যে অশ্রু বেদনার, যে অশ্রু গৌরবের

১। সভ্যতার সেই ঊষালগ্ন থেকেই জাতিতে-জাতিতে, দেশে-দেশে, গোত্রে-গোত্রে অঞ্চলে অঞ্চলে সশস্ত্র সংঘাত লেগেই ছিল। একের পর এক ভয়াল ঘটনায় পৃথিবীর মানচিত্র থেকে রক্ত ঝরেছে। যেসব দেশ বা জাতি নিজেদের ভিতর বয়ে যাওয়া রক্তগঙ্গা থামাতে পারেনি সেখানেই জাতিসংঘ এগিয়ে এসেছে। বৈরী দেশ সমূহের মাঝে আলোচনা চালিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সবসময়ই সম্ভব হয়নি। তখন রক্তপিপাসু পিশাচদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘকে অস্ত্র ধরতে হয়েছে। বিবাদমান সেইসব অঞ্চলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী পাঠিয়েছে।

২। বিগত বেশ কয়েক দশক ধরে আফ্রিকা ছিল অগ্নিগর্ভ ভূখন্ড। ধূর্ত ইউরোপীয়রা ছলে বলে কৌশলে প্রায় পুরো আফ্রিকাকে তাদের উপনিবেশ বানিয়ে শোষণ চালিয়েছে। হাত গুটিয়ে পালিয়ে যাবার আগে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নিজেদের ভিতরে ক‚ট-কৌশলে ভাইয়ে-ভাইয়ে যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে গেছে।

৩। সেইসব যুদ্ধের অধিকাংশই ছিল বিভীষিকাময়। লাখো লাখো শিশু-নারীসহ নিরাপরাধ মানব সন্তানের রক্তে আফ্রিকার বেনো মাটি ভিজেছে। সাহারার উষর মরু শুষে নিয়েছে নিরীহ আরবদের তাজা লহু।

৪। বাঙ্গালীদের ‘ভীতু’ সাজিয়ে উপেক্ষা করেছিল পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী। মহান একাত্তরে ভাত-মাছ খাওয়া বাঙালিদের শৌর্যে অস্ত্র সমর্পণ করতে বাধ্য হয় বিশ্বের কথিত অন্যতম শক্তিধর পাকিস্তান সেনাবাহিনী।

৫। তারপরের গল্প শুধু বিজয়ের, শুধু সামনে চলার। মহান মুক্তিযুদ্ধের গর্ভে জন্ম নেয়া সশস্ত্র সেনাবাহিনী দিনে দিনে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আনুগত্য, চেইন অব কমান্ড, অত্যাধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার বাংলাদেশের সেনা তথা সশস্ত্র বাহিনী বিশ্বের দরবারে উঁচু স্থান দখল করে নিতে সমর্থ হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে সংখ্যা এবং গুনগত দুই বিচারেই বাংলাদেশ আজ অন্যতম বৃহৎ সৈন্য প্রেরণকারী দেশ। যেখানেই জাতিসংঘ সৈন্য প্রেরণ করেছে প্রায় সবখানেই বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর গৌরব মাখা অংশগ্রহণ থেকেছে।

৬। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের ভেঙ্গে পরা অবকাঠামো, সড়ক-জনপদ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুনর্গঠনে বাংলাদেশের সেনা বাহিনী বিশেষ অবদান রেখেছে। একটি দেশের সেনা বাহিনী কতটুকু জনবান্ধব হলে সিয়েরা লিয়নের মতো হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ বাংলা ভাষাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দিতে পারে, সেটি সাদা চোখেও দিব্যি বোঝা যায়।

৭। আফ্রিকার অনেক অঞ্চল ঘন অরণ্য, শ্বাপদ সংকুল। সেরিব্রাল ম্যালেরিয়াসহ জানা-অজানা রোগ-বালাই, ভয়াল সাপ-বিছের কামড়, মাটিতে পুতে রাখা মৃত্যুদূত মাইন সবকিছুকে মোকাবেলা করেই বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিশ্বের শান্তিরক্ষার জন্য অদ্যবধি অর্ধ লক্ষেরও বেশি শান্তিরক্ষী পাঠিয়েছে। জাতিসংঘের শান্তি মিশনে কঙ্গো এবং ওয়েস্টার্ন সাহারায় ব্যক্তিগতভাবে আমার দুই দুইবার শান্তিরক্ষীর মুকুট পড়বার সৌভাগ্য হয়।

৮। ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে?’ মৃত্যু মানুষের জীবনে অনিবার্য সত্য। মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে কেউ নিষ্কৃতি পায়নি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতে মালিতে শত্রুর এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসের শিকার হোন আমাদের সহযোদ্ধা ৪ জন বীর বাংলাদেশী সৈনিক। আজ বেদনা আর গৌরবের অশ্রুতে ভিজে তাঁদের জানাজা পড়বার সৌভাগ্য হলো।

আমাদের সবার বুকের ভিতর একটি পাখি নিত্য গান করে। সেই পাখিটির নাম ‘বাংলাদেশ’ যে!!!

লেখক : মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ
উপ অধিনায়ক, আর্ম ফোর্সেস ফুডস অ্যান্ড ড্রাগস ল্যাবরেটরি

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন