ঢাকা নিয়ে শুধুই পরিকল্পনা | আলোকিত প্রতিদিন

ঢাকা নিয়ে শুধুই পরিকল্পনা

Spread the love

ঢাকা সমতল আর বৃষ্টিপ্রবণ শহর। এ দুটো বাস্তবতাকে ধরেই এই নগরের বিশদ পরিকল্পনাগুলো হয়েছে। ঢাকার আরেকটি বিষয় হচ্ছে, এর চারদিকে চারটি নদী ঘিরে ধরে আছে। এ ছাড়া ঢাকায় প্রায় ৫০টির মতো প্রাকৃতিক খাল ছিল। এই খালগুলো দিয়ে বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হয়ে নদীতে পড়ত এবং পানি জমত না। শহর বড় হওয়া শুরু করলে ব্রিটিশরা ১৯১৭ সালে নগর-পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গেডিসকে দিয়ে একটা বিশদ পরিকল্পনা করায়। সেটা ছিল বিখ্যাত ‘ঢাকা টাউন প্ল্যান’। ওই পরিকল্পনায় গেডিস সাহেব বৃষ্টির পানি যেন প্রবাহিত হয়ে চলে যেতে পারে, সে জন্য নদী, খাল ও জলাধারগুলোকে সংস্কার ও সংরক্ষণ করার কথা বলেছিলেন। ওটা ঠিক এক শ বছর আগের কথা। কিন্তু এখনো আমাদের এসব নিয়েই কথা বলতে হচ্ছে।

১৯১৭ থেকে ’৪৭ পর্যন্ত শহর খুব একটা সম্প্রসারিত হয়নি। ’৪৭-এর পরে ঢাকার দ্রুত নগর সম্প্রসারণ হয়। রমনা, মগবাজার, ইস্কাটন, ধানমন্ডি, তেজগাঁও, বনানী, গুলশান, উত্তরা—এসব পাকিস্তান আমলে মাত্র কয়েক বছরে হয়েছে। তখনই তৎকালীন সরকার বিজ্ঞানসম্মত নগর-পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) তৈরি করে। ১৯৫৯ সালে ডিআইটি ঢাকার জন্য একটি মাস্টার প্ল্যান করল। এটি ছিল ১৯৬০ থেকে ’৮০ পর্যন্ত ২০ বছরমেয়াদি।

পানিনিষ্কাশন ও বন্যার প্রসঙ্গটি এ পরিকল্পনায়ও গুরুত্ব পায়। তারাও নদী-খাল সংরক্ষণের কথা বলেছিল। তবে ধোলাইখাল আংশিক বন্ধ করার সুপারিশ করেছিল। পরে ধোলাইখাল পুরোটাই বুজিয়ে ফেলা হয়েছে।

১৯৫৯ থেকে ’৭১ পর্যন্ত ওই পরিকল্পনা ধরে কিছু উন্নয়ন হয়েছে। স্বাধীনতার পরে ঢাকার জনসংখ্যা বিপুলভাবে বাড়তে শুরু করল, দ্রুত রাস্তা, ঘরবাড়ি হতে লাগল। ১৯৭১-এ কেন্দ্রীয় ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১০ লাখ। তখন এই পরিমাণ মানুষকে সুন্দরভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা গেছে। এর পরের মহাপরিকল্পনা করতে প্রায় ৪০ বছর লেগে যায়। এটা ১৯৯৫ সালে করা হয়, ১৯৯৭ সালে অনুমোদন পায়। ওটা করেছিল রাজউক। সেখানেও তারা বন্যা ও অতিবর্ষণের বাস্তবতাকে আমলে নিয়ে নদী, খালগুলো সংরক্ষণের সুপারিশ করেছে। পূর্ব ঢাকাসহ কয়েকটি এলাকায় কয়েকটি জলাধার তৈরির কথা বলেছে, কিন্তু জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয়নি। পরে রাজউক যখন বিশদ ড্যাপ তৈরি করল, তখন তাদের দায়িত্ব ছিল এই জলাধারগুলোকে নির্দিষ্ট করা। কিন্তু তারা সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৯৭ থেকে ২০১৭-এর মধ্যে নগর সম্প্রসারণ হয়েছে খুব দ্রুত। বারিধারা আর পূর্বাচল কেবল রাজউক করেছে। বাদ বাকি পূর্ব ঢাকার বিশাল এলাকাজুড়ে উন্নয়ন করছেন বেসরকারি আবাসন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের আর রাজউক বাগে আনতে পারেনি। কয়েকজন ব্যবসা করে যাবে আর বাকিরা ভুগতে থাকবে।

এখন নতুন করে ২০১৫ সালে রাজউক আবার নতুন ঢাকাকাঠামোর পরিকল্পনা করেছে। এটার মধ্যেও তারা জলাধার করার কথা বলেছে। কিন্তু ইতিমধ্যেই জলাধার, খাল হারিয়ে গেছে।

খাল উদ্ধার ও জলাধার সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ওয়াসার কাছে। ওয়াসা মূলত ছিল পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন। পরে তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হলো পানিনিষ্কাশনের। কিন্তু এ কাজগুলো তারা ঠিকভাবে করতে পারেনি। তাদেরই নাকের ডগায় খাল, জলাধার সবই ভরাট ও দখল হয়ে গেল। তারা দু-চারটি সংরক্ষণের চেষ্টা করেছে। অধিকাংশ পারেনি। এখানেই ব্যর্থতা।

এখন কুড়িল থেকে পূর্বাচল তিন শ ফিট চওড়া রাস্তা হলো। পরিকল্পনাকারীরা এই তিন শ ফিটের পাশে খালের কথা চিন্তা করেনি। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ধারণা থেকে রাস্তার দুদিকে খাল তৈরির নির্দেশ দিলেন। খাল থাকলে ওই দুই দিকের এলাকার পানি সহজেই নামতে পারবে। এটা করতে গিয়ে রাজউককে পাঁচ হাজার কোটি টাকা খালি জমির মালিককেই দিতে হচ্ছে। কী দুঃখজনক। পরিকল্পনাকারীরা সড়ক পরিকল্পনা করলেন কিন্তু পানিনিষ্কাশনের বিষয়টি মাথায় রাখলেন না।

আর এ রকম বন্যাপ্রবণ সমতল শহরে খেয়াল রাখতে হবে কতগুলো স্থাপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বন্যার ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। একটা হচ্ছে বিমানবন্দর, সেনানিবাস, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, হাসপাতাল, সচিবালয় ইত্যাদি।

শহর যেহেতু দ্রুত নির্মাণ হচ্ছে, সে জন্য আগেই রাজউক যে মহাপরিকল্পনা করেছে, সেটা সঠিক হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। সঠিক হলে অনুমোদন দেওয়া এবং পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ব্যত্যয় যেন না হয়। এর মধ্যে নদী, খাল বা জলাধারের প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক:নজরুল ইসলাম, নগর পরিকল্পনাবিদ

তথ্যসূত্রঃপ্রধম আলো অনলাইন

 

এই সংবাদ ৯২৬ বার পঠিত।
ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *