ইট-ভাটা কর্তৃক পরিবেশ দূষণ । মো: হাসিবুর রহমান

 

মো: হাসিবুর রহমান : বাংলাদেশে শীত মৌসুমে বাতাসের বেগ কম থাকে এবং বৃষ্টিপাত কম হয় তাই এই মৌসুমেই ইট তৈরীর জন্য গ্রামে-গঞ্জে ইট-ভাটায় ইট পোড়ানো শুরু হয়। তাছাড়া শীতের সকাল-সন্ধ্যায় নিম্নস্তরের বায়ু কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকে। ফলে ইট-ভাটা কর্তৃক নির্গত বিষাক্ত ধূয়া বায়ু দূষণের মাত্রা অতিরিক্ত বৃদ্ধি করে। ইট-ভাটাতে কাঠ ও কয়লা পোঁড়ানোর পাশাপাশি গাড়ীর পুরানো টায়ার পোাঁড়ানো হয়। ফলে ভাটা কর্তৃক নির্গত বিষাক্ত ধূয়া কার্বন-ডাই-অক্সাইড (carbon dioxide(CO2), কার্বন মনোঅক্সাইড (carbon monoxide(CO), সালফার-ডাই-অক্সাইড (sulphur dioxide(SO2), নাইট্রাস অক্সাইড (nitrous oxides(NOx) গ্যাসসমূহ ভাটার চারিপাশের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে। বিষাক্ত ধূয়ার পাশাপাশি নির্গত ভাসমান বস্তুকণার (Suspended Particulate Matter) সাথে নির্গত ছাই শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে মানুষের শ্বসণতন্ত্রের ক্ষতি সাধন করে এবং সর্দি-কাশি, যক্ষাসহ, শ্বাসকষ্ট ও হাপানি রোগের সৃষ্টি করে। তাছাড়া নির্গত ছাই আশেপাশের গাছ-পালা ও ফসলের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে। ছাই ও বস্তুকণা গাছের পাতার পত্ররন্ধ্র বন্ধ করে দেয় এবং উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ ও শ্বষন প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যহত করে। কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও সালফার-ডাই-অক্সাইড মিশ্রিত ছাই ফসলের ফুলের রেনু যথা ধান, আম, কাঠাল, লিচু, শিম, কুমড়া, সরিষাসহ নানাবিধ ফসলের ফুলের রেনুকে বিনষ্ট করে এবং এই দূষণের কারনে ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়। দেখা যায় যে, বায়ু দুষণের জন্যে ইটের ভাটার আশেপাশের ফলবান বৃক্ষের ফুল ঝরে যায় এবং পরাগায়নে বিঘ্নতার জন্য ফলবতি গাছের ফল ধারনক্ষমতা হ্রাস পায়। তাছাড়া আমের আম, কাঠাল, লিচু, শিম, লাউ-কুমড়া ইত্যাদি ফলের গায়ে কালো দাগ পড়ে। বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, ‘হাইব্রিড হফম্যান কিনল(Hybrid Hoffman Kiln)’ প্রযুক্তির ব্যবহারে পরিবেশ দূষণের পরিমাণ প্রায় ৯০ শতাংশ এবং ‘ভার্টিক্যাল শ্যাফ্ট ব্রিক কিনল (Vertically shaft brick Kiln)’ প্রযুক্তির ব্যবহারে শতকরা ৮০ ভাগ বায়ু দুষণ কমে যায়। আর দূষণের পরিমাণ কম হলে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ও খাদ্যমানের ক্ষতির পরিমাণও কম হবে। কিন্তু আমাদের দেশে অবৈজ্ঞানিক ও অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ইট-ভাটায় চিমনির উচ্চতা কম থাকায় পরিবেশ দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে নগরায়ন ও গৃহায়নরে প্রয়োজনে প্রতিবছরই ইট তৈরীর নিমিত্তে পরিবেশ দূষণের কথা বিবেচনা না করে নতুন নতুন ইটের ভাটা সৃষ্টি হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী সারাদেশে ইট-ভাটার সংখ্যা ৬,৬৩৭ তারমধ্যে মাত্র ৭৩৫টি ইট-ভাটা পরিবশে সম্মত চিমনি ব্যবহার করে (সূত্র: BCAS)। তবে ইট-ভাটার মালিকদের মতে দেশে ইট ভাটার সংখ্যা প্রায় আট হাজারেরও বেশী। ইট-ভাটা কর্তৃক পরিবেশগত সমস্যা সৃষ্টি সম্পর্কে বহুবার অনেক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলেও এ সমস্যা রোধকল্পে নির্দ্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন জোরালো পদক্ষেপ লক্ষ করা যায় না। সচারচর, ইট তৈরীর জন্য কাটা হচ্ছে ফসলি জমির উপরিভাগের অংশ, যা কিনা মাটির সবচেয়ে বেশি উর্বর যা ফসল উৎপাদনের জন্য সহায়ক অংশ। ইট তৈরি করতে প্রচুর দোঁআশ ও এটেল মাটির প্রয়োজন হয়। ফলে প্রতি বছরই ফসলি জমির ক্ষতিসাধন হচ্ছে এবং কমে যাচ্ছে ফসলি জমি। সেই সাথে জমিগুলো হারাচ্ছে তার উর্বরতা শক্তি ও প্রাকৃতিক গুণাগুণ। মাটি তুলে নিয়ে যাওয়ার কারণে জমি যে উর্বরা শক্তি হারায় তা পূরণ হতে কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগতে পারে। ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে জানা যায়, এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের কৃষিজমি রক্ষায় অর্থাৎ বিভিন্ন কাজে কৃষিজমির ব্যবহার বন্ধে সরকার ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন-২০১০’ নামক একটি নতুন আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আইন অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কৃষি জমিতে কোন প্রকার ইট-ভাটা নির্মাণ করা যাবে না। আইন অমান্যকারীর বিরুদ্ধে রাখা হয়েছে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা ও অর্থদন্ড। ইট পোড়ানো (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন আইন-২০০১ এর ৩(চ)৫ ধারা অনুযায়ী, আবাদি জমি ও ফলের বাগান থেকে তিন কিলোমিটার এলাকার ভিতরে কোনো প্রকার ইটের ভাটা স্থাপন করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাছাড়া, ইট-ভাটাকে পরবিশেসম্মত জগিজাগ চুল্লি করার নর্দিশে দওেয়া হয়েছে, অথচ সরকারি নীতমিালাকে অমান্য করে পরচিালতি হচ্ছে এসমস্ত ক্ষতকিারক ইটভাটা। শহরে ইট-ভাটা তৈরি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও ঢাকা শহরের আশেপাশে ইট-ভাটা গড়ে উঠেছে ৫০০ টিরও বেশি। ইট-ভাটার মালিকরা আইন অমান্য করে আবাদযোগ্য জমিতে নির্মাণ করছে একের পর এক ইট-ভাটা। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্রের মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদানের নিয়ম থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না, এব্যপারে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর বড়ই উদাসীন।

অপরদিকে ইট-ভাটায় জ্বালানি জন্য কাঠ পোড়ানোর ফলে নির্বিচারে গাছ কাটা হয়। প্রতি মৌসুমে গড়ে প্রতিটি ভাটাতে ২০ লক্ষাধিক ইট পোড়ানো হয়, সে জন্য কমপক্ষে ১০ হাজার মন কাঠ এবং ৫ টন কয়লার প্রয়োজন হয়ে থাকে। বাংলাদেশের ৬৪ জেলাতে গড়ে যদি ১০০টি ইটের ভাটা থাকে তবে প্রতি বছর (১০০x৬৪x১০,০০০) মন অর্থাৎ ছয় কোটি চল্লিশ লাখ মন কাঠের প্রয়োজন হয়। ইট পোড়ানেরা জন্য কয়লা ও শুধুমাত্র বাশেঁর গুড়ির জন্য অনুমোদন আছে। কিন্তু ইট পোঁড়ানোর চাহিদা মেটাতে আম, জাম, কাঠাল, তাল, বট, পেয়ারা, শিমুল, তেতুল সহ নানা প্রকারের গাছের কাঠ ব্যবহার করা হয়। এভাবে ইট-ভাটাতে কাঠ পুড়িয়ে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য বিপন্ন হচ্ছে। অন্যদিকে কাঠ ও কয়লার পাশাপাশি গাড়ি ও রিকসার পুরাতন টায়ার পোড়ানোর ফলে ভাটার নিকটস্থ এলাকার বাতাস বিষাক্ত হয়ে যায়। বাতাসে অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির ফলে জনস্বাস্থ্যের মারাত্মকক্ষতি সাধন হয়। ইটের ভাটা কতৃক নির্গত ছাই, ভাসমান ব¯ু‘কণা নির্গমন নিয়ন্ত্রণের জন্য এগুলিকে বিজ্ঞান সম্মতভাবে আধুনিকীকরন করার পাশাপাশি মেশিনে ইট তৈরীতে উৎসাহীত করা ও পরিবেশগত আইন সমূহের যথাযথ প্রয়োগ জরুরী হয়ে পড়েছে।

মানব সৃষ্ট বায়ু দূষণে নির্গত গ্রীণ হাউস গ্যাসের (Greenhouse gases) প্রভাবে পৃথিবীর বায়ু মন্ডলের তাপমাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দেখা দিচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে আজ সমগ্র বিশ্বের মানব জাতি শংকিত। বায়ু মন্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবে সমুদ্র পৃষ্ঠের পানির উচ্চতা এক মিটার বেড়ে গেলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ এলাকা সমুদ্রে তলিয়ে যেতে পারে। বর্তমানে উন্নত বিশ্বের মানুষের ভোগ-বিলাসী জীবন যাত্রার ফলশ্রুতিতে অতিমাত্রায় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, শিল্প-কারখানা ও যানবাহনের ব্যবহারের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্তিত করছে। কিন্তু তার বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশের মতো নিম্নাঞ্চলের মানুষের জীবনে দারুণ ভোগান্তির কারণ হয়ে দাড়াঁবে। বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming) সমগ্র মানবজাতির জন্য এক অশনি সংকেত এবং অন্যান্য জীববৈচিত্রের অস্তিত্ব রক্ষার হুমকী স্বরূপ।

(লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও পিএইচডি গবেষক )

 

আলোকিত প্রতিদিন/ ১৩ ফেব্রুয়ারি’১৮/ জেডএন

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন