সুন্দরবনের সব রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার এবং একজন এন্ড্রু কিশোর । কনক চাঁপা | আলোকিত প্রতিদিন

সুন্দরবনের সব রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার এবং একজন এন্ড্রু কিশোর । কনক চাঁপা

Spread the love

কনক চাঁপা : খুবই অস্থির আছি কিশোর’দার অসুস্থতার খবর পেয়ে কিন্তু তার চেয়ে অস্থির আছি ফেসবুকের মানুষের এইসব অসভ্যতা নিয়ে। আমি আপাতত এক জায়গায় অবস্থান করছি আর আমার জীবন সঙ্গী আরেক জায়গায়। আমার অস্থিরতা দেখে অতদূর থেকে তিনি আমাকে বললেন- ‘তুমি সারাজীবন উনার সহকর্মী ছিলে। তোমার অবশ্যই প্রতিবাদ করা দরকার। তুমি গুছিয়ে লেখো।’

আমি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে কিশোরদাকেই ফোন দিলাম। উনি বরাবরের মতোই নির্ভার। আমাকেই শান্তনা দিয়ে শান্ত হতে বলে আগ বাড়িয়ে স্ট্যাটাস দিতে না করে বললেন- ‘শোনো, কেউ জিজ্ঞেস করলে আমার উত্তর এভাবে দিও, নইলে নয়। মানুষের কথায় কি আসে যায়, আর ওরা তো আসলে জানে না ভেতরের কথা , কিন্তু আমি আমার কাছে পরিষ্কার।’ ওনার ব্যক্তিত্বের পরিচয় আমি আবারও পেয়ে যাই।

কিন্তু আমি শান্তি পাই না। কারণ আমি ফেসবুক ব্যবহার করি। এতো নোংরা কমেন্টস দেখে বসে থাকা আমার জন্য কঠিন বটে। আমি কিশোরদার উপদেশ বা আদেশ মানতে পারিনি বলে দুঃখিত।

ঘটনা হলো কিশোর দা কিছুদিন হলো অসুস্থ বোধ করছেন। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কোনো একজন ব্যক্তিগত সচিব কিশোরদার খুব কাছের মানুষ। তিনিই কিশোরদার অসুস্থতার কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন। স্বয়ং তিনি ডেকে পাঠিয়েছেন এবং তিনি এই পরিমাণ টাকা দিয়েছেন এবং বলেছেন- এটা শুধু চেকআপের জন্য।

আল্লাহ না করুক চিকিৎসার জন্য আরও লাগে বা যতোও লাগে উনি সেটা দেখবেন। কি! হিংসা হচ্ছে? হিংসুকদের হিংসা হবে এটাই স্বাভাবিক। কিছু করার নেই। স্বয়ং সরকার প্রধান যদি ডেকে নিয়ে এই সম্মান দেন, তো সেই সম্মান ফিরিয়ে দেয়ার মতো বেয়াদব অভদ্র আমাদের এন্ড্রু কিশোর নন। উনি যদি এই সম্মানী ফিরিয়ে দেন তো সেটাও অনেক বড় দোষ তাই না? তখন পাবলিক নামের পাকনা চীজ কী কী বলতেন তাও ধারণা করা যায়।

এবার আসি এই টাকাকে সম্মানী কেন বলছি। সম্মানিত মানুষকে কেউ অনুদান দিতে পারে না। এমনকি রোজদিন আমরা কাজ করে যে টাকা পাই তাও বেতন বা পারিশ্রমিক নয়। এই পাওনার নাম সম্মানী। প্রধানমন্ত্রী ডেকে নিয়ে যা দিয়েছেন তা হলো সম্মানিত ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া উপযুক্ত প্রাপ্য, যা আসোলে সম্মানী। আমাদের সরকার প্রধানকে আমার অন্তঃস্থল থেকে ভালোবাসা যে উনি বাংলার এই অমূল্য সম্পদকে মূল্যায়ন করেছেন। একে ভিক্ষা ভাবার কোনোই অবকাশ নাই।

এরপর আসি শুধু বড় শিল্পী -এর প্রাপ্য কেন? ছোট শিল্পী নয় কেন? প্রথম কথা শিল্পীর কোনো বড় ছোট নাই, শিল্পীতো শিল্পীই। কিন্তু শিল্পীর কর্মের অবদানের হিসাবতো বড়-ছোট, কম-বেশি আছেই, থাকবেই, থাকাই উচিত ।

ধরেন দু’জন এন্ড্রু কিশোর আছেন। একজন গান গেয়ে গেয়ে জীবন দিলেন, আরেকজন একই সমান প্রতিভা নিয়ে দু’টো গান গেয়ে অলসতা করে এ জগৎ ছেড়েই দিলেন। তাহলে কি দু’জনের অবদান এক সমান হবে?

জেনে রাখবেন- গান গাওয়া এতো সহজ কাজ নয় । ভয়ংকর সাধনালব্ধ কঠিন জীবন থাকে একজন তুঙ্গে থাকা শিল্পীর। দীর্ঘদিন তুঙ্গে থাকা এতো সোজা কথা না। পারবেন একটা বাঁশের আগায় ব্যালেন্স রেখে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে?

এবার আসি একজন এন্ড্রু কিশোর এর কাছে সরকার সমাজ কতটা ঋণী আর আপনারা আবাল ( যারা আমাদের কিশোরদাকে বাজে কথা বলছে, তাদের আরও বাজে গালি না দিয়ে দয়া করে আবালই বলছি ) -পাবলিক কতো ঋণী। একজন এন্ড্রু কিশোর এর গানে কোটি কোটি যুবক বুঁদ হয়ে রেডিওর পাশে আঠার মতো আটকে থেকে পড়ার টেবিলে অংক-বিজ্ঞান-জ্যামিতি কষেছে কয়েক জেনারেশন! গান শুনতে শুনতে অংক কষে কষে ডাক্তার-বৈজ্ঞানিক-ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে, আর না হলেও কোটি খানেক ছাত্র! পাড়ার জুয়া কেরাম ফেনসিডিলে ডুব না দিয়ে ভালোবেসে গান শুনেছে। তার বিনিময়ে এন্ড্রু কিশোর কিছু চেয়েছে এই সমাজের কাছে?

আর এ ধরনের অবদানতো রাষ্ট্র-দেশের পরিবেশের জন্য বিশাল বড় ব্যাপার। সুন্দরবনের বাঘ যেমন পরিবেশের, প্রতিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে, ঠিক তেমনই ব্যাপার আরকি। উনাকে দশ কোটি টাকা দিলেও কম হবে কিন্তু!

আর সাধারণ পাবলিক? তারা যে রোজ উনার টন টন গান গিলতেন বা এখনো গিলছেন চোখ মুদে, আরাম করে। তাদের কাছে কিশোরদা কিছু চেয়েছিলেন?

একটা সমাজকে পাক্কা তিরিশ-চল্লিশ বছর নির্মল সাংস্কৃতিক সেবা দিয়ে গেলেন যে মহান শিল্পী, তার কাছে সমাজ, রাষ্ট্র এবং পাবলিক কতো ঋণী জানেন? প্রতিবার শোনা একটি গানের বিনিময়ে যদি এক পয়সা করেও তাঁর পাওনা হয় তবে কত শত কোটি টাকা উনি পাওনা আপনাদের কাছে বুঝতে পারছেন? না পারলে জনসংখ্যার অংক জেনে নিয়ে ক্যালকুলেটর নিয়ে বসেন।

আর শোনেন আমরা একমাত্র সেই দূর্ভাগা শিল্পী যারা এখনো কোনো গানের জন্য রয়ালটি পাই না। এক রেডিও টিভির রয়ালটি পেলেই আমাদের টাকা খায় কে! অথচ সব ফোন কোম্পানিগুলো সমানে আমাদের পাওনা টাকা মেরে লুটেপুটে খাচ্ছে। এখন খাচ্ছে ইউটিউব এর টাকা। সিনেমার গানে আমাদের হরে দরে গান প্রতি পাঁচ-সাত হাজার টাকা দিয়েছে। আমরা কিন্তু শুধুই সিনেমার জন্য গেয়েছি। সেই গান দশ বেচা দিয়ে দিয়ে বেনিয়া সম্প্রদায় দুই জেনারেশন পার করেছেন, ভালো কথা।

কিন্তু এখন তারা ইউটিউবেও এই গানের মালিক হয়ে বসে আছেন। একজন লেখক বা শিল্পীর মেধাসত্ব শুধুই তার। আমার কণ্ঠ শুধুই আমার, আর কারো নয়! কখনওই নয়। অথচ আমাদের এই সব বেনেরা সব নিয়ম-কানুন নিজেদের মতো করে দিনকে রাত করে রেখেছেন। সরকার দেখেও দেখছেন না। কিশোরদা অথবা আমরা যার প্লেব্যাকের প্রধান ধারার ধারক তারা ছবির গানের সব পাওনা অধিকার মতো পেলে পুকুর খুঁড়ে তাতে টাকা রাখা লাগতো।

সেখানে এই সিংহের মতো শক্তিমান ( শুধু কণ্ঠে নয়, সারাজীবনের অবদানে ) শিল্পীকে দশ লাখ টাকা দিয়েছে বলে পাবলিক তো পাবলিকই শিল্পীদের কেউ কেউও গোস্বা হচ্ছেন! আমি স্তম্ভিত! এতো হিংসা এই বাঙ্গালী জাতির? ছি ছি ছি!

কিছু শিল্পীর কথা হলো- বাংলাদেশে কত অসহায় শিল্পী আছে তাদের অসুখে সরকার খোঁজ নেয় না। আর উনি তো ধনী, উনার কেন অনুদান নেয়া লাগবে! একজন শিল্পী হিসেবে অবশ্যই সব শিল্পীর সফলতা, সচ্ছ্বলতা, সুস্থতা এবং অসুস্থতায় সেবা বা সরকার হতে প্রয়োজনীয় সহায়তা আমরা ছোট-বড় নির্বিশেষে সবাই সব সময় কামনা করি কায়মনোবাক্যে। কিন্তু কথা হলো আমার বাসায় যদি অনেকগুলো কর্মচারী থাকে তার মধ্যে যে আমাকে বেশি সেবা দিয়েছে তাকেই আমি পরবর্তীতে বেশি সহায়তা করবো। সরকারের তো সেই মনোভাব থাকাই স্বাভাবিক তাই নয়কি?

কর্মস্থলে যেমন পিওন আর অফিসারের পদবি, বসার জায়গা, বেতন, পেনশনে  তফাত আছে শিল্পীদের ক্ষেত্রে তা থাকবে না? আমরা কি গান গেয়ে একেকজন একেক রকম পেমেন্ট, একেক রকম সম্মান, ইজ্জত পাই না?
আর গান গাইলেই কি শিল্পী হয়? গান গাইলেই সরকার প্রধান তাঁকে চিনবে? তেল আর ঘি’র কি এক দাম? এতে মন খারাপ করার, হিংসা করার মতো বোকামি আর আছে? সারা জীবনের বাংলাদেশের সব শিল্পীদের নামের দশজনের লিষ্ট করলে পুরো শিল্পী সমাজের নাম এনলিষ্ট করা সম্ভব?

আর আপনারা আমাদের ধনীর কি দেখছেন! আমাদের প্রাপ্য ঠিকঠাক পেলে পৃথিবীর সবচাইতে দামী আবাসস্থলে বাস করার মতো ক্ষমতা থাকতো। আমরা দুস্থ নই, আমরা বঞ্চিত। বুঝলেন।

একজন এন্ড্রু কিশোর অসুস্থ, তার জন্য দোয়া না করে এইসব করছেন! ছি ছি ছি! এ জন্যই আমাদের আজ এই অবস্থা! আমরা আসলেই অকৃতজ্ঞ জাতি। আমাদের ভালো কিছু সয়ও না, আর ভালো কিছু হবেও না।

প্রকৃতি ঠিকই শোধ নেবে এইসব অসভ্যতার।

( লেখক : সঙ্গীত শিল্পী )

 

আলোকিত প্রতিদিন/১৪ সেপ্টেম্বর’১৯/জেডএন

এই সংবাদ ১৪৩ বার পঠিত।
ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন