বিএনপিকে রাজনৈতিক সমস্যা মোকাবেলার জন্য জনগণকে সাথে নিয়ে রাজনৈতিক ময়দানে আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সমাধান করতে হবে। আন্দোলনের কোনো বিকল্প আছে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হলো বিএনপিতে আন্দোলন সংগ্রাম চালানোর মতো কোনো সাহসী নেতা নেই। অপর দিকে ভূতের মুখে ইদানিং রাম নাম জপ শুনতে পাচ্ছি।

আওয়ামী শব্দটি এসেছে কিন্তু উর্দু শব্দ আওয়াম’ থেকে, যার অর্থ ‘জনগণ। আর লীগ এর অর্থ ‘দল’। আওয়ামী লীগ যদি উর্দু শব্দ হয়, তারপরও তারা পাকিস্তানী না হয়ে ভারতীয় হলো কী করে? আবার বিএনপি জিন্দাবাদ স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশী না হয়ে পাকিস্তানী হয়ে গেলো কী ভাবে? হায়রে, ভূতের মুখে রাম নাম। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন দেখতে পাচ্ছি যত্তোসব পাগলামি, সত্য ইতিহাস কি বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে কিংবা ইতিহাসের দায় কি কেউ এড়াতে পারবেন? মনে হচ্ছে কিছু সুবিধাবাদী রাজনীতিবীদরা দেশে একটা গৃহযুদ্ধ বাঁধানোর পায়তারা করছেন। যা আদৌ বর্তমান আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় কারো জন্যই সুফল বয়ে আনবে না।

কিছু রাজনীতিবীদদের আচরণ দেখে ভাবতে অবাক লাগে, জনগণের টাকায় যাদের পোদ্দারী, পাবলিকের টাকা আত্মসাৎ করে যারা বিত্তশালী কিংবা বড়লোক, তাঁরাই আজ এই দেশের মা বাপ। দেশটাকে ধ্বংসের জন্যে যারা সবচেয়ে বেশী দায়ী, আমরা কি কখনও তাদের বিচার চেয়েছি? নাকি শুধুই ক্ষমতার অন্ধমোহ? এ কেমন তামাশা! একবার আওয়ামী মহাজোট আরেকবার জামাত বিএনপি জোট ক্ষমতায় এসে দেশটাকে ভাগাভাগি করে খাচ্ছে। হায়রে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি! নীতিহীন রাজনীতির ঘেরাটোপে এখন শাসন ব্যবস্থা নষ্টদের দখলে। ‘‘যে যায় লংকায় সেই হয় রাবন’’।

জনগণের পাওনা টাকায় যারা প্রতিনিয়ত ভাগ বসাচ্ছে, কিংবা লুন্ঠন করছে তারাই দেখছি এদেশের মা বাপ, আবার তাঁরাই নাকি এলিট ক্লাস, কিংবা নেতা নামের কুলাঙ্গার এবং আরও কতো কি রাঘব বোয়াল। হায়রে আমার দেশের অভাগা জনগণ, তারা তাদের ন্যায্য পাওনা এমনকি অধিকারটুকু থেকে বঞ্চিত। এমনকি নিজের অধিকার বুঝে নিতে রাজি নয়, শুধুমাত্র জিন্দাবাদ আর মূর্দাবাদের রাজনীতি এখন কালচারে রুপান্তরিত হয়েছে।

এই দেশের যারা শাসক শ্রেনী তাঁরাই বোধ করি সবচেয়ে বড় লুটেরা। যারা রাষ্ট্র চালাচ্ছেন, বিশেষ করে দূর্নীতিগ্রস্থ রাজনীতিবিদ, বিচারক, আমলা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের সীমাহীন দূর্নীতির সাথে যারা যুক্ত তাদের বিচার করবে কে? কখন, কোথায়, কবে? নষ্ট রাজনীতি ও চরিত্রহীনদের শাসন, গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে একদলীয় দু:শাসনের যাতাকলে পিষ্ট করে যেকোনো কায়দা-কৌশলে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার মানসে দেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বার্থ বিদেশী বেনীয়াদের হাতে তুলে দেয়ার অপ-রাজনীতির প্রতিযোগিতা চলছে। শিক্ষিত নামের এ দেশের দূর্নীতিগ্রস্থ ও ক্ষমতাধর মানুষগুলোই দেশের আমজনতা তথা দেশটার সবচেয়ে বড় শত্রু এবং এরাই দেশটার বারোটা বাজিয়ে ছাড়ছে। সময় এসেছে কারো মুখাপেক্ষী না হয়ে জনগণের সামাজিক এবং রাজনৈতিক ন্যায্য অধিকার বুঝে নেয়ার জন্য জনগণকেই সৌচ্চার হতে হবে।

আলোকিত প্রতিদিন/৬ মে/আরএইচ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন