“শুভ জন্মদিন, হে জাতির পিতা ”

মো: তরিকুল ইসলাম: প্রাচীন বাঙালি সভ্যতার আধুনিক স্থপতি যিনি তার জীবনের সবটুকু সময় ব্যয় করেছেন বাঙালিদের পিছনে। যিনি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি করেছেন। যিনি ২৩ বছরের নির্যাতিত, নিপীড়িত, শোষিত, বঞ্চিত অসহায় মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করতেন। যার এক ডাকে জড়ো হতো ৭ কোটি বাঙালি। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ সহ বাংলাদেশের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে যিনি সরাসরি নেতৃত্ব দিতেন। যাকে বাঙালি ছাত্রসমাজ ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিয়েছেন। যার জন্ম না হলে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র সৃষ্টি হতো না। আমাদের সেই মহান নেতা বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুংগীপাড়া গ্রামে ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ জন্মগ্রহণ করেন।

জাতির পিতা ১৯২৭ সালে সাত বছর বয়সে গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্রজীবনের সূচনা হয়। বঙ্গবন্ধু ১৯২৯ সালে গোপালগঞ্জ সীতানাথ একাডেমিতে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন।১৯৩৪ সালে বঙ্গবন্ধু মাদারীপুরে ইসলামিয়া হাই স্কুলে পড়া অবস্থায় বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হন। তখন তার লেখা পড়া বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৩৭ সালে পুনরায় তিনি শিক্ষাজীবন শুরু করেন। ১৯৩৮ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হকের সাথে পরিচয় হয়। ১৯৩৮ সালে ১৮ বছর বয়সে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৩৯ সালে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় বঙ্গবন্ধু প্রথম কারাবরণ করেন। ১৯৪২ সালে বঙ্গবন্ধু এন্ট্রাস্ পাশ করে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বেকার হোস্টেলে ২৪ নং কক্ষে থাকতেন। ১৯৪৪ সালে কুষ্টিয়ার নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলনে যোগদানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।১৯৪৬ সালে ইসলামিয়া কলেজে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় বঙ্গবন্ধু সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ঐ বছরই বঙ্গবন্ধু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহকারী নিযুক্ত হন এবং প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৭ সালে বঙ্গবন্ধু ইসলামিয়া কলেজ থেকে বি.এ পাস করেন এবং ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। এই বছরই ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে ঘোষণা দিলে বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিক তার প্রতিবাদ করেন।

১৯৪৮ সালে ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ধর্মঘট চলাকালে দ্বিতীয়বারের মতো আটক হন। ঐ একই বছর ১১ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের কর্ডন প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তৃতীয়বারের মতো আবার গ্রেপ্তার হলেন। ১৯৪৯ সালে ২৩ জুন নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ন-সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫০ সালে ১ জানুয়ারি খাদ্য দুর্ভিক্ষ আন্দোলনে আবারও গ্রেপ্তার হন।১৯৫২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে জেলে থেকে অনশন শুরু করেন। অনশনে ব্যাপকভাবে অসুস্থ হওয়ায় ২৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়া হয়। জাতির পিতা ১৯৫৩ সালের ১৬ নভেম্বর প্রাদেশিক আওয়ামী মুসলিম লীগ এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জ আসনে জয়লাভ করেন এবং বয়ঃকনিষ্ট মন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে ৩০ মে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা ভেঙে দেন এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করেন। ১৯৫৫ সালের ১৭ জুন পল্টনের জনসভায় বঙ্গবন্ধু প্রথম পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দাবি করেন।

১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের বিশেষ কাউন্সিলের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে দলের নাম থেকে মুসলিম কথাটি বাদ দেন এবং তিনিই পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে ১২ ই অক্টোবর সামরিক শাসন জারি থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধুকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৬৫ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মিস ফাতিমা জিন্নাহর পক্ষে প্রচারণা চালানোর জন্য বঙ্গবন্ধুকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা গ্রহণ করেন এবং দেশব্যাপী ছয় দফার পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করেন। যার জন্য তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হন। ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারী পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের মিথ্যা অপবাদে বঙ্গবন্ধুকে ১ নং আসামী করে মোট ৩৫ জনের নামে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আবার গ্রেপ্তার হন। ১৯৬৯ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ কর্তৃক দেওয়া সংবর্ধনায় “বঙ্গবন্ধু” উপাধি দেওয়া হয়। ১৯৭০ সালের ২৮শে অক্টোবর বঙ্গবন্ধু বেতার ও টেলিভিশনে জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভের জন্য ৬ দফার পক্ষে ম্যান্ডেট চেয়ে ভাষণ দেন।

১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক ভাষণ দেন যা আজ বিশ্ব প্রামাণ্য লিখিত দলিল। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ১২:৩০ মিনিট, ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তার হবার আগ মুহূর্তে ওয়ারলেস যুগে চট্টগ্রামের জহুরুল হক আহমেদ চৌধুরীর কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা বার্তা প্রেরন করেন। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১০ ই জানুয়ারি লন্ডন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১২ই মার্চ স্বাধীনতার মাত্র ৫০ দিনের মাথায় ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা শুরু করেন। ১৯৭২ সালে ১৬ই ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু গন পরিষদ বাতিল করে নতুন সংবিধান কার্যকর করেন।

১৯৭৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রথম বাঙালি নেতা হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বক্তৃতা দেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে কিছু কুলাঙ্গার বীর বাঙালি জাতিকে অকৃতজ্ঞ জাতিতে পরিণত করেছেন। হে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওরা তোমাকে হত্যা করেছে কিন্তু মারতে পারেনি। তুমি রয়েছো আমাদের অন্তরে, তুমি রয়েছো আমাদের হৃদয়ে, তোমার ৯৮ তম জন্মবার্ষিকীতে তোমাকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। আল্লাাহ তোমাকে জান্নাত বাসী করুন।

লেখক: মো: তরিকুল ইসলাম,
সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন