‘তবুও লিখছি,বঙ্গবন্ধুকে গভীর ভাবে ধারণ করবার,জানবার অভিপ্রায় থেকে’

যাকে নিয়ে লিখছি কিম্বা যে ইতিহাসের মহানায়ককে নিয়ে লিখছি,সেই ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট তখন আমার জন্মই হয় নাই।তবুও লিখছি, বঙ্গবন্ধুকে গভীর ভাবে ধারণ করবার,জানবার অভিপ্রায় থেকে!

আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবস।জাতির পিতার ৪২ তম শাহাদাতবার্ষিকী।  ইতিহাসের বেদনাবিধুর ও বিভীষিকাময় একটি দিন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪২তম শাহাদাতবার্ষিকী।কী নিষ্ঠুর,কী ভয়াল, কী ভয়ঙ্কর- সেই রাত।

প্রকৃতি কেঁদেছিল, কারণ মানুষ কাঁদতে পারেনি, ঘাতকের উদ্ধত সঙ্গিন তাদের কাঁদতে দেয়নি! কিন্তু ভয়ার্ত বাংলার প্রতিটি ঘর থেকে এসেছিল চাপা দীর্ঘশ্বাস!বৃষ্টিঝরা শ্রাবণের অন্তিম দিনে সেদিন বৃষ্টি নয়, ঝরেছিল রক্ত!বহমান রক্ত, মগজ ও হাড়ের গুঁড়ো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটির প্রতিটি তলার দেয়াল, জানালার কাঁচ, মেঝে ও ছাদে। রীতিমতো রক্তগঙ্গা বয়ে যায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটিতে।গুলির আঘাতে দেয়ালগুলোও ঝাঁঝরা হয়ে গেছে।

চারপাশে রক্তের সাগরের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ঘরের জিনিসপত্র।কেঁদেছিল আকাশ, ফুঁপিয়ে ছিল বাতাস,ফুসে উঠেছিল নদী। বৃষ্টিতে নয়, ঝড়ে নয়, বাংলাদেশের মানুষের এ অনুভূতি ছিল শোকের,পিতা হারানোর শোক!৫৬ হাজার বর্গমাইলের মতো বিশাল তাঁর বুক থেকে রক্তগোলাপের মতো লাল রক্ত ঝরেছিল ঘাতকের বুলেটে।বাংলাদেশের ধূলিকণা ভুলতে পারেনি। ভুলতে চায়নি, ভুলতে পারবে না।

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অশ্রুভেজা, কলঙ্কময় রাতের কথ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তারা বাংলাদেশকেই হত্যা করতে চেয়েছিল, মুছে দিতে চেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত  এই দেশটিকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে।পঁচাত্তরের , আগস্ট আর বর্ষণস্নাত শ্রাবণ মিলেমিশে একাকার হয়েছিল সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর রক্ত আর আকাশের মর্মছেঁড়া অশ্রুর প্লাবনে।

ধানমন্ডির ৩২ নাম্বার সড়কের ৬৭৭ নাম্বার বাড়িটিতে সে রাতে আগামী দিনের কর্মসূচি দেখে ক্লান্ত বঙ্গবন্ধু ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎই একদল বিপথগামী তরুণ সেনা ট্যাঙ্ক দিয়ে ঘিরে ফেলে ভবনটি।।

১৫ আগস্টকে ফিরে দেখতে চাইলেই মানপটে ভেসে উঠে বাঙালির স্বাধীনতার অন্যতম তীর্থস্থান ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নাম্বার বাড়িটি।১৯৭৫ সালের এইদিন ভোরে ঘটেছিল ইতিহাসের সেই কলঙ্কজনক ঘটনা। সেনাবাহিনীর কিছু উচ্ছৃঙ্খল ও বিপথগামী সৈনিকের হাতে সপরিবারে প্রাণ দিয়েছিলেন বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তান, স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এই নৃশংস হামলার  ঘটনায় আরো যারা প্রাণ হারিয়েছিলেন তারা হলেন : বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, ভাই শেখ নাসের ও কর্নেল জামিল, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে মুক্তিযোদ্ধা শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শহীদ সেরনিয়াবাত, শিশু বাবু, আরিফ রিন্টু খানসহ আরো অনেকে।

ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাসভবনে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হলেও সেদিন আল্লাহর অসীম কৃপায় দেশে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা। সে সময় স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে জার্মানিতে সন্তানসহ অবস্থান করছিলেন শেখ হাসিনা। শেখ রেহানাও ছিলেন বড় বোনের সঙ্গে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি নাম, একটি ইতিহাস তার জীবন ছিল সংগ্রামমুখর, সংগ্রামের মধ্যেই তিনি বড় হয়েছিলেন। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তত্কালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছাত্র অবস্থায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ৫২’র ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন সংগ্রামী নেতা। শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির মুক্তি সনদ ৬ দফার প্রণেতাও ছিলেন। ৭০’র নির্বাচনে অংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে এদেশের গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত করেন।পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে ষাটের দশক থেকেই তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন।

১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চ ঢাকার তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উত্তাল সমুদ্রে বঙ্গবন্ধু বজ্রদৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই ঘোষণায় উদ্দীপ্ত, উজ্জীবিত জাতি স্বাধীনতার মূলমন্ত্র পাঠ করে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছিনিয়ে আনে দেশের স্বাধীনতা। জাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পুরুষ বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি এই স্বাধীন বাংলাদেশ।

পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসে এই আমরাই তো একমাত্র জাতি যারা সশস্ত্র সংগ্রাম করে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছি একটি মানুষের ডাকে, একটিমাত্র অমর বাণী কণ্ঠে ধারণ করে। সেই মানুষটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর সেই অমর বাণী ‘জয় বাংলা’।

বাংলাদেশ ও বাঙালির সবচেয়ে হদয়বিদারক ও মর্মস্পর্শী শোকের দিন আজ। প্রতিবছর ১৫ আগস্ট আসে বাঙালির হূদয়ে শোক আর কষ্টের দীর্ঘশ্বাস হয়ে। বাঙালি জাতি আজ গভীর শোক ও শ্রদ্ধায় তার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে স্মরণ করবে।তবে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের অশ্রুর দাম কিছুটা শোধ করেছেন বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করে ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে।আমি বিশ্বাস করি যারা বিদেশে আত্নগোপন করে আছে তাদেরও ফাঁসি এই সরকার কার্যকর করবে বলে আমার বিঃশ্বাস।

আমার কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে শেষ করছি…..

“বঙ্গবন্ধু’কে যখন আমার মনের প্রকোষ্ঠে ধারণ করি
ধারণ করি রক্তের প্রতিটি কনিকায় অণুচক্রিকায়
তখন একটা হিমালয় সমান বুক
এসে যুক্ত হয় আমার বুকে
আমিও তখন বঙ্গবন্ধুর মতো
একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই ভাবি।
আমাকেও গভীর ভাবে ভাবায় আমার কবিত্বকে
অস্তিত্বকে করে তোলে অর্থবহ।
আমিও হয়ে যাই কালজয়ী ইতিহাসের মহানায়কের ক্ষুদ্রতম ধারক !”

বঙ্গবন্ধু তুমি আছো,আমাদের চেতনায় ষোল কোটি মানুষের হৃদয়ে।তোমার বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে পৃথিবী যতদিন টিকে থাকবে,থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু ও জয় বাংলা।

বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে সোমবার এক বাণীতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, “জাতির পিতা হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে ‘সুখী-সমৃদ্ধ’ বাংলাদেশ গড়তে সম্মিলিতভাবে কাজ করার জন্য “।

চলুন আমরা দেশরত্ন শেখ হাসিনার কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে সবাই দেশকে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে শপথ নেই।জয় বাংলা।

 

মোঃ সরোয়ার জাহান
(সম্পাদক,কবি,লেখক ও গবেষক)
sarowar.muktoalo24@gmail.com

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *